দ্বিতীয় পর্ব
#তিন_গোয়েন্দা সিরিজ থেকে
#আলাস্কা_অভিযান - রাকিব হাসান
লাফ দিয়ে সরে গেল মুসা। কাঁচের টুকরো থেকে বাঁচাতে দুই হাত ঝটকা দিয়ে উঠে এল মুখের সামনে। কেবিনের মেঝেতে এসে পড়ল একটা মোটা আধপোড়া লাকড়ি। সময়মত মাথাটা সরিয়ে ফেলায় অল্পের জন্য লাগেনি মাথায়। জানালা দিয়ে ওকে সই করেই বোধহয় ছুঁড়ে মেরেছিল কেউ।
এক টানে হুক থেকে পার্কাটা খুলে নিয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল মুসা। ছাড়বে না লোকটাকে।
কিন্তু বাইরে এসে মুনস্টোনকে ছাড়া আর কাউকে চোখে পড়ল। জে নিয়ে আসছে মুন। বিশ গজ দূরে রয়েছে এখনও। তার পক্ষে এত তাড়াতাড়ি লাকড়ি ছুঁড়ে আবার স্নেজের কাছে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া সে ছুঁড়তেই বা যাবে কেন?
মুন চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা, এদিক দিয়ে কাউকে যেতে দেখেছ?
না! জবাব দিল মুন। কী হয়েছে?
কিশোরও বেরিয়ে এল। মুসাকে জিজ্ঞেস করল, লোকটাকে দেখেছ নাকি?
মাথা নাড়ল মুসা। না!
তারমানে পালিয়েছে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর।
কাছে এল মুন। ততক্ষণে জেফরি আর জোসিও বেরিয়ে এসেছে। জেফরির হাতে একটা লাকড়ি। লাঠির মত করে ধরেছেন।
ওদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল কিশোর। নেই। আমার মনে হয় বনের ভিতর দিয়ে পালিয়েছে।
সব শুনে মুখ কালো হয়ে গেল মুনের। জ্বলে উঠল চোখ। কী শুরু হলো আমাদের শহরটায়!
হাতের দিকে তাকালেন জেফরি। লাকড়ি দেখে অবাক হলেন। ওটা কীভাবে এসেছে তার হাতে, মনে করতে পারলেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এখানে দাঁড়িয়ে থেকে আর লাভ নেই। কেবিনে চলো। ভাঙা জানালাটা বন্ধ করা দরকার। ঘরে ঠাণ্ডা ঢুকবে।
সারি দিয়ে ঘরে ঢুকল সবাই।
কালো রঙের একটা প্লাস্টিকের চাদর খুঁজে বের করল জোসি। কাঁচভাঙা জানালার ফোকরটা বন্ধ করতে ওকে সাহায্য করলেন জেফরি। ঝাড়ু দিয়ে কাচের টুকরোগুলো মেঝে থেকে সরিয়ে ফেললেন এরিনা। তারপর চা ঢাললেন। চা খাওয়ার জন্য সবাই এসে টেবিলে বসল।
জোসির দিকে তাকালেন এরিনা। তোমার ঘর তো শূন্য। কোনও খাবারই নেই। আমাদেরগুলোও পুড়ে ছাই। দোকানে যেতে হবে।
আমি লিস্ট বানাচ্ছি।
চামচ দিয়ে নেড়ে চা ঠাণ্ডা করছে কিশোর। বলল, আগুন লাগার কারণ এখনও জানি না আমরা। আপনাআপনি লেগেছে, না কেউ লাগিয়ে দিয়েছে জানি না। তবে কড়িটা আপনাআপনি উড়ে আসেনি। কেউ জানালা দিয়ে ছুঁড়ে মেরেছে। নীচের ঠোট কামড়াল। তারপর চামচটা রেখে মুখ তুলে তাকাল। কে?
সেটা তো আমিও বুঝতে পারছি না! ধরতে পারলে আজ…দাঁত কিড়মিড় করলেন জেফরি।
এ সব ঘটনা এখন ডালভাত হয়ে গেছে গ্লিটারে, মুন বলল। থিম পার্ক বানানো নিয়ে ঝগড়া করে শহরটাই ধ্বংস হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।
মুনের কথা সমর্থন করল জোসি। ইদানীং প্রায়ই ছোটখাট দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে শহরে। আগেও যে একেবারে ঘটত না তা নয়, তবে এখনকার মত এত বেশি না।
তারমানে তোমরাই একমাত্র লক্ষ্য নও? কিশোরের প্রশ্ন। কিশোরের দিকে তাকাল মুন। কিশোর, তোমাদের কথা সব আমাকে বলেছে জোসি। তোমরা গোয়েন্দা। অনেক জটিল রহস্যের সমাধান করেছ। আমাদের গ্লিটারের রহস্যটার সমাধান করতে পারবে?
কেন, পুলিশ কিছু করতে পারছে না?
দমকল বাহিনী যেমন নেই-আগুন লাগলে আমাদের নিজেদেরকেই আগুন নিভাতে হয়-দেখলেই তো, পুলিশও নেই আমাদের শহরে, কথাটা বলে আবার মুদির লিস্ট দেখায় মন দিলেন এরিনা।
পুলিশ না থাকলেও দরকার পড়লে স্টেট ট্রুপারদের ডাকতে পারি আমরা, মুন বলল। তবে কখনও ওদের ডাকার প্রয়োজন পড়েনি। এবার মনে হয় পড়বে।
হুঁ, মাথা ঝাঁকাল কিশোর। আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা আমরা করব।
এখানে, আলাস্কার এই দুর্গম অঞ্চলে জীবনযাত্রা মোটেও সহজ নয়, কিশোর, জোসি বলল। সব সময় কোন না কোন বিপদ লেগেই আছে। তোমাদের রকি বিচের মত নিরাপত্তা আর সুযোগ-সুবিধা পাবে
এখানে। কলের চাবিতে মোচড় দিলে সাপ্লাইয়ের পানি আসে না, হাসপাতাল নেই, একশো মাইলের মধ্যে একজন ডাক্তারও নেই।
সে-কারণে সাধারণ ছোটখাট দুর্ঘটনাকে আমরা তেমন কিছুই মনে করি না, এরিনা বললেন। সব কিছু নিয়ে ভাবতে গেলে টিকতে পারতাম না। অনেক কিছুই মনে রাখি না আমরা। কিন্তু কেউ আমাদের কেবিনে আগুন দিলে, সেটা আমরা ভুলতে পারি না।
আপনাদের বিরুদ্ধে কার এমন আক্রোশ থাকতে পারে? জিজ্ঞেস করল মুসা।
ব্ৰিণ্ডল জ্যাক, একসঙ্গে বলে উঠলেন এরিনা ও মুন। এরিনা বললেন, শিকারের ওই জায়গাটা নিয়ে দশ বছর হলো জেফরির সঙ্গে ঝগড়া। এখনও মিটমাট হলো না।
অস্বস্তি বোধ করছেন জেফরি। জ্যাক বদমেজাজী, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ঘরে আগুন দেয়ার মত এতবড় একটা অন্যায় কাজ সে করবে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু আমি ভাবছি আরেকজনের কথা। ইডিটারোড রেসে জিততে পারলে ভাল টাকা পাওয়া যায়। এ সময় আমাদের ঝামেলায় ফেলে দিতে পারলে রেসে মনোযোগ দিতে পারবে না জোসি।
তাই বাধা দিয়ে আমাকে রেসে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে চাইছে, এই তো বলতে চাও? ভুরু নাচাল জোসি। তুমি কি টেডকে সন্দেহ করছ, চাচা? ঝামেলা পাকিয়ে আমাকে যদি ঠেকাতে চায়, লাভ হবে না, আমি ওকে ছাড়ব না…।
জেফরির দিকে ফিরল কিশোর। আঙ্কেল, থিম পার্ক বানানোয় আপনি বিরোধিতা করছেন। আপনি দলের নেতা। এ নিয়ে আপনার সঙ্গে শত্রুতা করছে না তো বিপক্ষের কেউ?
জানি না। তবে ইলকিস বিগস মরিয়া। ওর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। তবে তাই বলে কারও ঘরে আগুন দেয়ার মত খারাপ লোক না ও।
ভাবছি, আমি আর কিশোর গিয়ে একটু ঘোরাঘুরি করে খোজখবর নিয়ে আসব কি না, মুসা বলল। আমরা এখানকার বাসিন্দা নই। লোকে আমাদের সঙ্গে মন খুলেই কথা বলবে।
তা ঠিক, হাসল জোসি। দুজন চিকাকোকে সন্দেহ করবে না লোকে।
কিশোর জিজ্ঞেস করল, নতুন কেউ এলে তাকে চিকাকো বলে নাকি?
