চতুর্থ এবং শেষ পর্ব
তিন গোয়েন্দা সমগ্র থেকে
#তিন_গোয়েন্দা- রাকিব হাসান
চাঁদ নেই। গাঢ় অন্ধকারে ডুবে আছে ব্ল্যাক ক্যানিয়ন। তারার আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে টেরর ক্যাসলের অবয়ব।
‘আরিব্বাপরে, কি অন্ধকার!’ ফিসফিসিয়ে বলল কিশোর। ‘যা থাকে কপালে, চল ঢুকে পড়ি।’
মুসার হাতে নতুন টর্চ। হাত খরচের পয়সা বাঁচিয়ে কিনেছে। আগের টর্চটা এখনও উদ্ধার করা যায়নি, নিশ্চয় পড়ে আছে মমিকেসের কাছে। টেরর ক্যাসলের লাইব্রেরিতে।
সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠতে শুরু করল দু’জনে। এক পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা, সামান্য খোঁড়াচ্ছে কিশোর। অখণ্ড নীরবতা। তাদের পায়ের চাপা শব্দই অনেক বেশি জোরাল মনে হচ্ছে। হঠাৎ কাছের একটা ছোট ঝোপের ভেতরে শব্দ হল। বেরিয়ে ছুটে পালাল কি যেন! টর্চের আলো ফেলল মুসা। একটা খরগোশ।
‘মনে জানান দিয়েছে ব্যাটার, আজ গোলমাল হবে ক্যাসলে,’ বিড়বিড় করে বলল মুসা। ‘বুদ্ধিমানের মত আগেই পালিয়ে যাচ্ছে।’
কোন জবাব দিল না কিশোর। বারান্দা পেরিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল। টান দিল হাতল ধরে। এক চুল নড়ল না পাল্লা।
‘এস, হাত লাগাও,’ বলল কিশোর। ‘আটকে গেছে দরজা।’
দু’জনে চেপে ধরল পিতলের বড় হাতল। জোরে হ্যাঁচকা টান লাগাল। খুলে চলে এল হাতল। টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পেছনে পড়ে গেল দু’জনে।
‘উফফ!’ ওপর থেকে কিশোরকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করে বলল মুসা, ‘সর সর! পেটের ওপর পড়েছ! দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমার!’
মুসার পেটের ওপর থেকে গড়িয়ে সরে এল কিশোর। উঠে দাঁড়াল।
মুসাও উঠল। টিপেটুপে দেখছে কোথাও ভেঙেছে কিনা বুকের পাঁজর। ‘নাহ্, ঠিকই আছে মনে হচ্ছে!’
মুসার কথায় কান নেই কিশোরের। টর্চের আলোয় পরীক্ষা করে দেখছে হাতলটা।
‘দেখেছ?’ বলল কিশোর। ‘হাতলের ছিদ্রে আটকে আছে স্ক্রুগুলো। মাথার খাঁজে খোঁচার দাগ।’
‘ঘষা লেগেছে হয়ত কোন কারণে। গত পনেরো দিনে অনেকবার টানা হয়েছে ওটা ধরে। পুরানো জিনিস। সইতে পারেনি। খুলে এসেছে।’
‘আমি অন্য কথা ভাবছি,’ বলল কিশোর। ‘খুলে আসতে সাহায্য করা হয়নি তো? মানে, ঢিল করে রাখা হয়নি তো?’
‘খালি সন্দেহ!’ বলল মুসা। ‘দরজা খুলতে না পারলে ভেতরে ঢুকব কি করে? ফিরেই যেতে হবে।’
‘না। ঢোকার অন্য কোন পথ বের করতে হবে। ওই যে,’ পাশে আঙুল তুলে দেখাল কিশোর। ‘জানালা। ওদিক দিয়ে চেষ্টা করে দেখি, চল।’
বারান্দার এক প্রান্তে চলে এল দু’জনে। দেয়ালে বড় বড় জানালা, ফ্রেঞ্জ উইন্ডো। আঙিনার দিকে মুখ করে আছে। মোট ছয়টা। ঠেলেঠুলে দেখল ওরা। পাঁচটাই ভেতর থেকে আটকানো। একটা পাল্লার ছিটকিনি ভাঙা। আধইঞ্চি মত ফাঁক হয়ে আছে। ধরে টান দিল কিশোর। জোর লাগল না, হাঁ হয়ে খুলে গেল পাল্লা। ভেতরে উঁকি দিল সে। গাঢ় অন্ধকার।
টর্চের আলো ফেলল কিশোর। লম্বা একটা টেবিল চোখে পড়ল। চারপাশে চেয়ার। টেবিলের শেষ মাথায় কয়েকটা বাসন পড়ে আছে।
‘ডাইনিং রুম,’ নিচু গলায় বলল কিশোর। ‘এদিক দিয়ে ঢুকতে পারব।’
জানালা টপকে ভেতরে এসে ঢুকল দু’জনে। আলো ফেলে দেখল কি কি আছে ঘরের ভেতরে। দেয়ালের একপাশে বসানো কাঠের বড় দেয়াল আলমারি। পাশে কয়েকটা তাক।
‘দরজা কয়েকটা,’ বলল কিশোর। ‘কোন্টা দিয়ে যাব?’
‘ফিরে গেলেই ভাল...ওরেব্বাপরে!’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা। কথা বেরোল না আর। গলা টিপে ধরেছে যেন কেউ।
‘কি, ক্কি হল?’ কাছে সরে এল কিশোর।
‘ও-ওই যে!’ তোতলাচ্ছে মুসা। ‘ও-ওটা!’
মুসার নির্দেশিত দিকে তাকাল কিশোর। স্থির হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। আবছা আলোয় দেখল, লম্বা একটা মেয়ে চেয়ে আছে তাদের দিকে। পরনে তিনশো বছর আগের পোশাক। গলায় দড়ির ফাঁস। দড়ির অন্য মাথা বুকের ওপর দিয়ে ঝুলছে, নেমে এসেছে মাটিতে।
অপলকে চেয়ে আছে মুসা আর কিশোর। মেয়েটাও চেয়ে আছে ওদের দিকে।
মুসা ধরেই নিয়েছে, ওটা প্রেতাত্মা। বাড়ি ছিল ইংল্যান্ডে। ফাঁসি দিয়ে মরেছে, ওই যার কথা বলেছে হ্যারি প্রাইস।
দীর্ঘ কয়েকটা মুহূর্ত। তারপর কিশোর বলল, ‘আমি বললেই সরাসরি ওটার ওপর আলো ফেলবে! ...ফেল!’
নড়ে উঠল মেয়েটা। নড়ে উঠল একটা চকচকে কি যেন।
একই সঙ্গে ঘুরে গেল দুটো টর্চ।
কিন্তু কোথায় মেয়ে! একটা বড় আয়নার ওপর আলো পড়েছে। প্রতিফলিত হয়ে এসে লাগছে দু’জনের চোখে।
‘আয়না!’ অবাক গলায় বলল মুসা। ‘তারমানে আমাদের পেছনে রয়েছে মেয়েটা!’
পাঁই করে ঘুরল মুসা। আলো ফেলল পেছন দিকে। নেই। কোন মেয়ে নেই। শুধু দেয়াল।
‘চলে গেছে!’ মুসার গলায় ভয়। ‘আমিও যাচ্ছি। এই ভূতের আড্ডায় আর আমি নেই!’ পা বাড়াল সে।
‘দাঁড়াও!’ সঙ্গীর হাত চেপে ধরল কিশোর। ‘আয়নার দিকে চেয়েছিলাম আমরা। মেয়েটেয়ে নয়, চোখের ভুলও হতে পারে। বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি। আরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল আমাদের।’
‘হলে না কেন? ক্যামেরা তো তোমার কাঁধেই। ছবি তুললে না কেন?’
‘ভুলেই গিয়েছিলাম ক্যামেরার কথা।’ নিজের ওপরই বিরক্ত কিশোর।
‘মনে থাকলেও লাভ হত না। ছবি ওঠে না ভূতের। ওরা তো অশরীরী।’
‘অশরীরীর প্রতিবিম্ব হয় না,’ মনে করিয়ে দিল কিশোর। ‘মানে দাঁড়াচ্ছে, সে অশরীরী নয়। আয়নার ভেতরে ছিল, তাই বা বিশ্বাস করি কি করে! আয়না-ভূতের কথা শুনিনি কখনও! আবার যদি দেখা দিত মেয়েটা!’
‘দেখা না দিলেই ভাল,’ জোরে বলল মুসা, ভূতকে শোনাল যেন। ‘আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কি হবে? কি দেখবে? টেরর ক্যাসলে ভূত আছে, এটা প্রমাণ হয়ে গেল। চল, ফিরে গিয়ে সব জানাই মিস্টার ক্রিস্টোফারকে।’
‘এখুনি ফিরে যাব কি? মাত্র তো এলাম। আরও অনেক কিছু জানার আছে। নীল ভূতকে না দেখে যাব না। ছবি তুলব ওটার,’ স্থির শান্ত গলা কিশোরের।
কিশোর ভয় পাচ্ছে না, সে অত ঘাবড়াচ্ছে কেন?—নিজেকে ধমক লাগাল মুসা। কাঁধ ঝাঁকাল। ‘ঠিক আছে। আচ্ছা, এক কাজ করলে তো পারি? এ ঘর থেকেই চকের চিহ্ন রেখে যাই আমরা।’
‘ঠিক বলেছ! হল কি আমার! সব খালি ভুলে যাচ্ছি।’
খোলা জানালাটার কাছে এগিয়ে গেল কিশোর। এটা দিয়েই ঢুকেছে ওরা। পাল্লায় বড় করে একটা প্রশ্নবোধক আঁকল। ডাইনিং টেবিলে আঁকল একটা। তারপর গিয়ে দাঁড়াল আয়নার সামনে। প্রশ্নবোধক আঁকবে। ‘আমরা এ ঘরে ছিলাম, জানবে হ্যানসন আর রবিন।’
‘আমরা আর ফিরে না গেলে, তখন তো?’ প্রশ্ন করল মুসা।
জবাব দিল না কিশোর। আয়নায় প্রশ্নবোধক আঁকার চেষ্টা করল। প্রথমবারে চকের দাগ বসল না ঠিকমত। দ্বিতীয়বার জোরে চাপ দিয়ে আঁকতে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঘটল একটা অদ্ভুত কাণ্ড। নিঃশব্দে পেছনে সরে গেল আয়না, দরজার পাল্লার মত। ওপাশে প্যাসেজ। গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা।
অবাক হয়ে অন্ধকার প্যাসেজের দিকে চেয়ে আছে দু’জন।
‘ইয়াল্লা!’ বলে উঠল মুসা। ‘একটা গোপন পথ!’
‘আয়নার পেছনে লুকানো!’ ভুরু কুঁচকে গেছে কিশোরের। ‘ভেতরে ঢুকব, দেখব, কি আছে!’
মুসা প্রতিবাদ করার আগেই প্যাসেজে পা রাখল কিশোর। টর্চের আলোয় দেখা গেল, সরু লম্বা একটা প্যাসেজ। দু’পাশে অমসৃণ পাথরের দেয়াল। প্যাসেজের শেষ মাথায় একটা দরজা।
‘এস,’ ফিরে মুসাকে ডাকল কিশোর। ‘কোথায় আমাদেরকে নিয়ে যায় প্যাসেজটা, দেখি।’
দ্বিধায় পড়ে গেল মুসা। প্যাসেজে ঢোকাটা মোটেই পছন্দ হচ্ছে না তার। এদিকে অন্ধকার ঘরে একা থাকতেও চায় না। শেষে ঢুকেই পড়ল।
আলো ফেলে দু’পাশের দেয়াল দেখল কিশোর। আয়না বসানো দরজাটা পরীক্ষা করল। সাধারণ দরজা, কাঠের পাল্লা। এক পাশে পাল্লার সমান একটা আয়না বসানো। কোন নব নেই, ছিটকিনি নেই।
‘আশ্চর্য!’ বিড়বিড় করল কিশোর। ‘বন্ধ করে আবার খোলে কি করে! নিশ্চয় গোপন কোন ব্যবস্থা আছে!’