জোসি বলল, হ্যাঁ। এক শীত কাটানোর পর চিকাকোর বদলে তোমরা হয়ে যাবে সাওয়ার-ডো, অর্থাৎ টক হয়ে যাওয়া ময়দার তাল। শব্দটা চালু করেছিল পুরানো আমলের স্বর্ণসন্ধানীরা। রুটি বানাতে ময়দার সঙ্গে ঈস্টের বদলে সাওয়ার-ডো ব্যবহার করত ওরা…
রুটি, রুটি! মনে করিয়ে দিয়ে ভাল করেছ, এরিনা বললেন। ময়দা দরকার। আরও কিছু টুকিটাকি জিনিস। মুসা, যদি জেনারেল স্টোরের দিকে যাও তোমরা, জিনিসগুলো নিয়ে এসো। পারবে?
পারব,মুসা বলল।
এই যে লিস্ট।
ভালই হলো, কিশোর বলল। জিনিস কেনার ছুতোয় সহজেই স্টোরের মালিকের সঙ্গে কথা বলতে পারব।
কেবিন থেকে বেরিয়ে হেঁটে চলল দুজনে। কিছুদূর যেতে সামনে পড়ল গোল্ড ফেরানি। মাথায় এখন লাল ঘেঁড়া টুপি। গায়ে একটা সবুজ পার্কা।
থাকতে এসেছ নাকি এখানে? রুক্ষ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল বুড়ো।
না, রেস দেখতে এসেছি, মুসা বলল। ইডিটারোডের ডগ রেস।
বাঁকা চোখে ওদের দিকে তাকাল গোল্ড। নাকি সোনা খুঁজতে?
না, সোনা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। আমাদের আগ্রহ ডগ রেসে।
সত্যি কথা বলল।
সত্যি কথাই বলছি।
ভাল। শোনো ইডিটারোডের সব খবর আমার জানা। টেড আর জোসি রেসে অংশ নিতে যাচ্ছে, তা-ও জানি। এটা গ্লিটারের জন্য একটা বড় খবর। তারচেয়েও বড় খবর আছে এখানে, যার দেখার চোখ আছে সে ঠিকই দেখতে পাবে।
কী খবর? কিশোরের প্রশ্ন।
নাকের একপাশে টোকা দিল গোল্ড। তা বলব না। গোপন ব্যাপার। চলি। কয়েক পা গিয়ে ফিরে তাকাল লোকটা। সোনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে যেয়ো না, তাহলে বিপদে পড়বে।
কিশোরের দিকে তাকাল মুসা। ও কী বলল, কিছুই তো বুঝলাম। সোনার খনিটনি পাওয়া গেছে নাকি এখানে? যেটা এখনও গোপন রয়েছে?
কী জানি! চিন্তিত ভঙ্গিতে কিশোর বলল। তবে আমার মনে হয় না। এখানে কোন কথা গোপন থাকে না। সোনার খনির মত এতবড় একটা খবর… সময় হলেই জানা যাবে। চলল।
শহরের ভিতর দিয়ে হাঁটার সময় চারপাশে নজর রেখে চলল মুসা। অনেক কিছুই দেখার আছে। একটা কেবিনের ছোট্ট জানালার কাছে বসে আছে দুটো ছোট ছেলে। মার্বেলের মত গোল কালো চোখ। খানিক দূর গিয়ে একজন বুড়ো মানুষের সঙ্গে দেখা। চেহারায় বয়েসের ভঁজ। পিঠে বাঁধা লাকড়ি, বোঝার ভারে কুঁজো। আরেকটা কেবিনের পাশ কাটানোর সময় ঘরের দরজায় বসা দুটো হাস্কি কুকুর লাফ দিয়ে উঠে দুজনের দিকে দাঁত খিচানো শুরু করল।
জেনারেল স্টোরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মুসা বলল, অকারণে থিম পার্ক করতে চাইছে না ওরা। টুরিস্ট এখানে সত্যি আসবে। দেখার অনেক কিছু আছে।
স্টোরের সামনে এসে দাঁড়াল দুজনে। ঠেলা দিয়ে দরজার পাল্লা খুলল। ওপরে লাগানো একটা ঘণ্টা টুং-টাং করে বেজে উঠল। ঘরে ঢোকার পর পাল্লা লাগানোর সময় আবার বাজল ঘণ্টা।
জেনারেল স্টোরের চেহারাটা মুসার অনুমানের সঙ্গে মিলল না। এত কিছু দেখবে আশা করেনি। ঘরের মাঝখানে পেটমোটা বিরাট একটা কালো রঙের লোহার স্টোভ বসানো। সামনে রাখা দুটো পুরানো কাঠের চেয়ার। দেয়ালের অসংখ্য তাক জিনিসপত্রে বোঝাই। টিনের খাবার থেকে শুরু করে ঘড়ি, হাতুড়ি, হারিকেন, সব আছে। কাপড়ের বস্তায় ভরা ময়দা, চাল আর পোষা জানোয়ারের খাবার ঘরের কোণে স্থূপ করে রাখা। কাঠের একটা কেবিনেট আছে, তাতে ভর্তি উলের শার্ট, প্যান্ট, দস্তানা, মোজা আর লাল রঙের প্লেইড ক্যাপ। ঘরের পিছনে বুনো জানোয়ারের রোমশ চামড়ার স্থূপ। শিকারিদের কাছ থেকে কেনা।
কাউন্টারের ওপাশ থেকে বেরিয়ে এলেন যিনি, একেবারে খাপে খাপে মানিয়ে গেছেন এই পরিবেশের সঙ্গে। বয়েস পঞ্চাশ। হাড্ডিসর্বস্ব লম্বা শরীর। মস্ত টাক। শার্ট আর টাইয়ের ওপরে নীল-সাদা ডোরাকাটা অ্যাপ্রন।
জোসেফ টিনুকের বন্ধু তোমরা, দোকানী বললেন, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে এসেছ। আমি লুক স্টার্লিং। আমাকে মিস্টার স্টার্লিং ডেকে জিভে ব্যথা করার দরকার নেই। শুধু লুক বলবে।
এখানে কি কেউ মিস্টার শব্দটা সহ্য করতে পারে না নাকি? প্রশ্ন না করে পারল না মুসা।
না, পারে না। এই বুনো প্রকৃতির মধ্যে ওই শব্দটা খুব বেমানান, রীতিমত কানে পীড়া দেয়। তো, কী কী জিনিস দরকার?
এরিনার দেয়া লিস্টটা বের করে দেখাল কিশোর।
নিজেরাই তুলে নাও, লুক বললেন।
মুসাকে ইশারা করল কিশোর। লিস্ট মিলিয়ে তাক থেকে জিনিসগুলো তুলে নিতে লাগল মুসা।
সাংঘাতিক কাণ্ড, বুঝলে, ওই আগুন লাগার কথা বলছি, ওপরের তাকে রাখা কিছু টিনের খাবার নামিয়ে আনার জন্য একটা মই বেয়ে উঠে গেলেন লুক। সে-কারণেই বলি, নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকা দরকার। এমনই দরিদ্র অবস্থা শহরটার, ছোটখাট একটা দমকলবাহিনী পোরও সামর্থ্য নেই। তবে, থিম কোম্পানি যদি আসে…
আপনি কি ওদের আসা চান, মিস্টার স্টার্লিং? মুসা জিজ্ঞেস করল।
বলেছি না মিস্টার বলার দরকার নেই। শুধু লুক। হ্যাঁ, তোমার প্রশ্নের জবাব হলো, আমি নিরপেক্ষ। আমি হলাম দোকানদার। আমার জন্য সব সমান। পক্ষপাতিত্ব করে কাস্টোমারদের বিরাগভাজন হতে চাই না। দলাদলিটা ওরাই করুক। শহরবাসী যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটাই আমি নির্দ্বিধায় মেনে নেব। তবে ইলকিস বিগৃসের কথায়ও যুক্তি আছে, অস্বীকার করতে পারব না। ওর কোম্পানি আলাস্কার বহু জায়গাতেই এ ধরনের টুরিস্ট স্পট বানিয়েছে। লোকে কী চায় ওরা জানে…
দরজার ঘণ্টা বাজল। থেমে গেলেন তিনি। ঘরে ঢুকল একটা লোক, এখানকার রোদ আর বরফের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে, দেখেই বোঝা যায়। গায়ে পুরানো মলিন পার্কা। কাউন্টারে রাখা বড় একটা বয়েম দেখিয়ে পঁচিশ সেন্ট দামের ক্যাণ্ডি চাইল।
ক্যাণ্ডি বের করে দিলেন লুক। লোকটার হাত থেকে পাঁচ সেন্টের পাঁচটা মুদ্রা নিয়ে ঝনাৎ করে ড্রয়ারে ফেললেন। লোকটা বেরিয়ে গেলে বললেন, ওর নাম জো সারটন। চার ছেলেমেয়ের বাপ। ওদের মুখে খাবার যোগাতে হয়। কাপড়ের অবস্থা দেখেই তো বুঝলে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। থিম পার্ক হলে ভাল চাকরি পাবে। টাকা আসবে। অবস্থা ফিরে যাবে।
তারমানে থিম পার্কের পক্ষে ভোট দিচ্ছে ও? কিশোর বলল।
অন্যদিকে চোখ ফেরালেন লুক। উঁহু। জো স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে হ্যাঁ ভোটের মধ্যে সে নেই। কিন্তু ভাল থাকতে চাইলে ওর হ্যাঁ ভোটই দেয়া উচিত।
এরিনার লিস্টের সমস্ত জিনিসপত্র দুটো কার্ডবোর্ডের বাক্সে প্যাকেট করে দিলেন লুক। একটা কাচের বাক্স ভর্তি অ্যাথাবাস্কান হস্তশিল্পের দিকে মুগ্ধ চোখে কিশোরকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললেন, অনেক দামি ওগুলো। নেবে?
মেরিচাচীর জন্য একটা শো-পিস নেয়ার কথা ভাবছে কিশোর। হাসল। এখন না। পরে। জিনিসগুলো খুব সুন্দর।
ক্যালকুলেটর বের করে জিনিসের দাম হিসেব করলেন লুক। বিল বানালেন। টিনুকদের বাকির খাতায় লিখে রাখব। তোমরা এসো আবার। বাড়ি ফেরার আগে এসো। সস্তায় ভাল কী দেয়া যায়, চিন্তা করে দেখব।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, লুক, কিশোর বলল।
দুটো বাক্স নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল মুসার পিছন পিছন।
বাইরে আসতেই বিগসের সঙ্গে দেখা। বলল, এমন কোনও জিনিস নেই যা লুকের দোকানে পাবে না। সব ধরনের খবরাখবর আর মন্তব্যও পাবে, বিনে পয়সায়। সম্ভব হলে এর জন্যও পয়সা নিত। মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, কিন্তু ভীষণ লোভী। থিম পার্কের কথা কিছু বলল নাকি? পক্ষে না বিপক্ষে?
পক্ষে-বিপক্ষে বোঝা গেল না, মুসা জানাল। তবে থিম পার্ক হলে শহরের গরিব মানুষদের দুঃখ ঘুচবে, এ কথাটা জোর দিয়েই। বললেন।
বিগ বলল, আমাদের নিজেদের স্বার্থ তো আছেই। তবে সত্যি সত্যি আমরা গিটারের মানুষকে সাহায্য করতে চাই। বাইরের সাহায্য ওদের প্রয়োজন।
কিন্তু আপনার কোম্পানি থিম পার্ক বানাতে গেলে তো অনেক কিছু বদলাবে, তাতে জায়গাটার মৌলিকত্ব নষ্ট হবে, কিশোর বলল।
হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে উন্নতি যে হবে, এটাও তো ঠিক। যে কোনও পরিবর্তনের কথা শুনলেই ভয় পায় লোকে, নতুন কিছুকে গ্রহণ করতে শঙ্কিত হয়। আমার কাজ হলো ওদের বুঝিয়েশুনিয়ে ভুল ভাঙাননা, থিম পার্কের পক্ষে ভোট দিতে রাজি করানো; বোঝননা, এখানে থিম পার্ক হওয়াটা ওদের জন্য কতটা জরুরি।
কিন্তু কী করে বোঝাবেন?
কেন, ভাল ভাল কথা বলব। ওদের উন্নতির কথা শোেনাব, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাব। আচ্ছা, এখন যাই। সময় নেই, পরে কথা বলব। হোম অফিসের সঙ্গে কথা বলা দরকার। টেলিফোন-টেলিগ্রাফ কিছুই তো নেই গ্লিটারে, লুকের টু-ওয়ে রেডিওটাই একমাত্র ভরসা। আমাদের থিম পার্ক হলে টেলিফোন সুবিধা পাবে এখানকার মানুষ। আদিমতা বর্জন করলে আমরা আধুনিকতার সুযোগ-সুবিধা পৌছে দেব ওদের কাছে।
দোকানে ঢুকে গেল বিগস্।
হাঁটতে লাগল কিশোর ও মুসা। কিছুদূর এগোতেই চিৎকার শুনে পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল দুজনে। নদীর ধারে লম্বা একটা নৌকার কাছে। বসে বরফ চাপড়ে বিলাপ করতে দেখল জো সারটনকে।
তাড়াতাড়ি বাক্স দুটো মাটিতে নামিয়ে রেখে দৌড় দিল কিশোররা। বরফে ঢাকা পিচ্ছিল নদীর ঢালে বসে রয়েছে জো সারটন। পাশে পড়ে আছে একটা দোমড়ানো তেরপল। নৌকার ওপর থেকে তুলে এনেছে।
পাড়ের ওপর থেকেই জিজ্ঞেস করল কিশোর, কী হয়েছে?
ফিরে তাকাল জো। আঙুল তুলে নৌকাটা দেখাল।
নৌকার তলায় চোখ পড়তে থমকে গেল কিশোর। অসংখ্য ফুটো।
বিলাপ করতে করতে জো বলল, এখন আমার কী হবে! এমনভাবে ফুটো করেছে, এই নৌকা আর মেরামত করা যাবে না। আমি এখন মাছ ধরব কী দিয়ে! ছেলেপুলে নিয়ে না খেয়ে মরব!
কিশোর জিজ্ঞেস করল, কে করল এই ফুটো?
তা কী আর দেখেছি? দেখলে কি আর করতে দিতাম?
জোর চিৎকারে লোক জমায়েত শুরু হলো। নৌকার অবস্থা দেখে সবাই থ। কীভাবে ফুটো হয়েছে জানতে চায় সবাই।
এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, জো বলল। তেরপলটা নৌকার ওপর থেকে সরানো দেখে টেনে দিতে গিয়েছিলাম। দেখি এই অবস্থা। বলেই আবার বিলাপ শুরু করল, হায়রে! কে আমার এতবড় সর্বনাশ করল রে!
ফুটোগুলো পরীক্ষা করল মুসা। কিশোরকে বলল, গজাল দিয়ে করেছে।
কিশোর জিজ্ঞেস করল, কখন ফুটো করল? রাতে? কিন্তু গজালের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে পিটানোর শব্দ তো শোনা যাওয়ার কথা।
চারপাশে তাকাল ও। কোথায় কী আছে দেখল। জেনারেল স্টোরটা বাদ দিলে কাছাকাছি দুটো কেবিন আছে। একটা বন্ধ। লোক থাকে কি না বোঝা গেল না। অন্যটার চিমনি দিয়ে হালকা ধোঁয়া উঠছে।
মিস্টার সারটন, কিশোর জিজ্ঞেস করল, শেষ কখন নৌকাটা ভাল দেখে গেছেন আপনি?
জবাব দিল না জো। যেন কিশোরের কথা শুনতেই পায়নি। আসছে বসন্তে মাছ ধরার মৌসুমে কী ভয়ানক অসুবিধেয় পড়বে লোকটা অনুমান করে কষ্ট হলো কিশোরের। আবার জিজ্ঞেস করল, শেষ কখন নৌকাটা ভাল দেখে গেছেন?
জো বলল, মনে নেই। সম্ভবত রোববারে।
সেদিন নৌকাটাকে ভাল দেখেছিলেন?
দেখেছি।
আপনাকে বিপদে ফেলার জন্যই কি কেউ নৌকাটা নষ্ট করে দিয়েছে, কি মনে হয় আপনার?
জানি না, জানি না, আমি কিছু জানি না! অস্থির ভঙ্গিতে দুই হাত নাড়তে নাড়তে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল জো। প্রশ্ন শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গেছি আমি, আর ভাল লাগে না। সবারই খালি প্রশ্ন আর প্রশ্ন! ইডিটাররোডে কে জিতবে-জোসি না টেড? এ বছর স্যামনের মৌসুমে কেমন মাছ পড়বে? কাকে ভোট দেব? এখন শুরু হয়েছে নৌকা নিয়ে প্রশ্ন। অসহ্য!
এত প্রশ্ন কারা করে আপনাকে?
এই যে, তুমিই তো করছ। তোমার মত এমন অনেকেই আছে। অধৈর্য ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল জো। তেরপল তুলে নৌকাটা ঢেকে দিল আবার। যদিও এ নৌকা ঢেকে রাখার আর কোন যুক্তি দেখতে পেল না কিশোর।
দর্শকরা চলে যাচ্ছে। বেশির ভাগই শহরের দিকে। সবচেয়ে কাছের কেবিনটাতে গিয়ে ঢুকল এক মহিলা।
চলো তো, মুসাকে বলল কিশোর, একটু গোয়েন্দাগিরি করে আসি।
মুসাকে নিয়ে ছোট কেবিনটার কাছে এসে দাঁড়াল ও। দরজায় টোকা দিল।
খুলে দিল এক মহিলা। কী চাই?