ঠেলে পাল্লাটা বন্ধ করে দিল কিশোর। মোলায়েম একটা ক্লিক করে আটকে গেল পাল্লা।
‘সেরেছে!’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ‘বন্দি হয়ে গেলাম!’
‘হুমম!’ আপনমনেই মাথা দোলাল কিশোর। পাল্লার ধারে আঙুল চালিয়ে দেখল, কোন খাঁজ আছে কিনা, ধরে টান দেয়া যায় কিনা। কিছু নেই। দরজার ফ্রেম, পাল্লা মসৃণ করে চাঁছা। ফ্রেমের মধ্যে নিখুঁত ভাবে বসে গেছে পাল্লাটা, ফাঁক নেই।
‘কোন না কোন উপায় আছেই খোলার,’ বিড়বিড় করল কিশোর। ‘ওপাশ থেকে তো খুব সহজেই খুলে গেল! ব্যাপারটা কি?’
‘সেটা তুমি বোঝ,’ বলল মুসা। ‘আবার সহজে খুলে গেলেই বাঁচি! বেরিয়ে যেতে আমি।’
‘তেমন জরুরি অবস্থায় পড়লে ভেঙেই বেরোতে পারব। কাঠ বেশি পুরু না। ভাঙার দরকার পড়বে মনে হয় না। প্যাসেজের আরেক দিকে তো পথ রয়েছেই।’
কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল মুসা। ঘুরে রওনা হয়ে গেছে গোয়েন্দাপ্রধান।
দু’পাশের দেয়ালে আঙুলের গাঁট দিয়ে টোকা দিচ্ছে কিশোর, এক পা দু’পা করে এগিয়ে চলেছে। ‘নিরেট,’ এক সময় বলল সে। হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। ‘শুনতে পাচ্ছ!’
দাঁড়িয়ে পড়ল মুসাও। কান পাতল।
অর্গান বাজছে। বহুদূর থেকে ভেসে আসছে যেন শব্দটা। কাঁপা কাঁপা। সেই সঙ্গে মিশেছে তীক্ষ্ণ ক্যাঁচকোঁচ আর চাপা চিৎকার। এর আগের বার যেমন শুনেছিল মুসা, ঠিক তেমনি। পরিবর্তন নেই।
‘নীল ভূত!’ চাপা গলায় বলল গোয়েন্দা সহকারী। ‘অর্গান বাজাচ্ছে!’
একদিকের দেয়ালে কান চেপে ধরল কিশোর। ধরে রইল দীর্ঘ এক সেকেণ্ড। সরে এল। ‘দেয়াল ভেদ করেই যেন আসছে আওয়াজ! মানে কি? দেয়ালের ঠিক ওপাশেই আছে অর্গানটা!’
‘বলতে চাইছ, এই দেয়ালের ওপাশেই আছে ভূতটা!’ আঁতকে উঠল মুসা।
‘আমার তাই ধারণা,’ বলল কিশোর। ‘যে করেই হোক, আজ ওর ছবি তুলবই। সম্ভব হলে কথাও বলব।’
‘কথা বলবে?’ গোঙানি বেরোল মুসার গলা থেকে। ‘ভূতের সঙ্গে কথা বলবে!’
‘যদি ধরতে পারি।’
‘আমরা ধরার আগেই যদি আমাদেরকে ধরে? ঘাড় মটকে দেয়?’
‘সে-ভয় কম,’ জোর দিয়ে বলল কিশোর। ‘এ-পর্যন্ত কারও কোন ক্ষতি করেনি ওটা। রেকর্ড নেই। এর ওপর অনেকখানি নির্ভর করছি আমি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেক ভেবেছি। একটা ধারণা জন্মেছে মনে। পরীক্ষা করে দেখব আজ। আর খানিক পরেই জানব, ধারণাটা ঠিক কিনা।’
‘যদি ভুল হয়? হঠাৎ যদি আজ ঠিক করে ভূতটা, তার দল বাড়াবে, তাহলে?’
‘তখন মেনে নেব ভুল করেছি,’ শান্ত গলায় বলল কিশোর। ‘একটা আগাম কথা বলছি। আর কয়েক মুহূর্ত পরেই তীব্র আতঙ্ক এসে চেপে ধরবে আমাদেরকে।’
‘কয়েক মুহূর্ত পরে!’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ‘তাহলে এখন কি বোধ করছি?’
‘অস্বস্তি।’
‘চল পালাই। দু’জনে ছুটে গিয়ে ধাক্কা দিলে ভেঙে যাবে পাল্লা। লাগাব ছুট?’
‘না,’ মুসার হাত চেপে ধরল কিশোর। ‘অস্বস্তি, ভয় কিংবা আতঙ্ক কারও কোন ক্ষতি করে না। ওগুলো এক ধরনের অনুভূতি। আতঙ্কিত হয়ে উল্টোপাল্টা কিছু করে না বসলে, কোন ক্ষতিই হবে না তোমার।’
জবাবে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল মুসা। অদ্ভুত এক পরিবর্তন ঘটছে প্যাসেজে। বাজনার শব্দ আর নিজেদের কথাবার্তায় মগ্ন থাকায় এতক্ষণ খেয়াল করেনি ব্যাপারটা। কুয়াশা! আজব এক ধরনের ধোঁয়াটে কুয়াশা উদয় হয়েছে হঠাৎ। মেঝেতে কুয়াশা, দেয়ালের ধার ঘেঁষে কুয়াশা, সিলিঙে কুয়াশা।
ওপরে নিচে আলো ফেলল মুসা। উজ্জ্বল আলোয় দেখা গেল, পাক খাচ্ছে কুয়াশা, কুণ্ডলী পাকিয়ে ভাসছে বাতাসে। কোথা থেকে আসছে, বোঝা যাচ্ছে না। বাড়ছে ধীরে ধীরে কুয়াশার ভেতর অদ্ভুত কিছু আকৃতি দেখতে পেল যেন সে।
‘দেখ দেখ!’ কাঁপা গলায় বলল মুসা। ‘বিচ্ছিরি সব মুখ! ওই, ওই যে একটা ড্রাগন... একটা বাঘ… ওরেব্বাপরে! ভয়ানক এক জলদস্যু...’
‘থাম!’ বাধা দিয়ে বলল কিশোর। ‘আমিও দেখছি ওসব! ছাতে বসে ভেসে যাওয়া মেঘের দিকে চাইলেও দেখতে পাবে ওই কাণ্ড। এই কুয়াশা কোন ক্ষতি করবে বলে মনে হয় না। তবে আতঙ্ক আসছে।’
সঙ্গীর হাতে হাতের চাপ বাড়াল কিশোর। কিশোরের হাত চেপে ধরল মুসা। ঠিকই বলেছে গোয়েন্দাপ্রধান। হঠাৎ তীব্র আতঙ্ক এসে ভর করল মনে, ছড়িয়ে পড়তে লাগল যেন সারা শরীরে। পায়ের তালু থেকে মাথার চাঁদি পর্যন্ত সব জায়গায়। অদ্ভুত শিরশিরে এক অনুভূতি চামড়ায়, কুঁচকে যাবে যেন। ছুটে পালাতে চাইছে সে। শক্ত করে তার হাত ধরে রেখেছে কিশোর, যেতে দিচ্ছে না। একই অনুভূতি হচ্ছে কিশোরেরও, কিন্তু পাথরের মত অটল দাঁড়িয়ে আছে সে।
আতঙ্কের একটা স্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে যেন ওরা। খেয়াল করল, কুয়াশা বাড়ছে, ঘন হচ্ছে। কুণ্ডলী পাকাচ্ছে, ঘুরছে ফিরছে, ভাসছে বাতাসে। সৃষ্টি করছে আজব আজব সব আকৃতি। ‘কুয়াশাতঙ্ক,’ অল্প অল্প কাঁপছে কিশোরের গলা। কিন্তু মুসার বাহুতে আঙুলের বাঁধন শিথিল হচ্ছে না সামান্যতম। ‘অনেক বছর আগে এখানে ঢুকে এর কবলে পড়েছিল কে একজন। রেকর্ড আছে। লোক তাড়ানোর শেষ অন্ত্র টেরর ক্যাসলের। চল, ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে পড়ি এবার। নীল ভূতকে ধরতে হবে। ও হয়ত ভেবে বসে আছে, এতক্ষণে ভয়ে অবশ হয়ে গেছি আমরা।’
‘আমি যাব না,’ কোনমতে বলল মুসা। দাঁতে দাঁত ঠোকাঠুকি করছে। ‘আমার শরীর অবশ! কিছুতেই পা নাড়াতে পারছি না!’
কি ভাবল কিশোর। তারপর বলল, ‘শোন, খামোকা ভয় পেয় না। ভাবনা-চিন্তা করে কি বুঝেছি আমি জান? বুঝেছি, টেরর ক্যাসল সত্যিই ভূতুড়ে...’
‘সেকথাই তো তোমাকে বোঝাতে চেয়েছি এত দিন!’
‘...তবে ভূতুড়ে করে তোলার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ। জীবন্ত মানুষ। জন ফিলবি নিজে। যে আত্মহত্যা করেছে বলে লোকের ধারণা।’
‘বল কি!’ এতই অবাক হয়েছে মুসা, আতঙ্ক ভুলে গেছে।
‘ঠিকই বলছি। ভূত সেজে এতগুলো বছর বাস করে আসছে টেরর ক্যাসলে। লোককে ভয় দেখিয়ে তড়িয়েছে।’
‘কিন্তু তা কি করে হয়?’ বিশ্বাস করতে পারছে না মুসা। ‘আমরাও তো কয়েকবার ঢুকলাম ক্যাসলে। কখনও তার দেখা পাইনি। তাছাড়া খাবার? লোকের চোখ এড়িয়ে কি করে জোগাড় করে?’
‘জানি না। দেখা হলে জিজ্ঞেস করব। আসলে লোককে ভয় দেখিয়ে তাড়ানো পর্যন্তই, এর বেশি কিছু করে না সে। কারও কোন ক্ষতি করে না। ক্যাসলটা তার দখলে থাকলেই খুশি। আতঙ্ক গেছে?’
‘আরে! হ্যাঁ! চলে গেছে! আর ভয় পাচ্ছি না। পা-ও উঠছে। যেদিকে নিয়ে যাব, যাবে।’
‘চল তাহলে। নীল ভূতের সঙ্গে দেখা করি।’
পা বাড়াল কিশোর। পেছনে চলল মুসা। ভয় কেটে গেছে। অবাক হয়ে ভাবছে, এতগুলো বছর একা টেরর ক্যাসলে কি করে বাস করল জন ফিলবি! আরও অনেক প্রশ্ন এসে ভিড় করছে মনে, কিন্তু জবাব খুঁজে পাচ্ছে না ওগুলোর।
প্যাসেজের শেষ মাথায় দরজার কাছে চলে এল ওরা। অবাক কাণ্ড! ধাক্কা দিতেই খুলে গেল পাল্লা। ওপাশে গাঢ় অন্ধকার। কি আছে না আছে, আলো না জ্বেলে বোঝার উপায় নেই। হঠাৎ বেড়ে গেল যেন বাজনার শব্দ। দেয়ালে প্রতিহত হচ্ছে। একটা বড় ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা।
‘প্রোজেকশনরুম,’ ফিসফিস করে মুসার কানের কাছে বলল কিশোর। ‘আলো জ্বেল না। চমকে দিতে হবে ওকে।’
দেয়ালের ধার ঘেঁষে পাশাপাশি এগিয়ে চলল দু’জনে। একটা কোণে এসে ঠেকল।
হঠাৎ গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল মুসা। নরম হালকা কিছু একটা তার মুখ-মাথা পেঁচিয়ে ধরেছে। টেনে সরাতে গিয়েই বুঝল, মখমলের ছেঁড়া পর্দার কাপড়।
কোণ ঘুরে আবার এগোল ওরা। কয়েক পা এগিয়েই থমকে দাঁড়াল কিশোর। হাত চেপে ধরল মুসা। ভাঙা অর্গানের সামনে নড়াচড়া করছে ম্লান নীল আলো। অন্ধকারেই বুঝতে পারল মুসা, ক্যামেরা রেডি করছে তার সঙ্গী।
‘পা টিপে টিপে এগোবে,’ ফিসফিস করে বলল কিশোর। ‘ওর ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াব। ছবি তুলব।’
কাঁপা কাঁপা আলোটার দিকে চেয়ে রইল মুসা। হঠাৎই দুঃখ হল জন ফিলবির জন্যে। বেচারা! এতগুলো বছর নিরাপদে কাটিয়ে বুড়ো বয়েসে একটা ধাক্কা খাবে। মুখোশ খুলে যাবে টেরর ক্যাসলের ভূতের।
‘ওকে ভয় পাইয়ে দিতে হবে,’ ফিসফিসিয়ে বলল মুসা। ‘নাম ধরে ডাকলেই তো পারি। বোঝাতে পারি, আমরা ওর শক্র নই, বন্ধু।’
‘ভাল কথা,’ সায় দিল কিশোর। ‘তবে এখন না। আরও কাছে গিয়ে ডাকব।’
নীল আলোর দিকে আবার এগিয়ে চলল ওরা।
‘মিস্টার ফিলবি!’ হঠাৎ জোরে ডাক দিল কিশোর। ‘মিস্টার ফিলবি, আমরা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। বন্ধু।’
কিছুই ঘটল না। বেজেই চলল অর্গান, কাঁপতে থাকল নীল আলো।
‘মিস্টার ফিলবি!’ আরও কয়েক পা এগিয়ে আবার ডাকল কিশোর। ‘আমি কিশোর পাশা। আমার সঙ্গে মুসা আমান। আপনার সঙ্গে শুধু কথা বলতে চাই।’
থেমে গেল বাজনা।
জোরে কেঁপে উঠল একবার আলোটা। তারপর চলতে শুরু করল। ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে। ছাতের কাছে গিয়ে ঝুলে রইল।
আলোটার দিকে চেয়ে আছে কিশোর আর মুসা। এই সময়ই টের পেল, কেউ এসে দাঁড়িয়েছে তাদের পেছনে। ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটল ঘটনা। ক্যামেরা হাতেই ধরা রইল কিশোরের। জ্বলে উঠল মুসার হাতের টর্চ। জালে আটকা পড়ে গেল দু’জনে। মাথার ওপর থেকে নেমে এসেছে জাল। এতই আচমকা, কিছু করারই সুযোগ পেল না ওরা। কাছেই দাঁড়িয়ে আছে দু’জন আরব।
ছুটতে গেল মুসা। জালের খোপে পা বেধে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল কার্পেটে ঢাকা মেঝেতে। পড়েই গড়ান খেল। পিছলে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করল জালের তলা থেকে। পারল না। আরও পেঁচিয়ে গেল। জালে আটকা পড়লে মাছের কেমন লাগে, অনুভব করতে পারল সে।
‘কি-শো-র!’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ‘আমাকে ছাড়াও!’
সাড়া এল না।
ঘাড় ফেরাল মুসা। টর্চটা হাতেই ধরা আছে। জ্বালল আবার। বুঝল, কেন সাড়া দিল না কিশোর।
আরেকটা জালে তারই মত আটকে পড়েছে কিশোর। ময়দার বস্তার মত তকে তুলে নিয়েছে দুই আরব। একজন ধরেছে পায়ের দিক, আরেক জন কাঁধ। এগিয়ে যাচ্ছে দরজার দিকে।
জালের ভেতর আটকা পড়ে ছটফট করছে মুসা। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। গড়াগড়ি করে ছাড়াতে গিয়ে আরও জড়িয়ে ফেলল নিজেকে।
চিত হয়ে পড়ে রইল মুসা। ছাতের কাছে এখনও আছে নীল আলো। কাঁপছে। গোয়েন্দা সহকারীর করুণ অবস্থা দেখে নীরব হাসিতে ফেটে পড়ছে যেন।
ম্লান হতে হতে এক সময় মিলিয়ে গেল নীল আলো। গাঢ় অন্ধকার চেপে ধরল যেন মুসাকে। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল সে আরেকবার। পারল না। আরও বেশি শক্ত হল জালের জট। টর্চটা খসে গেছে হাত থেকে। খুঁজে বের করার উপায় নেই।
কায়দামত আটকেছি—ভাবল মুসা। বুড়ো এক অভিনেতাকে ধরতে এসে নিজেরাই ধরা পড়ে গেছে। খুব সুবিধের লোক মনে হল না দুই আরবকে। ওরা তাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল অন্ধকারে।
হ্যানসন আর রবিনের কথা ভাবল মুসা। গিরিখাতে বাঁকের ওপাশে অপেক্ষা করছে ওরা। ওদের সঙ্গে কি আর কখনও দেখা হবে? আর কোন দিন কি বাড়ি ফিরে যেতে পারবে সে? মা-বাবার সঙ্গে দেখা হবে?
জীবনে এমন বিপদে আর পড়েনি মুসা। ভাবছে। এইসময় দেখা গেল আলো। এগিয়ে আসছে দুলেদুলে। কাছে এসে দাঁড়াল লম্বা এক লোক। হাতে একটা বৈদ্যুতিক লণ্ঠন। সিল্কের আলখেল্লা গায়ে।
ঝুঁকল লোকটা। হাতের লণ্ঠন তুলে ভাল করে দেখল মুসাকে। নিষ্ঠুর এক জোড়া চোখ, কেমন ঘোলাটে চাহনি।
হাসল লোকটা। ঝকঝক করে উঠল সোনার দাঁত। ‘বোকা ছেলে! আর সবার মত ভয় পেয়ে চলে গেলেই ভাল করতে। এখন মরবে।’ জবাই করার ভঙ্গিতে নিজের গলায় আঙুল চালাল লোকটা। বিচ্ছিরি ঘড়ঘড়ে একটা আওয়াজ করল।
ইঙ্গিতটা বুঝল মুসা। দুরুদুরু করে উঠল বুকের ভেতর। ‘কে আপনি?’ গলা দিয়ে কোলা ব্যাঙের আওয়াজ বেরোল তার। ‘এখানে কি করছেন?’
‘কি করছি?’ হাসল লোকটা। ‘পাতালে গেলেই বুঝতে পারবে।’
লণ্ঠন নামিয়ে রাখল লোকটা। উবু হয়ে দু’হাতে ধরে তুলে নিল মুসাকে। যেন একটা কোলবালিশ, এমনি ভাবে, কাঁধে ফেলল মুসার ভারি দেহটা। লণ্ঠনটা আবার হাতে তুলে নিয়ে এগোল যেদিক থেকে এসেছিল।
কাঁধে ঝুলে থেকে চলেছে, কোথায় চলেছে, বুঝতে পারল না মুসা। একটা দরজা পেরোল লোকটা, প্যাসেজ পেরোল। একটা সিঁড়ির মাথায় এসে পৌঁছুল। ঘুরে ঘুরে নেমে গেছে সিঁড়ি। নেমে চলল লোকটা। অনেক ধাপ পেরিয়ে একটা করিডরে এসে পৌঁছুল। বাতাস ঠাণ্ডা, কেমন ভেজা ভেজা। করিডর পেরোল, আরও কয়েকটা দরজা পেরিয়ে এসে ছোট একটা ঘরে ঢুকল। জেলখানার সেলের মত ঘর। নিশ্চয় মাটির তলায়, অনুমান করল মুসা। দেয়ালে গাঁথা মরচে পড়া কয়েকটা রিং-বোল্ট।
সাদা বস্তার মত কি একটা পড়ে আছে এক কোণে। কাছে বসে আছে একজন আরব, বেঁটেটা। বিশাল এক ছুরিতে শান দিচ্ছে।
‘আবদাল কোথায়?’ আলখেল্লাধারী লোকটা জিজ্ঞেস করল। ধপাস করে সাদা বস্তাটার পাশে নামিয়ে রাখল মুসাকে।
‘সিলভিয়াকে ডাকতে গেছে,’ ভারি গলা আরবটার। ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বেরোয় কথা বলার সময়। ‘সিলভিয়া আর জিপসি কাটি লুকিয়ে রেখেছে মুক্তাগুলো। ছেলেদুটোকে নিয়ে কি করা যায়, সবাই বসে আলোচনা করব।’
‘কিছুই করার দরকার নেই।’ বলল এশিয়ান। ‘এই ঘরে রেখে বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে চলে যাব। কেউ কখনও খুঁজে পাবে না ওদেরকে। মরে ভূত হয়ে যাবে শিগগিরই। টেরর ক্যাসল আগলে রাখবে।’
‘মন্দ হবে না,’ হাসল আরব। গলায় কফ আটকে আছে যেন। ‘তবে, ছুরিটায় কষ্ট করে শান দিয়েছি। একটু ব্যবহার না করলে কেমন দেখায়?’
দেখছে মুসা, বুড়ো আঙুলে ছুরির ধার পরীক্ষা করছে আরবটা। সামান্য নড়ে উঠল সাদা বস্তা। আড়চোখে দেখল মুসা। বুঝল, ওটা বস্তা নয়। জালে আটকানো গোয়েন্দাপ্রধান কিশোর পাশা।
‘বড় দেরি করছে,’ বলল আরবটা। ‘যাই দেখি, সিলভিয়া কোথায়,’ উঠে দাঁড়াল সে। ছুরিটা ঢুকিয়ে রাখল কোমরের খাপে। একবার চাইল মেঝেতে পড়ে থাকা ছেলে দুটোর দিকে। আলখেল্লাধারীকে বলল, ‘এস আমার সঙ্গে। গোপন পথটা পরিষ্কার করতে হবে। আমরা এসেছিলাম, তার কোন প্রমাণ থাকা চলবে না। এদেরকে নিয়ে ভাবনা নেই। বেরোতে পারবে না জাল থেকে।’
‘ঠিক। তাড়াতাড়ি করা দরকার আমাদের,’ লণ্ঠনটা দেয়ালের বোল্ট রিঙে ঝোলাল আলখেল্লা। আলো পড়ছে এখন ছেলেদুটোর ওপর।
বেরিয়ে গেছে লোকদুটো। মিলিয়ে গেল ওদের পায়ের আওয়াজ। ভারি পাথর ঘষা লাগার আওয়াজ হল। তারপর সব চুপচাপ।
‘মুসা,’ ডাকল কিশোর, ‘ঠিকঠাক আছ?’
‘ঠিকঠাক বলতে কি বোঝাতে চাইছ?’ নিরস গলায় বলল মুসা। ‘হাড়টাড় ভাঙেনি, এটুকু ঠিক আছি।’
‘ভাল,’ কিশোরের গলায় ক্ষোভ, নিজের প্রতি। ‘বোকার মত তোমাকে এই বিপদে এনে ফেললাম! নিজের বুদ্ধির ওপর খুব বেশি ভরসা ছিল আমার!’
‘খামোকা ভেবে মন খারাপ কোরো না,’ বলল মুসা। ‘একদল ডাকাত এসে আস্তানা গেড়েছে টেরর ক্যাসলে, কি করে জানবে? কোন প্রমাণ তো পাওয়া যায়নি আগে।’
‘হ্যাঁ। আমি শিওর ছিলাম, টেরর ক্যাসলের সব কিছুর মূলে শুধু জন ফিলবি। কল্পনাই করিনি, আর কেউ থাকতে পারে। যা হবার হয়ে গেছে, ওসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই। তা হাত-পা নাড়াতে পারছ কিছু?’