নিজেদের পরিচয় দিয়ে কিশোর বলল, জো সারটনের নৌকাটা কে নষ্ট করেছে জানার চেষ্টা করছি আমরা। গত কয়েক দিনে কখনও হাতুড়ি পিটানোর শব্দ কানে এসেছে আপনার? বিশেষ করে রাতের বেলা?
হাতুড়ির শব্দ শুনিনি, তবে দুই রাত আগে লুক স্টার্লিং লাকড়ি কাটছিল।
সেটা কি অস্বাভাবিক? মুসার প্রশ্ন।
অস্বাভাবিকই তো, মহিলা বলল। সব সময় দিনের বেলায়ই লাকড়ি কাটে ও। ইলেকট্রিক করাত দিয়ে।
লাকড়ি কাটতে দেখেছেন তাঁকে? না শুধু করাতের শব্দ শুনেছেন?
শুধু করাতের শব্দ, ভুরু কোঁচকাল মহিলা। কেন, তোমাদের কি ধারণা করাত দিয়ে জোর নৌকার তলা ফুটো করেছে?
উঁহু! জবাব দিল মুসা। করাত দিয়ে ওভাবে ফুটো করা যায় না।
মহিলাকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এল ওরা।
যাওয়ার পথে লুকের দোকানে থামল দুজনে। লাকড়ি কাটার কথা জিজ্ঞেস করল। লুক জানালেন, তিনি লাকড়ি কাটেননি। রাতের বেলা কাটেনও না। মহিলা করাতের শব্দ শুনে থাকলে ভুল শুনেছে। হতে পারে মুজ হরিণের ডাক শুনেছে, হেসে বললেন। ভুল করে বোকা মুজটা হয়তো লোকালয়ে ঢুকে পড়েছিল।
আপনি ওই বোকা মুজটার ডাক শুনেছেন?
না। আমার বেডরুমটা দোতলার এমন জায়গায়, রাস্তায় খুব জোরে কোন শব্দ না হলে শোনা যায় না।
দ্বিতীয়বার লুকের দোকান থেকে বেরিয়ে এল কিশোর ও মুসা। দোকানের বাইরে ফেলে যাওয়া টিনুকদের বাক্স দুটো নিয়ে কেবিনে ফিরে চলল।
তুষারে ঢাকা নির্জন পাহাড়ী রাস্তা। দুই পাশে কেবিন। ঠাণ্ডার ভয়ে দরজা লাগানো। মুসা বলল, দিনের বেলায়ই লোক চলাচল নেই। রাতে অত ঠাণ্ডার মধ্যে কে বেরোবে? লুকের বোকা মুজের ধারণাটাই বোধহয় সত্যি।
কিন্তু মুজ তো আর গজাল ঠুকে নৌকা ফুটো করতে পারবে না, কিশোর বলল। জোর নৌকাটা যে নষ্ট করেছে সে মানুষ। জানে, রাতে বেরোলে কারও চোখে পড়বে না। সহজেই কাজ সেরে চলে যেতে পারবে।
আচ্ছা, জোর নৌকা নষ্ট করা, টিনুকদের কেবিনে আগুন লাগানো আর জোসির ঘরে লাকড়ি ছুঁড়ে মারার মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই তো?
থাকতে পারে, চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। কাকতালীয় ঘটনা আমি বলব না একে। কী রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এখানে বাস করে মানুষ, দেখেছ? একটানা দীর্ঘ শীত। সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। কর্মহীন ঘরে বসে থাকা। স্নায়ুতে ভীষণ চাপ পড়ে। মাথায় গোলমাল হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। আর পাগল হয়ে গেলে কী না করে মানুষ। যাদের দেখতে পারে না তাদের ওপর আক্রোশ মেটানোর চেষ্টা যদি করে থাকে এ রকম কোনও পাগল, আমি অবাক হব না।
ভাবছি, ব্ৰিণ্ডল জ্যাকের সঙ্গে জো সারটনের সম্পর্কটা কেমন? নিজেকেই প্রশ্ন করল মুসা। জোসি হয়তো বলতে পারবে।
অর্ধেক পথ এসে জোসির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওদের। জোসি বলল, এলে। আমি তো আরও ভাবলাম, হারিয়েই গেলে বুঝি তোমরা।
জো সারটনের নৌকাটার কথা জোসিকে জানাল মুসা। তারপর জ্যাক আর জোর সম্পর্ক নিয়ে যে কথাটা ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল এতক্ষণ, সেটা বলল।
বহু বছর ধরেই ওদের সম্পর্ক ভাল না, জোসি জানাল। তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। জ্যাকের সম্পর্ক কারও সঙ্গেই ভাল না, একমাত্র টেডের বাবা মিস্টার সিউল ছাড়া।
কিশোরের মনে পড়ল, জো বলছিল ইডিটারোড নিয়ে নানারকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে ওকে। ডগজে রেসের সঙ্গে জো কোনভাবে জড়িত কি না, জোসিকে জিজ্ঞেস করল।
ও একজন প্রথম শ্রেণীর রেসার, জোসি বলল। আশপাশের পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে ওর মত মাশার নেই। হাস্কি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান। তবে এখন আর মাশিং করতে পারে না। কয়েক বছর আগে ছেলের অপারেশনের টাকা জোগাড়ের জন্য বাধ্য হয়ে গাড়িসহ কুকুরগুলোকে বিক্রি করে দিয়েছিল। বেচারা!
দুঃখজনক! আফসোস করল মুসা। কিন্তু সে যদি আর রেসে অংশ গ্রহণ না-ই করে, লোকে ইডিটাররোড রেসের ব্যাপারে ওকে প্রশ্ন করে কেন?
করবেই তো। সে রেস বিষেশজ্ঞ। সম্ভবত, কার ওপর বাজি ধরা উচিত সেটা বুঝতে চায় লোকে। ইডিটারোডের ডগ রেস এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় রেস। বহু টাকার জুয়া চলে। প্রতি বছর বহু লোক ধনী হয়, আবার বহু লোক সর্বস্বান্তও হয়। আমার আর টেডের ওপরও গ্লিটারের লোকে এবার বাজি ধরবে, জানা কথা।
কথা বলতে বলতে কেবিনে পৌঁছল ওরা। বাক্স নিয়ে ভিতরে ঢুকল। জোসি জিজ্ঞেস করল, আরেকবার প্র্যাকটিস রানে গেলে কেমন হয়? পরিশ্রম না করালে চর্বি জমে যাবে কুকুরের গায়ে, অলস হয়ে পড়বে ওরা।
ভালই তো হয়,মুসা বলল। আমি রাজি।
কিশোর বলল, আমারও কোন আপত্তি নেই।
কুকুরের গলায় লাগাম পরাতে জোসিকে সাহায্য করল দুজনে। নদীতে উঠে গতি বাড়াল কুকুরগুলো। লেজ উঁচু করে দিয়েছে। হাঁ করা চোয়ালের এক কোণ দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে লাল জিভ।
যাচ্ছি কোথায়? কিশোরের প্রশ্ন।
মিঙ্ক রিভারে, জোসি জানাল। স্লেজের পিছনের রেইলে দাঁড়িয়েছে ও। বার বার পা নামিয়ে ঠেলা দিচ্ছে স্লেজের গতি বাড়ানোর জন্য। বেশি দূরে না।
কত দূর? মুসা জানতে চাইল।
এই পাঁচ মাইল। হাস্কির জন্য এটা কোন দূরত্বই না।
তা তো বুঝতেই পারছি, কিশোর বলল। ইডিটারোড রেসে এগারোশো মাইল দৌড়াবে যারা, তাদের জন্য পাঁচ মাইল আর কী। কটা দল অংশ নিচ্ছে এবার?
নদীর ওপরের বরফের স্তর মসৃণ নয় মোটেও। অসমতল। এবড়ো-খেবড়ো। টিলা-টক্করও আছে। লাফিয়ে উঠল স্লেজ। টিলা পেরিয়ে আসার পর কিশোরের কথার জবাব দিল জোসি, সত্তরআশিটা দল হবে।
হিসেব করল মুসা, সত্তর-আশিটা দলে অন্তত হাজারখানেক কুকুর। অ্যাংকারেজে একটা দেখার মত দৃশ্য হবে
নদীর ওপাড়ে তাকাল ও। পাহাড়ে তো তেমন তুষার দেখছি না। গলে যায় নাকি?
থাকলে তো গলবে, জোসি বলল। শুনে অবাক হবে, আমাদের এদিকটা আসলে এক ধরনের মরু অঞ্চল। বছরে বারো ইঞ্চির বেশি তুষারপাত হয় না। এই বরফ তো তৈরি হয়েছে নদীর পানি জমে।
সামনে রাস্তাটা দুই ভাগ হয়ে গেছে। চেঁচিয়ে উঠল জোসি, জি, ডায়মণ্ড, জি!
দলের কুকুরগুলোকে নিয়ে ডান দিকের পথটা ধরে ছুটল ডায়মণ্ডহার্ট।
আরও মাইল দুই এগোনোর পর ইউকন থেকে সরে এল জোসি, অপেক্ষাকৃত সরু আরেকটা নদীর ওপর দিয়ে স্লেজ ছোটাল। বন্ধুদের জানাল, মিংক রিভারে যাবার এটা শর্টকাট।
মিনিট দশেক পর গতি কমিয়ে দিল কুকুরগুলো। চিন্তিত মনে হলো জোসিকে।
কী হয়েছে? জানতে চাইল কিশোর। দ্বিধা করছে জোসি। সামনে নরম বরফ।
বকের মত গলা বাড়িয়ে দিয়ে সামনে তাকাল কিশোর। ওর চোখে বরফের স্তরে কোন তফাৎ ধরা পড়ল না।
নদীর তলায়ও ঝর্না আছে এখানে, জানো বোধহয়। বরফের স্তর পাতলা হয়ে যাওয়ার কারণটা ব্যাখ্যা করল জোসি, সেগুলো থেকে গরম পানি বেরিয়ে নীচের দিকের বরফ গলিয়ে দেয়। বছরের এ সময়টাতেই এ ঘটনা বেশি ঘটে।
সামনে তো আর এগোনো যাবে না বোঝা যাচ্ছে, মুসা বলল। কী করবে এখন? গাড়ি ঘোরাবে?
এমন একটা জায়গায় চলে এসেছে, ঘোরানোটাও আর সহজ নয়, বুঝে গেছে কিশোর। এখন কুকুরগুলোকে ঘোরাতে হলে পাতলা বরফে উঠতেই হবে।
ইজি, ডায়মণ্ড, ইজি! মোলায়েম স্বরে আদেশ দিল জোসি।
দৌড়াননা বাদ দিয়ে হেঁটে চলেছে কুকুরগুলো। চোখে অস্বস্তি। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।
ইজি, ডায়মণ্ড, সাবধান করল জোসি।
থেমে গেল ডায়মণ্ডহার্ট। চারপাশে তাকাতে লাগল।
হাইক! হাইক! চিৎকার করে উঠল জোসি। নদীর কিনারের দিকে সরে যেতে চায়।
কিছু যদি ঘটে… বলতে গেল জোসি।
বন্দুকের গুলি ফোটার মত শব্দ হলো। ঝট করে ফিরে তাকাল কিশোর। স্লেজের ডান পাশের বরফে চওড়া একটা ফাটল চোখে পড়ল। তীরের কাছে নিরাপদ জায়গায় পৌছে গেছে কুকুরগুলো। কিন্তু নদীর মাঝখানের পাতলা বরফ স্লেজের ভার সইতে পারছে না।
জোসি, কী করব আমরা? চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। নেমে যাব?
না-না! চেঁচিয়েই জবাব দিল জোসি। বসে থাকো, যেভাবে আছ!
জমাট বাতাসে প্রতিধ্বনি তুলল যেন তীক্ষ্ণ একটা শব্দ। অনেকটা বন্দুকের গুলির মত, তবে আরও জোরে। বরফের স্তর ভেঙে গেছে। লাফিয়ে নামল জোসি। রেইল চেপে ধরে স্লেজটাকে আটকানোর চেষ্টা করল।
বরফের ভাঙা স্তরের সঙ্গে সঙ্গে ডান পাশে কাত হয়ে যাচ্ছে, স্নেজু। পিছলে নেমে যেতে শুরু করল পানির দিকে।
উঠে দাঁড়াল মুসা। দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে দিয়ে ভারসাম্য বজায়ের চেষ্টা করল। কাজ হলো না। স্লেজের রেইল এসে ওর গোড়ালি ধরে টান মারল। পিছনে উল্টে পড়ল ও। ফুসফুসের সমস্ত বাতাস বেরিয়ে গেল। বরফ-শীতল পানি যেন গিলে নিল ওকে।
বরফের কিনার খামচে ধরার চেষ্টা করল ও। বরফের নীচে আটকে পড়ে বাস্তবে কাউকে মরতে দেখেনি, তবে সিনেমায় দেখা ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলো ফুটে উঠল চোখের সামনে। নদীর তলায় জুতো ঠেকল। পানি বেশি না। সোজা হয়ে দাঁড়ালে বুক পানি হয়। দশ ফুট চওড়া একটা ফোকর তৈরি হয়েছে বরফে। কিশোর আর জোসির নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে লাগল।
ভয় নেই, দাঁড়িয়ে থাকো, জবাব দিল কিশোর। তোমাকে তুলে আনার ব্যবস্থা করছি আমরা।
বরফের মত ঠাণ্ডা পানি মারাত্মক বিপজ্জনক। দেহের অতি মূল্যবান উত্তাপ শুষে নিয়ে দ্রুত শীতল করে ফেলছে দেহটাকে। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে, নিজেকে বোঝাল মুসা। ওপরে ওঠার জন্য দাপাদাপি করলে আরও দ্রুত ফুরাবে জীবনীশক্তি।
ধীরে ধীরে পানি আর ভাঙা বরফের টুকরো বুক দিয়ে ঠেলে কিনারের দিকে এগোতে পারে, কিন্তু সাহস করল না। স্রোতের টানে বা অন্য কোনভাবে যদি ডুবে গিয়ে বরফের স্তরের নীচে চলে যায়, আর বেরোতে পারবে না।
দাঁড়িয়ে রইল ও। গায়ের চামড়ায় সুচ ফুটাচ্ছে ভীষণ ঠাণ্ডা পানি।
ওদিকে জেটাকে আটকে ফেলেছে কুকুরের দল, পানিতে পড়তে দেয়নি–স্লেজের মধ্যে পাগলের মত কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে কিশোর ও জোসি। অমন করে কী খুঁজছে ওরা, বুঝতে পারছে না মুসা। অবশেষে সোজা হয়ে দাঁড়াল জোসি। হাতে একটা কুড়াল। দৌড় দিল বনের দিকে।
ও এখন যাচ্ছে কোথায়? আমি এদিকে জমে মরছি! চিৎকার করে বলল মুসা।
তোমাকে বাঁচানোর জিনিস আনতে গেছে, কিশোর বলল। নড়াচড়া কোরো না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো।
পা অবশ! সাড়া পাচ্ছি না! দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাচ্ছে মুসার।
হামাগুড়ি দিয়ে মুসার দিকে এগোতে শুরু করল কিশোর। দূরত্ব মাত্র কয়েক ফুট, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সেটাও অনেক। চড়চড় শব্দ করে উঠল বরফ।
ফিরে যাও, কিশোর! চিৎকার করে উঠল মুসা। বরফ তোমার ভার সইতে পারছে না।
চুপ করে থাকো। আমার কাজ আমাকে করতে দাও।
তুমিও যদি পানিতে পড়ে যাও, তাতে আমার কোন উপকার হবে। তারচেয়ে জোসির জন্য অপেক্ষা করো। ও জানে, এখন কী করা দরকার, আমরা জানি না।
ঠিকই বলেছে মুসা। অনিচ্ছাসত্ত্বেও পিছিয়ে গেল কিশোর। বার্চের একটা লম্বা ডাল হাতে ছুটে বেরোতে দেখা গেল জোসিকে। দৌড়ে আসতে লাগল।
কিশোর, নদীর পাড়ে পা রেখে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ো, জোসি বলল। শক্ত করে আমার গোড়ালি চেপে ধরে রাখবে।
কী করতে চাও?
বরফের স্তরে দেহের ওজন সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়া গেলে সহজে ভাঙবে না বরফ। উপুড় হয়ে শুয়ে খুব সাবধানে ইঞ্চি ইঞ্চি করে মুসার দিকে এগোতে শুরু করল জোসি। ডালটা সামনে বাড়িয়ে দিল। মুসা, দেখো তো নাগাল পাও নাকি?
ডান হাত যতটা সম্ভব লম্বা করে দিল, মুসা। আঙুলের মাথা থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে রয়েছে ডালের মাথা। কিন্তু এখন এটাকেও বিশাল দূরত্ব মনে হচ্ছে। পারছি না তো!
আরেকটু আগে বাড়ল জোসি। বিপজ্জনক জায়গায় চলে এসেছে। এখন?