‘পারছি। শুধু বাঁ হাতের কড়ে আঙুল।’
‘আমি ডান হাত নাড়াতে পারছি,’ বলল কিশোর। ‘নিজেকে ছাড়াতে পারব মনে হয়। ঠিক জায়গায় পৌঁছাচ্ছি কিনা, দেখ।’
কাত হয়ে পড়ে আছে কিশোর। মুসা আছে চিত হয়ে। শরীরটাকে বান মাছের মত বাঁকিয়ে-চুরিয়ে অনেক কষ্টে কাত হল। কিশোরের পিঠ এখন তার দিকে। দেখল, কোমরের বেল্টে আটকানো সুইস ছুরিটা খুলে ফেলতে পেরেছে কিশোর। বিভিন্ন আকারের ছোটবড় আটটা ব্লেড, ছোট একটা স্ক্রু-ড্রাইভার আর একটা কাঁচিও লাগানো আছে বিশেষ কায়দায়।
কাঁচি দিয়ে জালের কয়েকটা ঘর কেটে ফেলল কিশোর। কাটা জায়গা দিয়ে বের করতে পারছে ডান হাত।
‘বাঁ পাশে কাটতে পার কিনা দেখ,’ ফিসফিস করে বলল মুসা। ‘ওই হাতটা বের করতে পারলেই কেল্লা ফতে।’
ছোট্ট কাঁচি। নাইলনের শক্ত সুতায় তৈরি জাল। এগোতে চাইছে না কাজ। থামল না কিশোর। চেষ্টা চালিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত মুক্ত করে ফেলল দুই হাত। কোমরের কাছে কাটা শুরু করল। নিচের দিকে ফুট খানেক কেটে ফেলেছে, এই সময় শোনা গেল পায়ের আওয়াজ। তাড়াতাড়ি কাটা জায়গাটা টেনে পিঠের দিকে নিয়ে গিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল সে। দু’হাত ঢুকিয়ে নিল জালের ভেতর।
কয়েক মুহূর্ত পরেই ঘরে এসে ঢুকল এক বুড়ি। হাতে বৈদ্যুতিক লণ্ঠন। পরনে জিপসি-আলখেল্লা। কানে সোনার বড় বড় রিঙ।
‘বেশ বেশ,’ হাঁসের মত প্যাঁকপ্যাঁক করে উঠল যেন বুড়িটা। ‘খুব আরামেই আছ দেখছি, বাছারা। জিপসি কাটির হুঁশিয়ারি তো মানলে না, বিপদে পড়বেই। আমার কথা শুনলে আর এ-অবস্থা হত না।’
লণ্ঠন তুলে দেখছে বুড়ি। হঠাৎই মনে হল তার, বড় বেশি স্থির হয়ে আছে ছেলেদুটো। কোন কথা বলছে না, নড়ছে না চড়ছে না। সন্দেহ হল। মুসার কাছে এসে দাঁড়াল। সন্দেহজনক কিছু দেখল না। ঘুরে কিশোরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ‘তুমি একটু কাত হও তো, বাছা,’ প্যাঁকপ্যাঁক করে উঠল হাসের গলা। ‘পারছ না? বেশ, এই যে, আমি সাহায্য করছি।’ লণ্ঠনটা নামিয়ে রাখল সে।
জালের কাটা দেখে ফেলল বুড়ি। কিশোরের ডান হাতের কব্জি চেপে ধরল। মোচড় দিয়ে মুঠো থেকে নিয়ে নিল ছুরিটা। ‘বাহ্, চমৎকার! পালানোর চেষ্টা করছিলে, ছানারা!’ হঠাৎ গলা চড়িয়ে ডাকল সে, ‘সিলভি! দড়ি, দড়ি নিয়ে এস! শক্ত করে বাঁধতে হবে ছানাদুটোকে, নইলে উড়ে যাবে!’
‘আসছি,’ সাড়া এল মহিলাকণ্ঠে। কথায় ব্রিটিশ টান।
খানিক পরেই লম্বা একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল দরজায়। হাতে দড়ির বাণ্ডিল।
‘চালাক, ভীষণ চালাক ছানাদুটো,’ বলল বুড়ি। ‘শক্ত করে বাঁধতে হবে। এস, সাহায্য কর আমাকে।’
অসহায় ভাবে চেয়ে চেয়ে সব দেখল মুসা। কোন সাহায্যই করতে পারল না বন্ধুকে। কিশোরের মাথা, গলা আর পিঠের জাল কাটল ওরা প্রথমে। দু’হাত পিঠের কাছে নিয়ে শক্ত করে বাঁধল দড়ি দিয়ে। টেনে হিঁচড়ে জাল খুলে নিল। তারপর বাঁধল পা। কব্জির বাঁধনের ওপর আরেক টুকরো দড়ি বাঁধল। একটা রিং বোল্টের সঙ্গে বেঁধে দিল দড়ির আরেক মাথা।
লম্বা এক টুকরো দড়ি দিয়ে মুসাকে বাঁধা হল এরপর। ওর জাল কাটা নেই কোন জায়গায়। কাজেই জাল ছাড়িয়ে নেবার দরকার মনে করল না বুড়ি। ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে আনল কয়েক প্যাঁচ। বেঁধে দিল দড়ির দুই প্রান্ত।
‘আর পালাতে পারবে না ছানারা,’ বলল হাঁস-গলা। ‘কোন দিনই আর বেরোতে পারবে না এখান থেকে। ওরা জবাই করে ফেলতে চাইছে, কিন্তু তার দরকার হবে বলে মনে হয় না। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে গেলে, এই পাতাল থেকে কখনই আর বেরোতে পারবে না এরা।’
‘আমার দুঃখ হচ্ছে ওদের জন্যে,’ বলল ইংরেজ মেয়েটা। ‘চেহারা দেখে ভাল ছেলে বলেই মনে হচ্ছে।’
‘খামোকা দরদ দেখিও না,’ তীক্ষ্ণ হল হাঁসের গলা। ‘সবাই একমত হয়েছে, ওদেরকে ছেড়ে দেয়া চলবে না। দলের সবার বিরুদ্ধে যেতে পার না তুমি। চল, কেটে পড়ি। সময়ই নেই। চিহ্নটিহ্নগুলো মুছে দিয়ে যেতে হবে আবার।’
দেয়ালে ঝোলানো লণ্ঠনটা নামিয়ে নিল বুড়ি। বেরিয়ে গেল।
মেঝেতে রাখা লণ্ঠনটা তুলে ছেলে দুটোর দিকে আবার তাকাল মেয়েটা। ‘কেন এলে, ছেলেরা? কেন আর সবার মত দূরে থাকলে না? অর্গানের বাজনা একবার শুনেই পালায় লোকে, আর ফেরে না। কিন্তু তোমরা ঠিক ফিরে এলে আবার।’
‘তিন গোয়েন্দা কখনও হাল ছাড়ে না,’ গম্ভীর গলা কিশোরের।
‘অনেক সময় হাল ছেড়ে দেয়াই ভাল,’ বলল মেয়েটা। ‘তো থাক, আমরা যাই। আশা করি, অন্ধকারে ভয় পাবে না। গুডবাই।’
‘যাবার আগে,’ বলল কিশোর। আশ্চর্য শান্ত গলা। অবাক হল মুসা। ‘একটা প্রশ্নের জবাব দেবে?’
‘কি?’ জানতে চাইল মেয়েটা।
‘এখানে কি কুকাজ করছ তোমরা? কিসের দল?’
‘বাহ্, সাহস আছে তোমার, ছেলে!’ হাসল মেয়েটা। ‘কুকাজ, না? হ্যাঁ, কুকাজই। আমরা স্মাগলার। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে দামি জিনিসপত্র স্মাগল করে আনি, বিশেষ করে মুক্তো। টেরর ক্যাসল আমাদের হেডকোয়ার্টার। লোকে জানে ভূতুড়ে বাড়ি। ধারেকাছে ঘেঁষে না। লুকানোর দারুণ জায়গা। বহু বছর ধরে আছি আমরা এখানে।’
‘কিন্তু ওই বিচিত্র পোশাক পরে আছ কেন? যেন সার্কাসের সং। লোকের নজরে পড়ে যাবে সহজেই।’
‘আমাকে দেখলে তো নজরে পড়ব,’ বলল মেয়েটা। ‘হয়েছে, আর না। একটার জায়গায় তিনটা প্রশ্নের জবাব দিয়ে ফেলেছি। এবার যেতে হচ্ছে। গুডবাই।’
লণ্ঠন হাতে বেরিয়ে গেল মেয়েটা। শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে গেল সেলের দরজা। ঘুটঘুটে অন্ধকার চেপে ধরল দুই গোয়েন্দাকে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে মুসার। শুকনো ঠোঁটের ওপর একবার বুলিয়ে আনল জিভ।
‘কিশোর!’ খসখসে গলা মুসার। ‘চুপ করে আছ কেন? কিছু বল। নইলে পাগল হয়ে যাব! যা নীরব!’
‘উ!’ আনমনা শোনাল কিশোরের গলা। ‘ভাবছিলাম। খাপেখাপে মেলাতে চাইছি কিছু ব্যাপার।’
‘ভাবছিলে! এই সময়ে!’
‘হ্যাঁ। খেয়াল করেছ, এখান থেকে বেরিয়ে ডানে ঘুরেছে জিপসি কাটি? ওদিকে করিডর ধরে এগিয়েছে?’
‘তাতে কি?’
‘আমরা যেদিক থেকে এসেছি তার উল্টো দিকে গেল। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেনি সে। আরও পাতালে নেমেছে। এর মানে কি? মাটির তলা দিয়ে বেরোনোর কোন গোপন পথ আছে। কোন গোপন সুড়ঙ্গ। ওই পথে বেরোলে লোকের চোখে পড়বে না।’
কিশোরের মাথা ঠাণ্ডা রাখার ক্ষমতা দেখে অবাক না হয়ে পারল না মুসা। পাতালের এই সেলে, এই বিপদে থেকেও ঠিক খাটিয়ে নিচ্ছে মগজের ধূসর কোষগুলোকে!
‘অনেক কিছুই তো ভাবছ,’ বলল মুসা। ‘এখান থেকে কি করে বেরোনো যায়, ভেবেছ কিছু?’
‘না,’ সোজাসাপ্টা জবাব দিল কিশোর। ‘ভেবে লাভ নেই। পরিষ্কার বুঝতে পারছি, বাইরের সাহায্য ছাড়া এখান থেকে বেরোনোর কোন উপায় নেই আমাদের। বাস্তবকে স্বীকার করে নেয়াই ভাল। আমাকে ক্ষমা কর, মুসা। আমার ভুলের জন্যেই ঘটল এটা।’
চুপ করে রইল মুসা। বলার নেই কিছুই। কি বলবে?
ঘুটঘুটে অন্ধকার। অখণ্ড নীরবতা। কাছেই কোথাও হুটোপুটি করছে একটা ইঁদুর, শোনা যাচ্ছে। আরেকটা একঘেয়ে শব্দও কানে আসছেঃ টুপ্…টুপ্…টুপ্!
সময় নিয়ে খুব আস্তে আস্তে পড়ছে পানির ফোঁটা। তারই আওয়াজ।
উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে রবিন আর হ্যানসন। এক ঘণ্টা হল গেছে মুসা আর কিশোর, ফেরার নাম নেই। প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর রোলস রয়েস থেকে বেরিয়ে আসছে রবিন, ব্ল্যাক ক্যানিয়নের দিকে তাকাচ্ছে। বন্ধুরা আসছে কিনা দেখছে। প্রতি দশ মিনিট পর পর বেরোচ্ছে হ্যানসন।
‘মাস্টার রবিন,’ আর থাকতে না পেরে বলল হ্যানসন। ‘মনে হয় এবার যাওয়া উচিত।’
‘কিন্তু গাড়ি ফেলে যাবার হুকুম নেই আপনার,’ মনে করিয়ে দিল রবিন। ‘চোখের আড়াল করা নিষেধ।’
‘তা হোক,’ বলল হ্যানসন। ‘মানুষের জীবনের কাছে রোলস রয়েস কিচ্ছু না। আমি ওঁদের খুঁজতে যাব।’
গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল হ্যানসন। বুট খুলে বড় একটা বৈদ্যুতিক লণ্ঠন বের করল। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে রবিন। তার দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি যাচ্ছি।’
‘আমিও যাব,’ বলল রবিন।
‘ঠিক আছে, আসুন যাই।’
বুট বন্ধ করতে গিয়েও থেমে গেল হ্যানসন। বড় একটা হাতুড়ি বের করে নিল, দরকার পড়তে পারে। একটা অস্ত্র তো বটেই।
রওনা হয়ে পড়ল দু’জনে। দ্রুত হাঁটছে হ্যানসন। ভাঙা পা নিয়ে তার সঙ্গে পেরে উঠছে না রবিন। তবু কাছাকাছি থাকার যথেষ্ট চেষ্টা করছে।
টেরর ক্যাসলের বারান্দায় এসে উঠল দু’জনে। দরজা বন্ধ। হাতল ঝুলে পড়ে আছে। খোলা যাবে না পাল্লা।
‘এদিক দিয়ে ঢোকেননি,’ বলল হ্যানসন। ‘তাহলে? কোন্দিক দিয়ে গেলেন?’ এদিক ওদিক তাকাল সে। ‘ওই জানালাগুলো দেখা দরকার!’
পাল্লাখোলা জানালাটার সামনে এসে দাঁড়াল দু’জনে। আলো ফেলল রবিন। চোখে পড়ল সাদা চকে বড় করে আঁকা একটা ‘?’। ‘এদিক দিয়েই গেছে ওরা!’ সংক্ষেপে চিহ্নটার মানে বুঝিয়ে বলল রবিন।
জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল হ্যানসন, রবিনকে ঢুকতে সাহায্য করল। লণ্ঠনের আলোয় বুঝতে পারল ওরা, একটা ডাইনিং রুমে এসে ঢুকেছে।
‘এরপর? এরপর কোন্দিকে গেলেন!’ খুঁজছে হ্যানসন। ‘কয়েকটা দরজা। কোথাও চিহ্ন নেই।’
এই সময় রবিনের চোখ পড়ল আয়নার ওপর। বড় করে আঁকা রয়েছে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। দেখাল হ্যানসনকে।
‘অসম্ভব!’ বলল হ্যানসন। ‘আয়নার ভেতর দিয়ে কেউ যেতে পারে না! দেখতে হচ্ছে!’
আয়নাটার চারপাশে খুঁজে কোন ফোকর দেখতে পেল না ওরা। দরজার চিহ্ন নেই। কি ভেবে আয়নার ফ্রেম ধরে ঠেলা দিল হ্যানসন। ওদেরকে অবাক করে দিয়ে খুলে গেল পাল্লা। ওপাশে অন্ধকার প্যাসেজ।
‘গোপন দরজা!’ বিস্মিত হ্যানসন। ‘নিশ্চয় এদিক দিয়ে গিয়েছেন। চলুন, আমরাও যাই।’
গাঢ় অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে রবিন, আবার একাও থাকতে পারবে না ডাইনিং রুমে। শেষে যাওয়াই ঠিক করল।
ঢুকে পড়ল হ্যানসন। পেছনে ঢুকল রবিন। দেয়ালে প্রশ্নবোধক। চিহ্ন ধরে ধরে এগিয়ে চলল দু’জনে।
ও-প্রান্তের দরজায়ও আঁকা আছে প্রশ্নবোধক। ওপাশে চলে এল দু’জনে। প্রোজেকশন রুমে।
উজ্জ্বল আলোয় ঘরের অনেকখানিই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। একসারি ধার দিয়ে পাইপ অর্গানটার দিকে এগোল ওরা। একটা কোণে এসে থামল। নিচে পড়ে আছে পর্দার একটা ছেঁড়া টুকরো। কোণ ঘুরে এগিয়ে চলল আবার। কিন্তু কই? কিশোর আর মুসার আর তো কোন চিহ্ন নেই।
এই সময়ই জিনিসটা চোখে পড়ল রবিনের। একটা সিটের তলায় পড়ে আছে। এগিয়ে গিয়ে তুলে নিল সে। ‘হ্যানসন! মুসার টর্চ! নতুন কিনেছে!’
‘নিশ্চয় ইচ্ছে করে ফেলে যাননি!’ আশপাশের মেঝে পরীক্ষা করল হ্যানসন। ‘দেখুন দেখুন। ধুলোতে অনেক পায়ের ছাপ। আর এই যে এখানে, কেমন আধ খাপচা হয়ে সরে গেছে ধুলো। মনে হচ্ছে, ধস্তাধস্তি হয়েছে। আরে, একটা চকের টুকরো পড়ে আছে।’
বেশ কয়েকটা জুতোর ছাপ একদিকে এগিয়ে যেতে দেখল ওরা। পুরু হয়ে জমেছে ধুলো, তাতে ছাপগুলো স্পষ্ট। ছাপ ধরে ধরে এগোল দু’জনে।
সামনের সারির সিটগুলোর সামনে দিয়ে এগিয়ে গেছে ছাপ।
একদিকের শেষ প্রান্তে এসে মোড় নিয়েছে ডানে। পর্দার পাশের একটা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছে ওপাশে। একটা হলে এসে থামল ওরা। এক ধার থেকে নেমে গেছে সিঁড়ি। আরেক দিক থেকে উঠে গেছে। দু’দিকেই গেছে জুতোর ছাপ।
‘এবার কোনদিকে যাব!’ দ্বিধায় পড়ে গেল হ্যানসন। উঠে যাবার সিঁড়িটার দিকে চেয়ে আছে। এগিয়ে গেল। কয়েক ধাপ উঠেই থেমে গেল আবার। মাথা নাড়ল। ‘কেন যেন মনে হচ্ছে, এদিক দিয়ে যায়নি। চলুন, আগে নেমে গিয়েই দেখি।’
নেমে যাবার সিঁড়ির কাছে চলে এল ওরা। নিচের দিকে আলো ফেলেই চেঁচিয়ে উঠল রবিন, ‘ওই যে, চকভাঙা! এদিক দিয়েই গেছে!’
‘মাস্টার কিশোরের ওপর শ্রদ্ধা বেড়ে যাচ্ছে আমার,’ বলল হ্যানসন।
‘কি হয়েছে ওদের, আপনার কি মনে হয়?’ সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলল রবিন।
‘ঠিক বুঝতে পারছি না,’ বলল হ্যানসন। ‘তবে এটা ঠিক, নিজেরা হেঁটে যাননি। তাহলে দেয়ালে প্রশ্ন এঁকে যেতেন। চক ভেঙে ফেলে যেতে হত না। নিশ্চয় বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
‘কিন্তু কে বয়ে নিয়ে যাবে! ভূত? আরে, কোথায় নেমে চলেছি! পাতালেই চলে এসেছি মনে হচ্ছে!’
‘হ্যাঁ। ওই যে, দেখতে পাচ্ছেন? একটা ঘরে শেষ হয়েছে সিঁড়ি। ইংল্যান্ডে দেখেছি আমি এ-ধরনের ঘর। একটা দুর্গে। পাতাল কক্ষ। ডানজন বলে!’
সিঁড়ি শেষ। ঘরটা থেকে তিনটে পথ তিন দিকে গেছে। তিনটে সুড়ঙ্গ মুখ দেখা যাচ্ছে। গাঢ় অন্ধকার ওপাশে। চকের চিহ্নও নেই আর। কোন্দিকে যাবে?
‘এক কাজ করি, বাতি নিভিয়ে দিই,’ বলল হ্যানসন। ‘সত্যি সত্যি ভূত হলে অন্ধকারে নড়াচড়া করার কথা। দেখি, কি ঘটে!’
গাঢ় অন্ধকারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল দু’জনে। কানখাড়া। যে-কোন রকম শব্দ শোনার জন্যে তৈরি। অখণ্ড নীরবতা। বাতাস কেমন ভেজা ভেজা, ভ্যাপসা গন্ধ।
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে বলতে পারবে না। হঠাৎই কানে এল অতি মৃদু একটা শব্দ। পাথরের ওপর আলতো ঘষা লাগল যেন আরেকটা পাথরের। কয়েক মুহূর্ত পরেই দেখা গেল ম্লান আলো। মাঝখানের সুড়ঙ্গের ভেতরে। ওদিক থেকেই এসেছে শব্দ।
কেঁপে কেঁপে এগিয়ে আসছে আলো। বোকামি করে বসল হ্যানসন। চেঁচিয়ে ডাকল, ‘মাস্টার কিশোর!’
ধমকে থেমে গেল আলোর অগ্রগতি। ঘুরে যাচ্ছে। ক্ষণিকের জন্যে দু’জনের চোখে পড়ল মেয়েমানুষের পোশাকের এক অংশ। তারপরই দ্রুত মিলিয়ে গেল আলো।
‘ছুটুন।’ রবিনের উদ্দেশ্য চেঁচিয়ে উঠল হ্যানসন। ছুটতে শুরু করেছে। জ্বলে উঠেছে তার হাতের আলো। ঢুকে পড়ছে মাঝখানের সুড়ঙ্গে।
হ্যানসনের পিছু পিছু ছুটল রবিন। বেশিদূর এগোতে পারল না। শোফারের পিঠের ওপর এসে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে হ্যানসন। সামনে দু’পাশে পাথরের দেয়াল। পথ নেই। এখানে এসে শেষ হয়ে গেছে সুড়ঙ্গ।
‘ওই দেয়ালের ভেতর দিয়ে চলে গেছে!’ বিশ্বাস করতে পারছে না যেন হ্যানসন। আলো তুলে পরীক্ষা করে দেখল। না, কোন গোপন দরজা আছে বলে তো মনে হয় না! কি ভেবে কোমরে ঝোলানো হাতুড়িটা খুলে নিল। ঠোকা দিল সামনের পাথরের দেয়ালে। ‘আরে! ফাঁপা! নিশ্চয় গোপন দরজা!’
হাতুড়ি দিয়ে জোরে জোরে ঘা মারতে লাগল হ্যানসন। শিগগিরই একটা ফোকর হয়ে গেল। শক্ত তারের জালে সিমেন্টের পুরু আস্তর লাগিয়ে তৈরি হয়েছে দরজার পাল্লা। ওপাশ থেকে আটকানো। দেখে মনে হয় সাংঘাতিক ভারি, আসলে পাতলা। জোরে জোরে কয়েক ঘা মেরেই জাল থেকে সিমেন্ট খসিয়ে দিল সে। কাঁধ দিয়ে জোরে জোরে ধাক্কা মারতে লাগল তারের জালে। কয়েক ধাক্কায়ই ফ্রেম থেকে খুলে চলে এল জালের এক প্রান্ত। ওই প্রান্ত ধরে টেনে ফ্রেম সহ খুলে নিয়ে এল সে।
‘চলুন, দেখি!’ বলেই সামনে পা বাড়াল হ্যানসন। ‘বেটি এদিক দিয়েই গেছে!’
হ্যানসনের সঙ্গে পেরে উঠছে না রবিন। শেষে তার একটা হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল শোফার।
খানিকটা এগোতেই সরু হয়ে এল সুড়ঙ্গ। সোজা হতে পারছে না হ্যানসন। মাথা নুইয়ে হাঁটতে হচ্ছে। যতই সামনে বাড়ছে, আরও সরু হয়ে আসছে সুড়ঙ্গ। মাথা নিচু করে রাখতে হচ্ছে, সামনের দিকে সোজা চাইতে পারছে না। হঠাৎ তার কপালে এসে জোরে লাগল একটা কি যেন! চমকে যাওয়ায় হাত থেকে খসে পড়ে গেল লণ্ঠন। নিভে গেল।
রবিনের গালেও এসে বাড়ি মারল কি একটা। ফড়ড়ড়ড় করে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল কি যেন! ‘বাদুড়!’ চেঁচিয়ে উঠল সে। ‘হ্যানসন, বাদুড়ে আক্রমণ করেছে!’
‘চুপ করুন, শান্ত হোন!’ নিচু হয়ে বসে লণ্ঠন খুঁজছে হ্যানসন! ‘ভয় পাবেন না!’
কিন্তু ভয় না পেয়ে উপায় আছে! একের পর এক এসে গায়ে মাথায় মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ওগুলো। একটা এসে বসে পড়ল মাথায়। চেঁচিয়ে উঠল রবিন। থাবা মেরে ওটাকে ফেলে দিতে দিতে বলল, ‘হ্যানসন ভ্যাম্পায়ার! সব রক্ত খেয়ে নেবে!’
‘ওসব গপ্পো!’ অভয় দেবার চেষ্টা করল হ্যানসন। ‘ভ্যাম্পায়ার বলে কিছু নেই!’