আবার হাত বাড়াল মুসা। ডালের মাথা এখনও ওর নাগালের বাইরে।
প্রাণপণে জোসির গোড়ালি চেপে ধরে রেখে প্রায় ককিয়ে উঠল কিশোর, চেষ্টা করো, মুসা। ডালটা ধরো।
বড় করে দম নিল মুসা। দেহের শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছে।
ডালটা আরও ইঞ্চি দুয়েক ঠেলে দিল জোসি। এবার?
ডালের মাথায় লক্ষ্য স্থির করল মুসা। তারপর প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে ঝাপ দিল। হাত ফসকালে সোজা চলে যেত বরফের তলায়, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ধরে ফেলল ডালের মাথা। পা উঠে গেল ওপরে। তাতে দেহটা পুরোই ডুবে গেল বরফ-শীতল পানিতে। শরীর অবশ হয়ে যাওয়াতে ঠাণ্ডাও আর অতটা টের পাচ্ছে না। বুঝতে পারছে, মোটেও ভাল লক্ষণ নয় এটা।
এই তো পেরেছ! ধরে রাখো! খবরদার, ছাড়বে না! চিৎকার করে উঠল কিশোর।
দুই হাতে ধরো, জোসি বলল।
বড় করে দম নিল মুসা। নদীর পিচ্ছিল মাটিতে পা ঠেকাল আবার। ভালমত ধরতে না পারলে ডাল থেকে হাত ছুটে যাবে। অন্য হাতটাও বাড়িয়ে দিল। ডালের গায়ে শক্ত হয়ে চেপে বসল ওর আঙুল।
গুড! ধরে রাখো! ছাড়বে না! জোসি বলল। ইঞ্চি ইঞ্চি করে পিছানো শুরু করল। ডালের সঙ্গে মুসাকেও টেনে নিয়ে আসতে লাগল।
জোসিকে আরও তাড়াতাড়ি পিছাতে সাহায্য করল কিশোর। মুসার মনে হলো অনন্তকাল ধরে টানার পর অবশেষে পানি থেকে তুলে আনা হলো ওকে।
আনন্দে চেঁচিয়ে উঠে মুসার পিঠ চাপড়ে দিল কিশোর।
জোসি বলল, এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা যাবে না। ডায়মণ্ডহার্টকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে কিশোর-মুসাকে নিয়ে শক্ত জায়গায় চলে এল ও।
কম্বল দরকার, কিশোর বলল।
থরথর করে কাঁপছে মুসা। ভীষণ শীত থেকে বাঁচার জন্য কুঁকড়ে ফেলেছে শরীর।
সবার আগে ওর কাপড় খোলা দরকার, জোসি বলল।
এই ঠাণ্ডার মধ্যে! কিশোর অবাক।
যা বলছি, করো। ভিজে কাপড় গায়ের উত্তাপ শুষে নিচ্ছে। যত দেরি করবে ততই ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। কিশোর; স্লেজে ইমারজেন্সি কিট আছে, জলদি আনো। ওটার মধ্যে স্পেস ব্ল্যাঙ্কেট পাবে। স্পেশাল কম্বল। ওর কাপড়-চোপড় সব খুলে ফেলে গায়ে কম্বল জড়াও। আমি আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করি।
মুসার আঙুল অবশ। জিপার, বোতাম, কিছুই খোলার ক্ষমতা নেই। কাপড় খুলতে ওকে সাহায্য করল কিশোর। তারপর আলট্রাথিন মেটালিক কম্বলটা জড়িয়ে দিল গায়ে।
দাঁতের কাঁপুনি বন্ধ করতে পারছে না মুসা। এর মধ্যেও জোক বলে শীত ভুলে থাকার চেষ্টা করল। হাসল কিশোর। কথা বোলো না।
না বলে পারছি না তো…
বাদামি রঙের এক গুচ্ছ ঘাস নিয়ে ফিরল জোসি। একটা সমতল পাথর থেকে বরফ সরিয়ে ঘাসগুলো রাখল তার ওপর।
কী ঘাস? জানতে চাইল কিশোর।
মেঠো ইঁদুরের বাসা, জোসি বলল। জ্বলে কী রকম দেখো।
শুকনো ডাল ভেঙে ঘাসগুলোর ওপর ছড়িয়ে দিল ও। তারপর পানি নিরোধক একটা হোল্ডার থেকে দিয়াশলাই বের করে আগুন ধরাতে ব্যস্ত হলো।
চোখের পলকে আগুন ধরে গেল ঘাসে। তাতে ডালপাতা ফেলে আগুনটা বাড়াল জোসি। তৈরি হয়ে গেল অগ্নিকুণ্ড। আগুনের ধার ঘেঁষে বসল তিনজনে। ওদের দেহ যেন শুষে নিতে লাগল প্রাণদায়ী সেই উত্তাপ। হাত-পায়ের সাড় ফিরতে মুখ তুলে তাকাল মুসা। হাসি ফুটল মুখে। কিশোর আর জোসির মাঝেও সংক্রামিত হলো ওর হাসি।
মুসার ভিজা কাপড় আগুনের আঁচে শুকাতে দিয়ে নাস্তা খেতে বসল ওরা। ইমারজেন্সি কিট থেকে বের করল পিচফল আর হার্ডট্যাক ক্র্যাকার অর্থাৎ লবণ মাখানো শুকনো গরুর মাংসের টুকরো। একটা ক্যানে কিছু তুষার গলিয়ে নিয়ে স-নিডলের চা বানাল জোসি। অবশেষে শহরে ফিরে যাওয়ার মত বল পেল মুসা শরীরে। আগুন নিভিয়ে, স্লেজ ঘুরিয়ে, শহরে যেতে তৈরি হলো ওরা।
একদিনের জন্য যথেষ্ট প্র্যাকটিস হয়েছে, কি বলল? হেসে ভুরু নাচাল জোসি।
একদিন না, তিন দিন, কিশোর বলল।
উঁহু, মাথা নাড়ল মুসা, তিন মাস।
যে পথে এসেছিল, সে-পথেই ইউকনে ফিরে এল ওরা। নদীর মাঝখান দিয়ে চলল। আর কোন বিপত্তি ঘটল না। নিরাপদেই ওদেরকে পার করে আনল ডায়মণ্ডহার্ট। হঠাৎ গোঁ গোঁ করে উঠল কুকুরটা। বার বার ফিরে তাকাচ্ছে জোসির দিকে।
জোসি বলল, হ্যাঁ, আমিও দেখেছি!
কাকে? কিশোরের প্রশ্ন।
ডায়মণ্ডহার্টের সঙ্গে কথা বলছি আমি, জোসি বলল। আমাদের দিকেই আসছে দলটা। ডায়মও আগে দেখেছে। দেখে আমাকে জানিয়েছে।
কী করে বুঝলে তুমি? জিজ্ঞেস করল মুসা।
প্র্যাকটিস আর অভিজ্ঞতা দিয়ে, জবাব দিল জোসি।
কই, আমি তো কিছু দেখছি না, কিশোর বলল। আকাশ আর বরফ ছাড়া।
গতি কমাল না ডায়মণ্ডহার্ট। তবে অন্য দলটাকে দেখার জন্য সারাক্ষণ মাথা উঁচু করে রাখল।
এ পথেই আসছে এখনও? জোসিকে জিজ্ঞেস করল মুসা।
হ্যাঁ, জোসি জবাব দিল। চিনতে পেরেছি ওকে। টেড।
এত দূর থেকে চিনলে? মুসা অবাক। শুধু ওই কালো বিন্দুগুলো দেখে?
হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল জোসি। এ সব আমাদের শিখতে হয়। এখানে দূর থেকে যে চিনতে পারবে না, যে কোন সময় ভয়ানক বিপদ হতে পারে তার। আমি এখান থেকেই বলে দিতে পারব দলটা কত বড়, কত গতিতে ছুটছে, কত দক্ষ মাশার।
কিন্তু টেড এখানে কী করছে? কিশোরের প্রশ্ন।
প্র্যাকটিস, জবাব দিল জোসি।
পঞ্চাশ গজের মধ্যে চলে এল টেড। ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে রাস্তা ছাড়ার কোন ইচ্ছেই নেই ওর। ঝামেলা করতে চাইল না জোসি। ডায়মণ্ডহার্টকে থামতে বলে ব্রেক চাপল। জেটা রাস্তা থের্কে নামাতে জোসিকে সাহায্য করল কিশোর ও মুসা। জোসি কুকুরগুলোকে রাস্তা থেকে সরিয়ে এনে চুপ থাকতে বলল।
সোজা ওদের দিকে ছুটে এল টেড। গতি কমাল না। দ্রতা করেও একটা কথা বলল না কারও সঙ্গে।
জোসি চুপ। তাকিয়ে আছে কিশোর-মুসা। রাস্তা দখল করে রেখে নিজেকে শক্তিমান প্রমাণের চেষ্টা করছে টেড। তবে জোসি বুদ্ধিমান। এ মুহূর্তে কিছু বলার অর্থ ঝগড়া বাধানো। সেটা এড়াতে চাইছে ও। ইডিটারোড রেসের আগে মারামারি করে কুকুরগুলোর ক্ষতি করতে রাজি নয়।
বারো ফুটের মধ্যে চলে এল টেড। হাত তুলে ওকে থামার ইশারা করল জোসি। সামনের দিকে নজর টেডের। জোসিকে দেখেও না দেখার ভান করল। শ্লেজের হুস হুস শব্দ তুলে পাশ কেটে বেরিয়ে গেল।
এত অভদ্র তো দেখিনি! রেগে গেল মুসা।
সাবধান করতে চেয়েছিলাম ওকে, যাতে পাতলা বরফে না ওঠে, গম্ভীর শোনাল জোসির কণ্ঠ।
উঠুক। ঠাণ্ডা পানিতে পড়লে বুঝবে মজা, কিশোর বলল। মরবে, কি বলো? মুসা তো বেঁচে গেল।
এখনও পুরোপুরি বাঁচিনি, পরিস্থিতি হালকা করার জন্য হাসল মুসা। কাপড়ই শুকায়নি ঠিকমত। আরাম পাচ্ছি না।
স্লেজটা রাস্তায় তুলল জোসি। আবার ছুটল।
শহরটা নজরে আসতেই গতি বেড়ে গেল কুকুরগুলোর। লেজ নাড়াও বেড়েছে। শক্তিশালী পেশিতে নতুন শক্তি সঞ্চারিত হয়েছে।
নদীতীরের রাস্তা ধরে দলটাকে ছুটিয়ে নিয়ে এল ডায়মণ্ডহার্ট। কেনলের কাছে এসে থামল।
লাগাম খুলতে জোসিকে সাহায্য করল কিশোর ও মুসা। কুকুরগুলোকে খাবার আর পানি দিল জোসি। তারপর কিশোরদের নিয়ে ঘরে ফিরে চলল।
কেবিনের কাছাকাছি প্রায় চলে এসেছে ওরা, হাত তুলল মুসা, মুন না?
জোসি বলল, কিছু হয়েছে!
মুন ওদের দেখে দৌড়ে আসতে শুরু করল।
জোসি, কয়েক গজ দূরে থাকতে চেঁচিয়ে উঠল মুন, জলদি চলো! বাবার শরীর খুব খারাপ।
কী হয়েছে?
জানি না। খাওয়ার পর থেকে কেমন করছে। চোখে পানি এসে গেছে মুনের। জোসি, আমার ভয় লাগছে। বাবা যদি মরে যায়!
একটা মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে মুনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল জোসি। পরক্ষণে ঝটকা দিয়ে ঘুরে কেবিনের দিকে ছুটল। পিছনে ছুটল কিশোর ও মুসা। হুড়মুড় করে কেবিনের দরজা দিয়ে ঢুকে থমকে দাঁড়াল।
বিছানায় কুঁকড়ে পড়ে আছেন জেফরি। দুই হাতে পেট চেপে ধরে গোঙাচ্ছেন। পাশে বসা এরিনা। ভিজা কাপড় দিয়ে বার বার জেফরির কপাল মুছে দিচ্ছেন।
এগিয়ে গিয়ে জেফরির কাঁধে হাত রাখল জোসি। চাচীকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
মাথা নাড়লেন এরিনা। জানি না। হঠাৎ করেই বলল পেটে ব্যথা। তারপর থেকে বেড়েই চলেছে। বিছানায় থাকতে পারছে না।
আমার ভয় লাগছে, বলে কিশোর-মুসার দিকে তাকাল মুন। কিছু একটা করা দরকার।
উঠে দাঁড়ালেন এরিনা। জোসি, এ অবস্থায় তোমার চাচাকে আমার একা রেখে যাওয়া উচিত হবে না। বনে যাবে? কী আনতে হবে জানোই তো।
দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়ে ফিরে তাকাল জোসি।
কিশোরদের বলল, তোমরাও এসো। আমাকে সাহায্য করবে।
পায়ে চলা পথ ধরে বনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল কিশোর, কোথায় যাচ্ছ?
বনে, জোসি বলল।
তা তো বুঝলাম, মুসা বলল। কী আছে ওখানে?
ভেষজ ওষুধ। চাচীর মা আর নানী খুব ভাল কবিরাজ ছিলেন। চাচী তাঁদের কাছ থেকেই কবিরাজি শিখেছে।
আর তুমি?
চাচীর কাছে।
ইণ্ডিয়ানদের অসাধারণ কবিরাজি জ্ঞানের কথা শুনেছে কিশোর। শত শত বছর নানারকম গাছ, পাতা আর শিকড়-বাকড় দিয়ে কঠিন কঠিন রোগের সফল চিকিৎসা করে আসছে তারা। ইদানীং বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোও ইণ্ডিয়ানদের এ সব ওষুধের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এ সব ভেষজ সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে গবেষক দল পাঠাচ্ছে ইণ্ডিয়ান অঞ্চলে।
বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মিনিট বিশেক পরেই কিশোর লক্ষ করল, গাছপালার চেহারা বদলে যাচ্ছে। পিছনে ফেলে এসেছে প্রুস গাছের ঘন জঙ্গল। সামনের জায়গাটা মোটামুটি পাতলা। বার্চ আর অ্যাসপেন গাছ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। স্নান সূর্যালোক চিকচিক করছে পাতাঝরা গাছগুলোর ডালে জমে থাকা বরফে।
বড় একটা ওক গাছ দেখাল জোসি। ওটার গোড়ার তুষার চেঁছে ফেলে দিলে এক ধরনের শ্যাওলা পাবে। তুলে নিয়ে এসো।
দৌড়ে গিয়ে কাজ শুরু করে দিল কিশোর ও মুসা। তুষার ফেলে দিতেই বেরিয়ে পড়ল বিচিত্র চেহারার শ্যাওলা। ভিজা মাটির গন্ধে ভরা। জোসি তখন অন্য জিনিস জোগাড়ে ব্যস্ত। বরফ খুঁড়ে এক জাতের চিরসবুজ উদ্ভিদ খুঁজে বের করল। উপড়ে নিল কয়েকটা গাছ। কালো রঙের চেরি-বার্ডের এক টুকরো বাকল কেটে নিল। এলডার ঝোপের শিকড় নিল। আর নিল দুই ধরনের গাছের দুটো নরম ডাল। এ গাছগুলো কিশোরের অচেনা।
কাজ শেষ করতে দশ মিনিট। দৌড়ে গ্লিটারে ফিরে চলল তিনজনে। ফেরার পথে গতি বেশি, কারণ ঢাল বেয়ে নামছে। কেবিনে ঢুকতে বিচিত্র সুবাস নাকে ঢুকল ওদের। স্টোভের ওপর কালো রঙের একটা কেটলিতে পানি ফুটছে, তাতে কিছু মিশিয়েছেন এরিনা, সেটার গন্ধই বেরোচ্ছে। জোসির হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে ডাল-পাতা, শিকড়, বাকল, শ্যাওলাগুলো বের করে কেটলির পানিতে মিশানো শুরু করলেন।
কিশোর জিজ্ঞেস করল, জেফরি আঙ্কেল কীজন্য অসুস্থ হয়েছেন, আপনি বুঝতে পেরেছেন?
মাথা ঝাঁকালেন এরিনা। মনে হয়। আপেলটাতে বোধহয় খারাপ কিছু ছিল। ওটা খাওয়ার পর থেকেই পেটব্যথা শুরু।
আপনারা খাননি? আপনি আর মুন?
না। ও একাই খেয়েছে।
জোসি বলল, ঘরে আপেল আছে তাই তো জানতাম না।
ছিলও না, মুন জানাল। ইলকিস বিগ এক ঝুড়ি তাজা ফল উপহার দিয়ে গেছে।
মুসার দিকে তাকাল কিশোর। চোখে চোখে কথা হয়ে গেল। দুজনের মনে একই ভাবনা। জেফরিকে উপহার পাঠাল কেন বিগস? সে জানে বিরোধী দলের নেতা জেফরি। ফল পাঠানোটা ঘুষ না তো? ঘুষ হোক আর যা-ই হোক, মারাত্মক বিষে ভরা এই উপহার।
আপেলের মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দেয়নি তো বিগস? বিশ্বাস হতে চাইছে না কিশোরের। তবে উদ্দেশ্যটা বোঝা যাচ্ছে। জেফরি সহ তার পরিবারের লোকেরা অসুস্থ হয়ে পড়লে থিম পার্কের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলায় মনোযোগ দিতে পারবেন না তিনি। তাঁর কেবিন পোড়ানো, জো সারটনের নৌকা নষ্ট করা, সব এই পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। ধরে নেয়া যায়, পার্কের সপক্ষের কেউ এই অকাজগুলো করেছে।
বছরের এ সময়ে তাজা ফল পেল কোথায় বিগস্? জোসির প্রশ্ন।
কেটলিতে চাপানো ওষুধ নাড়তে নাড়তে ফিরে তাকালেন এরিনা। নিশ্চয় প্লেনে করে এনেছে। আমরা মনে করেছিলাম আমাদের কেবিনের শোক ভোলাতে, আমাদের খুশি করতে ফলগুলো উপহার দিয়েছে বিগস্।
দেয়ার সময় কিছু বলেছে? জানতে চাইল মুসা।
ও নিজে নিয়ে আসেনি, এরিনা জানালেন।
টেডকে দিয়ে পাঠিয়েছে, মুন বলল।
এক মিনিট এক মিনিট, ভুরু কুঁচকে গেছে কিশোরের। টেড সিউল? ও আনতে গেল কেন?