লণ্ঠনটা খুঁজে পেয়েছে হ্যানসন। সুইচে খামোকাই টেপাটেপি করল। বার দুই ঝাঁকুনি দিল। জ্বলল না আলো। ‘বিগড়ে গেছে! বিপদেই পড়লাম দেখছি! এখন উপায়!’
হঠাৎ কোমরে হাত পড়ল রবিনের, শক্ত কিছু একটার ছোঁয়া লাগল। ‘আছে হ্যানসন, মুসার টর্চটা কোমরে ঝুলিয়ে নিয়েছিলাম।’
জ্বলে উঠল টর্চ। উড়ন্ত প্রাণীগুলোকে দেখল ওরা। একটা দুটো নয়, ডজন ডজন। বড় আকারের কাকাতুয়া। আলো দেখে তীক্ষ্ণ চিৎকার করতে করতে ছুটে এল। ঠোকর মেরে টর্চের কাচই ভেঙে দেবে হয়ত। তাড়াতাড়ি আলো নিভিয়ে ফেলল রবিন।
বাড়ছেই পাখির সংখ্যা। স্রোতের মত একটানা আসছে সরু দিয়ে। আছড়ে পড়ছে গায়ে মুখে মাথায়। ইতিমধ্যেই কপালে গোটা দুয়েক ঠোকর লেগে গেছে রবিনের। ফুলে গেছে। ব্যথা করছে। চোখে ঠোকর লাগলে সর্বনাশ!
‘এগোনো যাবে না,’ চেঁচিয়ে বলল হ্যানসন। ‘আসুন, পিছিয়ে যাই।’
অন্ধকারে রবিনের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল হ্যানসন। অনেকখানি পিছিয়ে আসার পর কমে এল পাখি। সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় হুটোপুটি করছে পাখিগুলো, তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে আসছে। আলো জ্বাললেই হয়ত উড়ে আসবে। তারের দরজাটা তুলে আগের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিল হ্যানসন। সেই ছোট ঘরটায় ফিরে এল আবার দু’জনে।
‘মনে হচ্ছে, ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে নেয়া হয়নি ওঁদেরকে,’ বলল হ্যানসন। ‘দরজা খোলার সময় নামিয়ে রাখতেই হত। সেই সুযোগে কোন চিহ্ন রেখে যেতেন মাস্টার কিশোর।’
একমত হল রবিন।
হ্যানসন বলল আবার, ‘এই ঘর পর্যন্ত এসেছেন ওঁরা, কোন সন্দেহ নেই। তারপর কোন একটা সুড়ঙ্গ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মাঝখানেরটা দেখলাম। এবার বাঁয়েরটা দেখি। তারপর ডানেরটা দেখব। ডাকতে ডাকতে এগোব। কাছে পিঠে থেকে থাকলে, সাড়া দেবেন।’
মন্দ বলেনি হ্যানসন। তার কথায় সায় জানাল রবিন।
টর্চ জ্বালল রবিন। প্রথমে এগিয়ে গেল বাঁয়ের সুড়ঙ্গের দিকে। সুড়ঙ্গ মুখে দাঁড়িয়ে জোরে চেঁচাল হ্যানসন, ‘মাস্টার কিশোর, আপনারা কোথায়!’
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জবাব এল। কার গলা, চিনতে ভুল হল না হ্যানসনের। রবিনের হাত থেকে টৰ্চটা নিয়ে এগোল।
কয়েক গজ এগোতেই দেয়ালের গায়ে দরজা দেখতে পেল। ঠেলা দিতেই খুলে গেল ভেজানো পাল্লা। আলো ফেলল ভেতরে।
***
‘উফফ! রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে!’ বাঁধনের দাগগুলো জোরে জোরে ডলছে মুসা।
কিশোরও ডলছে। সংক্ষেপে হ্যানসন আর রবিনকে জানাল, কি করে বন্দি হয়েছিল ওরা।
‘তাড়াতাড়ি যাওয়া দরকার,’ বলল হ্যানসন। ‘পুলিশ নিয়ে আসতে হবে। ভয়ানক লোক ওরা! আমরা না এলেই তো গেছিলেন!’
ছোট ঘরটায় ফিরে এল ওরা। সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল কিশোর। কান পাতল। ‘কিসের শব্দ!’
‘পাখি!’ বলল রবিন।
‘পাখি!’
কি করে মেয়েমানুষটাকে তাড়া করে গিয়েছিল, জানাল রবিন। সবশেষে জানাল, কি পাখি ওগুলো।
‘কাকাতুয়া!’ কিশোরের মুখ দেখে মনে হল বোলতা হুল ফুটিয়েছে। ‘জলদি, এস আমার সঙ্গে!’ এক থাবায় হ্যানসনের হাত থেকে টৰ্চটা ছুটল। ঢুকে পড়ল মাঝের সুড়ঙ্গে।
আগে আগে ছুটছে কিশোর, পেছনে অন্যেরা। তারের দরজাটার কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। একটানে ফেলে দিল পাল্লা। আবার ছুটল। ওর সঙ্গে তাল রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে অন্যদের জন্যে।
ক্রমে সরু হয়ে আসছে সুড়ঙ্গ। আলো দেখে উড়ে এল পাখির ঝাঁক। ঝুপ করে বসে পড়ল কিশোর। আলো নিভিয়ে দিল। সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে হবে।’
এগিয়ে চলেছে ওরা। সবার আগে কিশোর। মাঝে মাঝে টর্চ জ্বেলে দেখে নিচ্ছে পথ। মাথার উপরে উড়ছে পাখিগুলো, হুটোপুটি করছে। বসার জায়গা পাচ্ছে না। অন্ধকারে বেরোনোর পথ পাচ্ছে না। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। আলো দেখলেই ডাইভ দিয়ে নেমে আসছে। তাড়াতাড়ি আবার নিভিয়ে দিতে হচ্ছে টর্চ।
এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে সুড়ঙ্গ। একটা জায়গায় এসে আর বাঁক নেই, সোজা এগিয়েছে। সামনে অন্ধকার ফিকে হয়ে এসেছে। ওটাই সুড়ঙ্গমুখ।
কাঠের পাল্লা দিয়ে দরজা লাগানো হয়েছে সুড়ঙ্গমুখে। হাঁ করে খুলে আছে এখন পাল্লা দুটো। বেরিয়ে এল কিশোর। তারার আলোয় দেখল, বিরাট এক খাঁচায় এসে ঢুকেছে।
একে একে অন্যেরাও বেরিয়ে এল সুড়ঙ্গের বাইরে, খাঁচার ভেতরে।
‘কাকাতুয়ার খাঁচা এটা,’ বলল কিশোর। ‘হ্যারি প্রাইসের পাখি।’
টেরর ক্যাসল থেকে ওই গোপন সুড়ঙ্গ চলে এসেছে পাহাড়ের তলা দিয়ে। ব্ল্যাক ক্যানিয়ন থেকে পাহাড় ঘুরে গেলে হ্যারি প্রাইসের বাড়ি কয়েক মাইল। অথচ পাহাড়ের তলা দিয়ে মাত্র কয়েক শো ফুট।
এগিয়ে গেল কিশোর। জোরে ঠেলা দিল খাঁচার দরজায়। ঝটকা দিয়ে খুলে গেল দরজা। বেরিয়ে এল বাইরে। সামনেই হ্যারি প্রাইসের বাংলো।
ফিসফিসিয়ে সঙ্গীদেরকে বলল কিশোর, ‘চমকে দেব ওদের। চল, যাই।’
নিঃশব্দে বাংলোর দরজার কাছে এসে দাঁড়াল ওরা। বেলপুশ টিপে দিল কিশোর।
কয়েক মুহূর্ত পরেই খুলে গেল দরজা। দাঁড়িয়ে আছে হ্যারি প্রাইস। চোখে অবাক দৃষ্টি। কুৎসিত দেখাচ্ছে চকচকে টাক আর গলার কাটা দাগ। ‘কি চাই?’ ফিসফিসিয়ে বলল সে।
‘কথা বলতে চাই,’ বলল কিশোর।
‘এত রাতে! এখন সময় নেই। ঘুমোতে যাব।’
‘তাহলে হাজতে গিয়ে ঘুমোতে হবে, এখানে নয়,’ এগিয়ে এল হ্যানসন। ‘পুলিশকে ফোন করব।’
সতর্ক হয়ে উঠল হ্যারি প্রাইস। ভাবল এক মুহূর্ত। সরে জায়গা করে দিল। ‘এস,’ ফিসফিস করল সে। ‘ভেতরে এস।’
ঘরে ঢুকল ওরা। টেবিলের ওপাশে বসে আছে একজন লোক। হালকা-পাতলা, লম্বায় পাঁচ ফুটের সামান্য বেশি হবে। হাতে তাস। বোঝা গেল, খেলা ফেলে দরজা খুলতে উঠেছে প্রাইস।
‘রড মিলার, আমার বন্ধু,’ পরিচয় করিয়ে দিল মিস্টার ফিসফিস। ‘রড, এরা তিন গোয়েন্দা। টেরর ক্যাসলে ভূত আছে কিনা তদন্ত করছে। তো, ছেলেরা, ভূত-টুত দেখেছ কিছু ক্যাসলে?’
‘হ্যাঁ,’ বলল কিশোর। ‘টেরর ক্যাসল রহস্য সমাধান করে ফেলেছি।’
কিশোরের আত্মবিশ্বাস দেখে অবাক হল মুসা আর রবিন। সত্যিই কি সমাধান করে ফেলেছে?
‘তাই নাকি?’ বলল মিস্টার ফিসফিস। ‘তা রহস্যটা কি?’