মুন বলল, লুক স্টার্লিঙের অনুরোধে।
এরিনা বললেন, লুকের কাছ থেকে অর্ডার পেলে খাবার আর অন্যান্য জিনিস ফেয়ারব্যাংকস থেকে নিয়ে আসে ডিউক আইকহ্যাম। লুক তখন সেগুলো নিজেই যার যার ঠিকানায় পৌছে দেয় কিংবা টেডের মত কাউকে দিয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
আরও প্রশ্ন করার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিল কিশোর, হাত তুলে বাধা দিলেন এরিনা। মোটা একজোড়া দস্তানা পরে নিয়ে গরম কেটলিটা ধরে উঁচু করলেন। একটা মাটির পাত্রের মুখে পরিষ্কার এক টুকরো কাপড় রাখল মুন। তাতে কেটলির তরল পদার্থ ঢালতে লাগলেন এরিনা। কাপড়টা ছাঁকনি হিসেবে কাজ করল। মাটির পাত্র থেকে সেই তরল পদার্থ আবার বড় হাতায় করে চিনামাটির মগে নিলেন তিনি। তাতে সামান্য ঝর্নার পানি ঢেলে, অল্প একটু মধু মিশিয়ে ঠাণ্ডা করে নিয়ে গেলেন জেফরির কাছে।
বাবাকে বিছানায় উঁচু করে ধরল মুন। মগটা জেফরির ঠোটের কাছে ধরলেন এরিনা। ওষুধ খেয়ে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লেন জেফরি।
এরিনাকে জিজ্ঞেস করল কিশোর, আচ্ছা, আন্টি, ফলের যে ঝুড়িটা দিয়ে গেল, তার মধ্যে কি নাম লেখা কোন কার্ড বা নোট ছিল?
ড্রেসারের ওপর থেকে একটা কার্ড নিয়ে এলেন এরিনা। কিশোরের হাতে দিলেন। দেখার জন্য কাত হয়ে এল মুসা। লেখা রয়েছে ইলকিস বিগস, ফিল্ড রেপ্রেজেনটেটিভ, থিম পার্ক। কার্ডের উল্টো দিকের সাদা অংশে হাতে লেখা কথাটার বাংলা মানে করলে দাঁড়ায়: অনেক শুভেচ্ছা। ইলকিস।
হ্যাঁ, কার্ডটা বিগসেরই, কোন সন্দেহ নেই, কিশোর বলল। কিন্তু জেফরি আঙ্কেলের নাম তো নেই কোথাও। এমনও তো হতে পারে কার্ডটা অন্য কাউকে দিয়েছিল বিগস। বিগসই উপহার পাঠিয়েছে বোঝানোর জন্য সেই লোক কার্ডটা ফলের ঝুড়িতে ভরে দিয়েছে।
টেড সিউলের মত কেউ? মুসার প্রশ্ন।
হতে পারে।
কিশোরের দিকে তাকাল জোসি। তুমি বলতে চাও ফলগুলোতেই গোলমাল?
ল্যাবরেটরি টেস্ট না করে শিওর হওয়া যাবে না। কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়েই ওই আপেলে কামড় বসাতে রাজি নই আমি।
রাগে লাল হয়ে গেল জোসির মুখ। টেড যদি ভেবে থাকে আমার পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে, তাদের ক্ষতি করে ইডিরাটোড রেসে আমার অংশ নেয়া বন্ধ করাবে, মস্ত ভুল করছে ও। ওকে আমি ছাড়ব না।
ওর বাহুতে হাত রাখল মুন। জোসি, না জেনে কাউকে দোষারোপ করা ঠিক না। অন্য কেউও তো এ সব শয়তানি করে থাকতে পারে? টেড সিউলকে দোষী বানানোর জন্য।
ওর কথায় যুক্তি আছে, মনে মনে স্বীকার করল কিশোর।
পারলে কিছু একটা করো, এরিনা বললেন। আরও খারাপ কিছু ঘটে যাবার আগেই।
টেবিল থেকে ওষুধের মগটা তুলে নিয়ে আবার জেফরির কাছে গেলেন এরিনা। কেমন লাগছে এখন?
কোলাব্যাঙের স্বর বেরোল জেফরির গলা দিয়ে, ভাল।
আরেকটু দেব?
চোখ-মুখ কুঁচকে জেফরি বললেন, তোমার ওই ভয়াবহ জিনিস!
হাসলেন এরিনা। স্বাদটা খারাপ, তবে ওষুধ হিসেবে খুবই ভাল, অস্বীকার করতে পারবে না।
উঠে বসার চেষ্টা করলেন জেফরি। কাঁধ চেপে ধরে শুইয়ে দিলেন এরিনা। রেস্ট নাও। তোমার এখন বিশ্রাম দরকার।
সন্ধ্যার পর এরিনা বললেন, মুজের মাংসের কাবাব বানাব। আনতে পারবে?
উঠে দাঁড়াল মুসা। পারব।
কোথায় রেখেছেন? জানতে চাইল কিশোর।
আমাদের কেবিনের পিছনের ছাউনিতে, এরিনা বললেন। হুকে ঝোলানো আছে, আস্ত একটা রান। ছুরি, করাত সবই পাবে ওখানে।
লণ্ঠন জ্বেলে দিল জোসি। বাতি হাতে বাইরের অন্ধকারে বেরিয়ে এল কিশোর ও মুসা। উজ্জ্বল বড় বড় তারা মেরুর আকাশে ঘন হয়ে ফুটে আছে। কাছেই একটা পেঁচা ডাকল। মানুষের সাড়া পেয়ে ঝোপের মধ্যে ছুটে পালাল ছোট কোন জানোয়ার।
এ রকম সাধারণ একটা ছাউনির মধ্যে মাংস রাখে! মুসা বলল।
হাসল কিশোর। ভয় নেই। শীতকাল। নষ্ট হবে না। ছাউনির ভিতরের তাপমাত্রা এখন ডিপ ফ্রিজের চেয়ে কম নয়।
তারমানে মাংস জমাট বেঁধে বরফের মত শক্ত হয়ে গেছে। করাত ছাড়া কাটা যাবে না।
পোড়া কেবিনটার কাছে পৌঁছল ওরা। এখনও ধােয়ার গন্ধ বেরোচ্ছে। পাশ দিয়ে ঘুরে আসতে ছাউনিটা চোখে পড়ল। দরজা খুলল মুসা। ভিতরে ঢুকল দুজনে।
লণ্ঠন উঁচু করে ঘরের মধ্যে খুঁজতে লাগল কিশোর। বাঁয়ে একটা কাঠের বাক্স। তার ওপর রাখা চামড়ার স্তুপ, ফাঁদ পেতে ধরা হয়েছিল বুনো জানোয়ারগুলোকে। জমে শক্ত হয়ে গেছে। পিছনের দেয়ালে ঝোলানো কাঠ চেরাই করার একটা অনেক বড় করাত। চালাতে দুজন লাগে। বড় একটা বেতের ঝুড়িতে রাখা প্রয়োজনীয় নানারকম যন্ত্রপাতি।
সবই তো আছে দেখছি, কিন্তু মাংস কোথায়? চারপাশে তাকিয়ে খুঁজতে লাগল মুসা।
লণ্ঠনটা আরও উঁচু করে ধরল কিশোর। বিম থেকে বড় একটা হুক ঝুলছে। নিশ্চয় ওটাতেই ঝোলানো ছিল মাংসের টুকরো।
তাহলে এখন গেল কোথায়… কিশোর, দেখো!
মুসার কণ্ঠস্বর চমকে দিল কিশোরকে। চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল। ছাউনির কাঠের দেয়ালে কালো রঙ দিয়ে আঁকা একটা হৃৎপিণ্ড। মাঝখানে একটা ছুরি গাঁথা।

0 মন্তব্যসমূহ