‘আপনারা দু’জন,’ বলল কিশোর। ‘হ্যাঁ, আপনারা দু’জনই টেরর ক্যাসলের ভূত। ভূতুড়ে করে রেখেছেন বাড়িটাকে। কয়েক মিনিট আগে আমাকে আর মুসাকে আপনারাই ধরে বেঁধেছেন। মরার জন্যে ফেলে রেখে এসেছেন অন্ধকার সেলে।’
ভুরু কুঁচকে গেছে প্রাইসের। ভাব দেখে মনে হল ধরে মারবে কিশোরকে। হাতুড়ির হাতলে আঙুল চেপে বসল হ্যানসনের।
‘খুব সাংঘাতিক অভিযোগ, খোকা,’ বলল মিস্টার ফিসফিস। ‘কিন্তু প্রমাণ করতে পারবে না।’
মুসারও তাই ধারণা, প্রমাণ করতে পারবে না কিশোর। হ্যারি প্রাইস কিংবা মিলার নয়, তাদেরকে বেঁধেছে দুই আরব দস্যু। সঙ্গে ছিল এক বুড়ি জিপসি আর একটা ইংরেজ মেয়ে।
‘নিশ্চয় পারব,’ জোর গলা কিশোরের। ‘পায়ের জুতো দেখুন না। আমাকে বাঁধার সময়ই এঁকে দিয়েছি।’
চমকে উঠল প্রাইস আর মিলার। চোখ চলে গেল জুতোর দিকে। অন্যেরাও তাকাল।
চকচকে কালো চামড়ার জুতো। দু’জনেরই ডান পায়ের জুতোর মাথার কাছে সাদা চকে আঁকা ‘?’। তিন গোয়েন্দার ট্রেডমার্ক।
হ্যারি প্রাইস আর রড মিলার তো বটেই, মুসা, রবিন এমনকি হ্যানসনও অবাক হয়ে গেছে।
‘কিন্তু...,’ শুরু করেই থেমে গেল মুসা।
‘বুঝতে পারলে না?’ মুসার দিকে চেয়ে বলল কিশোর। ‘মেয়েমানুষের পোশাক আর উইগ পরেছিল ওরা। আমাকে বাঁধার সময় ছুঁয়ে দেখেছিলাম। তখনই বুঝেছি, পুরুষের বুট। বুঝলাম, ছদ্মবেশ ধরেছে। পাঁচজনকে একবারও একসঙ্গে দেখিনি। তারমানে, দু’জনেই পাঁচজনের অভিনয় করেছে। এক কুমিরের ছানা সাতবার দেখানোর মত, অনেকটা।’
‘তারমানে… দুই আরব, দুই মহিলা আর এক আলখেল্লাঅলা, সব ওই দু’জনেরই কাণ্ড!’ তাজ্জব হয়ে গেছে মুসা।
‘ঠিকই বলেছে ও,’ কিশোরের আগেই জবাব দিল হ্যারি প্রাইস। ‘তোমাদের ভয় দেখাতে বার বার চেহারা বদলেছি। তবে, ক্ষতি করার কোন ইচ্ছে ছিল না আমাদের। বাঁধন খুলে দেবার জন্যেই আবার ফিরে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমাদের বন্ধুরা দেখে ফেলল। তাড়া খেয়ে ফিরে এসেছি।’
‘আমরা খুনী নই,’ বলল বেঁটে লোকটা, রড মিলার। ‘স্মাগলারও না। ভূতও না। যা করেছি, সব তোমাদেরকে ভয় পাওয়ানোর জন্যে।’ মুখ টিপে হাসল সে।
‘তবে আমি খুনী,’ গম্ভীর দেখাচ্ছে প্রাইসকে। ‘জন ফিলবিকে আমিই খুন করেছি!’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক,’ এমন ভাবে বলল মিলার, যেন ভুলেই গিয়েছিল কথাটা। ‘তবে বিশেষ কিছু এসে যায় না তাতে।’
‘পুলিশের হয়ত এসে যাবে,’ বলল হ্যানসন। কিশোরের দিকে চেয়ে বলল, ‘চলুন আমরা যাই। পুলিশকে খবর দেই গিয়ে।’
‘দাঁড়ান দাঁড়ান,’ হাত তুলে বাধা দিল প্রাইস। ‘একটু সময় দিন আমাকে। জন ফিলবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি আপনাদের।’
‘জন ফিলবির ভূতের সঙ্গে তো?’ ভুরু কুঁচকে গেছে মুসার।
‘ভূতই বলতে পার। ও নিজেই বলবে, তাকে কেন খুন করেছি আমি।’
আর কিছু কেউ বলার আগেই ঘুরে হাঁটতে শুরু করল প্রাইস। পাশের ঘরে চলে গেল।
তাড়াতাড়ি পা বাড়াল সেদিকে হ্যানসন।
‘থামুন থামুন,’ বাধা দিল মিলার। ‘ভয় নেই, পালাবে না। মিনিট খানেকের ভেতরেই ফিরে আসবে। হ্যাঁ, কিশোর পাশা, এই যে নাও, তোমার ছুরি।’
‘থ্যাংক্যু,’ বলল কিশোর। আট ফলার ছুরিটা নিয়ে কোমরের বেল্টে আটকাল।
ঠিক এক মিনিট পরেই দরজায় এসে দাঁড়াল লোকটা। না, মিস্টার ফিসফিস নয়। তার চেয়ে বেঁটে, কিছু কম বয়েসী একজন লোক। পরিপাটি করে আঁচড়ানো ধূসর চুল। পরনে টুইডের জ্যাকেট। মুখে হাসি।
‘গুড ইভনিং,’ বলল লোকটা। ‘আমি জন ফিলবি। আমাকে নাকি দেখতে চাও?’
মিলার ছাড়া আর সবাই হাঁ করে চেয়ে আছে। একেবারে চুপ। এমন কি কিশোরও চুপ হয়ে গেছে।
মিটি মিটি হাসছে মিলার। বলল, ‘ও সত্যিই জন ফিলবি।’
হঠাৎই ব্যাপারটা বুঝে ফেলল কিশোর। মুখ দেখে মনে হল, পোকা গিলে ফেলেছে। ‘আপনি জন ফিলবি, আপনিই হ্যারি প্রাইস, মিস্টার ফিসফিস, তাই না?’
‘মিস্টার ফিসফিস!’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ‘তা কি করে হয়! মিস্টার প্রাইসের চেয়ে বেঁটে, চুল আছে...’
‘কিশোর ঠিকই বলেছে,’ পকেট থেকে একটা উইগ বের করে পরে ফেলল ফিলবি। আবার মাথা টাক হয়ে গেল তার। বুক চিতিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল, লম্বা দেখাল একটু। হঠাৎ ফিসফিসে গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘একটু নড়বে না! প্রাণের ভয় থাকলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক!’
চমকে উঠল তিন গোয়েন্দা, হ্যানসনসহ। পরক্ষণেই বুঝল ব্যাপারটা। নিজেকে মিস্টার ফিসফিস প্রমাণ করল ফিলবি। অবাক হল তিন গোয়েন্দা, লোকটা কত বড় অভিনেতা, বুঝল এখন।
পকেট থেকে কি যেন একটা বের করল ফিলবি। প্লাস্টিক তৈরি। গলায় লাগিয়ে দিতেই গভীর কাটা দাগ হয়ে গেল। ‘ছেলেরা, বুঝতে পেরেছ তো এবার? জন ফিলবিকে হ্যারি প্রাইস বানিয়ে ফেলা কিছুই না। গলার স্বর বদলে ফেলি। কথা বলি ভয়াবহ ফিসফিসে গলায়। কেউ ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারে না, আমিই জন ফিলবি।’
গলার নকল দাগ আর মাথার উইগটা খুলে আবার পকেটে রেখে দিল ফিলবি। ‘এস, বস সবাই। তারপর বল, কে কি জানতে চাও। তবে, আগে আমিই বলে নিচ্ছি কিছু,’ টেবিলে রাখা ছবিটা দেখিয়ে বলল, ‘দেখছ, মিস্টার ফিসফিসের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছি আমি। কি করে করলাম? খুব সহজে। ফটোগ্রাফির একটা কৌশল। অনেক বছর আগে, ছবিতে যখন অভিনয় করতাম, গলার স্বর খুব খারাপ ছিল। তোতলাতাম। লোকের সঙ্গে কথা বলতেই লজ্জা লাগত। আশ্চর্য লোকের স্বভাব! এটাকেই দুর্বলতা ধরে নিল ওরা। ঠকাত। অনেক ভেবে চিন্তে শেষে নিজেকে মিস্টার ফিসফিস বানিয়ে নিলাম। ভয় পাওয়ানোর মত চেহারা। গলায় কাটা দাগ দেখে ধরেই নিল লোকে, লোকটা ডাকাত-ফাকাত গোছের কিছু। তার ওপর ভয়ঙ্কর ফিসফিসে গলা। বুঝে গেলাম, হ্যারি প্রাইসকে ভয় পায় লোকে। ব্যস, তাকেই ম্যানেজারের পদটা দিয়ে দিলাম। এরপর থেকে টাকা পয়সা আদায় বা কোন কঠিন কাজ করার দরকার পড়লেই ফিসফিস সেজে হাজির হতাম লোকের সামনে। কেউ ধরতে পারেনি। লোকে জেনেছে জন ফিলবি আর হ্যারি প্রাইস আলাদা লোক। একমাত্র রড মিলার ছাড়া আর কেউ জানত না ব্যাপারটা। ও আমার মেকআপ ম্যান ছিল। ফিসফিস সাজার ফন্দিটা ওর মাথা থেকেই বেরিয়েছে,’ থামল জন ফিলবি। হাসল। ‘কেমন লাগছে শুনতে?’
‘ভাল, ভাল,’ বলে উঠল মুসা। ‘বলে যান!’
‘ভালই কাটছিল দিন,’ বলে চলল ফিলবি। ‘এই সময়ই এল টকিং-পিকচার। ভাবলাম, অভিনয়কেই বেশি গুরুত্ব দেবে লোকে। গলার স্বরে সামান্য খুঁত, সেটা মাপ করে দেবে। কিন্তু না, দিল না। ওটাকেই অস্ত্র বানিয়ে আমার মন গুঁড়িয়ে দিল। গরম লোহার শিক ঢুকিয়ে যেন ছ্যাঁকা দিয়ে দিল কলজেয়। ছেড়ে দিলাম অভিনয়। ঘরকুণো হয়ে গেলাম। এই সময়ই নোটিশ এল ব্যাংক থেকে, ঋণের দায়ে আমার বাড়ি দখল করে নেবে। ফিলবি ক্যাসল অন্যের হয়ে যাবে, ভাবতেই খারাপ লাগে আমার। বেপরোয়া হয়ে উঠলাম।’ থামল একটু সে। তারপর বলল, ‘ক্যাসল তৈরির সময়ই সুড়ঙ্গটা আবিষ্কার করেছি। ক্যাসল বানিয়ে শ্রমিকেরা চলে গেল। রড আর আমি ছাড়া আর কেউ জানত না এটা। সুড়ঙ্গের মাঝামাঝি একটা দরজা বানিয়ে নিলাম, তারের জাল আর সিমেন্ট দিয়ে। এখানে এই বাড়িটা বানালাম। লোকে জানল, এটা হ্যারি প্রাইসের বাড়ি। এক ঝড়ের রাতে পাহাড়ের ওপর থেকে আমার গাড়িটা ফেলে দিলাম নিচে। লোকের কাছে মরে গেল জন ফিলবি।’
‘ভূত-প্রেতগুলো বানালেন কখন?’ জানতে চাইল কিশোর।
‘শেষ ছবিটাতে অভিনয় করার সময়! ভেবেছিলাম, যেদিন ছবি মুক্তি পাবে, বন্ধুদেরকে দাওয়াত করে এনে মজা দেব। তা আর হল না। ছবি দেখে হাসাহাসি শুরু করল লোকে। মন খারাপ হয়ে গেল,’ থামল ফিলবি। তারপর বলল, ‘পরে খুব কাজে লেগেছে জিনিসগুলো। এমনিতেই পুরানো ধাঁচের ক্যাসল, ভেতরে অদ্ভুত সব জিনিসে ঠাসা। দেখেই গা ছমছম করে লোকের, ভয় পেতে শুরু করে। তারপর দুয়েকটা ভূত কিংবা প্রেতাত্মা সামনে হাজির হয়ে গেলে, ভিরমি খেতে বাকি থাকে শুধু,’ হাসল সে। ‘লোকে জানল ক্যাসলে ভূতের উপদ্রব আছে। ওরা আর ওদিকে মাড়াল না। পথটাও বন্ধ করে দিলাম পাথর ফেলে ফেলে। ক্যাসল আর বেচতে পারল না ব্যাংক। হাতে সময় পেলাম। বসে না থেকে দুষ্প্রাপ্য কাকাতুয়ার ব্যবসা শুরু করে দিলাম। কিছু টাকা জমেছে এখন আমার হাতে। আর সামান্য কিছু জমলেই ব্যাংকের টাকা পুরো শোধ করে দিতে পারতাম,’ জোরে নিঃশ্বাস ফেলল ফিলবি। ‘কিন্তু তোমরা বোধহয় তা হতে দিলে না!’
‘মিস্টার ফিলবি,’ এতক্ষণ মন দিয়ে অভিনেতার কথা শুনছিল কিশোর। ‘আপনিই আমাদেরকে ফোন করেছিলেন, না? ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন?’
মাথা ঝোঁকাল অভিনেতা। ‘ভেবেছিলাম, এরপর আর ক্যাসলের ধারে কাছে আসবে না। কিন্তু সাহস অনেক বেশি তোমাদের!’
‘কি করে জানলেন, সেরাতে আমরা যাব? আমাদের পরিচয় জানলেন কি করে?’ জিজ্ঞেস করল কিশোর।
মৃদু হাসল ফিলবি। ‘রড মিলার, স্পাইয়ের কাজটা ওই করেছে। ব্ল্যাক ক্যানিয়নের ধারে, একটা পাহাড়ের ঢালে ছোট একটা বাংলো আছে। ওটা তার বাড়ি! নিচে থেকে সহজে লোকের চোখে পড়ে না বাড়িটা। কাছাকাছি থাকে, ক্যাসলের ওপর নজর রাখতে সুবিধে তার। তোমাদেরকে দেখেছিল। সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে জানিয়েছে আমাকে,’ থামল সে।
পাহাড়ের মাথায় টেলিভিশন এরিয়্যাল কে বসিয়েছে, বুঝতে আর অসুবিধে হল না তিন গোয়েন্দার।
‘কিন্তু আমাদের নাম জানলেন কি করে?’ আবার জিজ্ঞেস করল কিশোর।
‘বলছি,’ হাত তুলল ফিলবি। ‘কাগজে পড়েছি রোলস রয়েস প্রতিযোগিতার কথা। ব্ল্যাক ক্যানিয়নে গাড়িটাকে দেখল রড। আমাকে জানাল। তাড়াতাড়ি গিয়ে ঢুকলাম ক্যাসলে। ভয় দেখিয়ে তাড়ালাম তোমাদেরকে। সত্যি, ভয় পেতে দেরি করেছ তোমরা। আরও অনেক আগেই ভয় পেয়ে পালিয়েছে অন্যেরা। যাই হোক, তারপর ফিরে এলাম এখানে। টেলিফোন গাইডে খুঁজলাম তোমার নাম নেই। ধরেই নিলাম, টেলিফোন নেই তোমার। তবু শিওর হবার জন্যে ফোন করলাম ইনফরমেশনে। ওরা জানাল, আছে। আর কি? পেয়ে গেলাম নাম্বার।’
‘অ,’ মাথা চুলকাচ্ছে কিশোর। ‘শুটকিকেও নিশ্চয় দেখেছিলেন মিস্টার মিলার?’
‘শুটকি!’ অবাক চোখে তাকাল ফিলবি।
‘আমরা ছাড়াও আরও দুটো ছেলে এসেছিল। একজন রোগা-পাতলা ঢ্যাঙা। নীল একটা স্পোর্টস কার নিয়ে এসেছিল…’
‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ। শুটকি! ভাল নাম দিয়েছ!’ হাহ্ হাহ্ করে হাসল ফিলবি।
উসখুস করছে রড মিলার। শেষে বলেই ফেলল, ‘একটা খুব খারাপ কাজ করে ফেলেছিলাম সেদিন। আরেকটু হলেই সর্বনাশ হয়ে গেছিল! ওই যে পাথরের ব্যাপারটা। ক্যাসলের ওপরে পাহাড়ের মাথায় আমিই লুকিয়ে ছিলাম। সেদিন ওখানে বসেই নজর রাখছিলাম তোমাদের ওপর। কতগুলো পাথরের আড়ালে ছিলাম। হঠাৎ পা লেগে হড়কে গেল একটা পাথর। চমকে উঠলাম। নিচে রয়েছ তোমরা। কি হল, দেখার জন্যে উঁকি দিলাম। আমাকে দেখে ফেললে তোমরা। ধরার জন্যে উপরে উঠতে লাগলে। লাফিয়ে সরে এসে ছুটলাম। কয়েকটা পাথর গড়িয়ে গিয়ে ধাক্কা লাগল আলগা পাথরের স্তূপে। ব্যস, নামল পাথর ধস। ওই জায়গাটাই এমন। তোমরা আটকে গেলে গুহায়। তাড়াতাড়ি নেমে গিয়ে গুহার বাইরে দাঁড়ালাম। কি করব না করব, দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। ধরেই নিয়েছিলাম, চ্যাপ্টা হয়ে গেছ তোমরা। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিলাম ওখানেই। পাথরের ফাঁক গলে লাঠির মাথা বেরোতে দেখে কি যে খুশি লেগেছিল, বলে বোঝাতে পারব না,’ থামল সে।
‘গুহাটা না থাকলেই তো খতম করে দিয়েছিলেন!’ গোমড়া মুখে বলল মুসা।
‘সত্যি বলছি,’ বলল মিলার। ‘ইচ্ছে করে ফেলিনি। ওটা নিতান্তই দুর্ঘটনা...’
এরপর আর কোন কথা চলে না। চুপ করে গেল মুসা।
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। হঠাৎ মুখ তুলে বলল, ‘কিন্তু কয়েকটা ব্যাপার পরিষ্কার হচ্ছে না এখনও!’
‘কি ব্যাপার?’ জানতে চাইল ফিলবি।
‘আপনার সঙ্গে যেদিন দেখা করলাম,’ বলল কিশোর। ‘মিছে কথা বলেছেন। ঝোপ পরিষ্কার করেননি, অথচ বলেছেন করছিলেন। কেন? টেবিলে লেমোনেড রেডি রেখেছিলেন। কি করে জানলেন আমরা যাব?’
হাসল অভিনেতা, ‘কি করে জানলাম? গুহ থেকে বেরোলে তোমরা। গাড়ি পর্যন্ত তোমাদেরকে অনুসরণ করে গিয়েছিল মিলার। বেশ জোরেই শোফারকে আমার এ-জায়গাটার নাম বলেছিলে। পাথরের আড়ালে লুকিয়ে শুনেছিল মিলার। খবর দিল আমাকে। লেমোনেড রেডি করলাম। জানালায় দাঁড়িয়ে দেখলাম, রোলস রয়েসটা আসছে। একটা মাচেটে নিয়ে চট করে গিয়ে ঢুকে পড়লাম একটা ঝোপে। হঠাৎ নাটকীয় ভাবে বেরিয়ে এসে, চমকে দিতে চেয়েছিলাম তোমাদেরকে। চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম স্নায়ুর ওপর। তারপর শোনালাম টেরর ক্যাসলে ভূত আমদানি করার কাহিনী,’ হাসল ফিলবি। ‘মুসা কিন্তু সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিল।’
চট করে আরেক দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল মুসা।
‘তোমাদেরকে ক্যাসল থেকে দূরে রাখার অনেক চেষ্টা করেছি,’ আবার বলল ফিলবি। ‘কিন্তু পারলাম না। বড় বেশি একরোখা ছেলে তোমরা। বেশি বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে আজ ধরাই পড়ে গেলাম। এতই তাড়াহুড়ো করেছি, সুড়ঙ্গ মুখের দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছি। পাখিগুলো গিয়ে ঢুকল সুড়ঙ্গে। আরও ফাঁস করে দিল ভূতের পরিচয়।’
আবার ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর। ‘জিপসি বুড়ি সেজে কে গিয়েছিলেন? নিশ্চয় আপনার বন্ধু, মিস্টার মিলার?’
‘হ্যাঁ। ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম তোমাদেরকে,’ বলল ফিলবি।
‘ভয় পাইনি, বরং কৌতূহল আরও বেড়ে গিয়েছিল। সন্দেহও বাড়ল। বুঝলাম, ভূত নয়, টেরর ক্যাসলে মানুষের বাস আছে। সেটা আরও স্পষ্ট করে দিল রবিনের তুলে আনা ছবি। আর্মার সুটে মরচে নেই, লাইব্রেরির বইয়ে ধুলো নেই। তার মানে, কেউ একজন নিয়মিত পরিষ্কার করে রাখে ওগুলো। কে? কার এত দরদ জিনিসগুলোর জন্যে? আন্দাজ করলাম, একজনেরই হতে পারে। সে আপনি, মিস্টার ফিলবি। …তবে, আজ রাতে কিন্তু বোকাই বানিয়ে ফেলেছিলেন। আরব দস্যু সেজে। স্মাগলাররা ক্যাসলটাকে ঘাঁটি বানিয়েছে, প্রায় বিশ্বাসই করে ফেলেছিলাম।’
‘হ্যাঁ, ঠিকই অনুমান করেছিলে। আমিই পরিষ্কার করি জিনিসপত্রগুলো। আর কিছু জানার আছে?’
‘অনেক!’ বলে উঠল মুসা। ‘জানতে চাই, জলদস্যুর ছবিটা সত্যিই কি চোখ টিপেছিল?’
‘আমি টিপেছিলাম,’ বলল ফিলবি। ‘ছবিটার পেছনের দেয়াল আসলে কাঠের তৈরি। সাদা রঙ করা কাঠের একটা বোর্ড। টেনে খুলে আনা যায়। ঠেলে দিলেই আবার বসে যায় খাপে খাপে। বোর্ডটা সরিয়ে ছবির পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। চোখের পেছনে ছোট গোল প্লাস্টিকের চাকতি সরিয়ে, ওই ছেদায় নিজের চোখ রেখেছিলাম। তুমি চাইতেই টিপলাম।’
‘কিন্তু পরে ছবিটা ভালমত পরীক্ষা করে দেখেছি। রবিনও দেখেছে। কোন ছিদ্র ছিল না চোখের জায়গায়।’
‘ওটা আরেকটা ছবি। একই রকম দেখতে। তোমরা ফিরে আসবে সন্দেহ করে সরিয়ে ফেলেছিলাম আগের ছবিটা।’
‘কিন্তু নীল ভূত? ওটা কি দিয়ে বানালেন?’ একের পর এক প্রশ্ন করে গেল মুসা। ‘অর্গানের কাঁপা ভূতুড়ে বাজনা? আয়নার ভেতরে মেয়ে ভূত? ইকো হলের ঠাণ্ডা বায়ুপ্রবাহ?’
‘বলতে খারাপই লাগছে,’ বলল অভিনেতা। ‘রহস্যগুলো আর রহস্য থাকবে না। ঠিক আছে, তবু বলছি…’
‘কয়েকটা রহস্য এমনিতেও আর রহস্য নেই,’ বাধা দিয়ে বলল কিশোর। ‘আমি জানি, কি করে কি করেছেন। বরফের ভেতর দিয়ে কোন ধরনের গ্যাস প্রবাহিত করেছেন। দেয়ালের গোপন কোন ছিদ্র দিয়ে ওই ঠাণ্ডা গ্যাস ঢুকিয়ে দিয়েছেন ইকো হলে। হয়ে গেল ঠাণ্ডা বায়ুপ্রবাহ। বিচিত্র বাজনা, সেই সঙ্গে চেঁচামেচি, গোলমাল সৃষ্টি করা খুব সহজ। রেকর্ডকে উল্টো ঘোরানোর ব্যবস্থা করেছেন। এই উল্টো বাজনা অ্যামপ্লিফাই করে ছড়িয়ে দিয়েছেন স্পীকারের সাহায্যে। নীল ভূত বানানোও সহজ। নীল লুমিনাস পেইন্ট মাখিয়ে নিয়েছেন পাতলা অয়েল পেপারে। সুতোয় কাগজের এক মাথা বেঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছেন ওপর থেকে। সুতো ধরে টেনে নাচিয়েছেন ওটাকে। তারপর, কুয়াশাতঙ্ক। কোন ধরনের কেমিক্যাল পুড়িয়ে সৃষ্টি করেছেন এমন ধোঁয়া। এমন কোন ধরনের কেমিক্যাল, যেটার ধোঁয়ায় গন্ধ নেই। দেয়ালের গোপন ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে চালান করে দিয়েছেন প্যাসেজে। কি, ঠিক বলছি তো?’
‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ,’ মাথা ঝোঁকাল ফিলবি। ‘না, মাথায় ঘিলু আছে তোমার, স্বীকার করতেই হবে!’
‘আয়নার ভূত তো আপনি নিজেই,’ আবার বলল কিশোর। ‘মেয়ে মানুষের পোশাক পরে, প্যাসেজ দিয়ে গেয়ে পাল্লা খুলে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তারপর সুযোগ বুঝে চট করে আবার ঢুকে গেছেন প্যাসেজে। বন্ধ করে দিয়েছেন পাল্লা। খুব সহজ। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারছি না। কোন কৌশলে লোকের স্নায়ুর ওপর চাপ ফেলেছেন আপনি। অস্বস্তি, ভয়, শেষে আতঙ্ক এসে চেপে ধরে। কি করে করলেন?’
‘আরও ভাব আরও ভাব, মাথা খাটিয়ে বের করার চেষ্টা কর। শেষ পর্যন্ত না পারলে, বলে দেব। এখন এস, কিছু জিনিস দেখাচ্ছি তোমাদের।’
সবাইকে পাশের ঘরে নিয়ে এল ফিলবি। বিরাট এক ড্রেসিং রুম। নানাধরনের উইগ, পোশাক আর মেকআপের সরঞ্জাম থরে থরে সাজানো রয়েছে কয়েকটা আলমারিতে। এক পাশে বিরাট এক র্যাকে অনেকগুলো গোল ক্যান।
‘ওগুলোতে ফিল্ম,’ ক্যানগুলো দেখিয়ে বলল ফিলবি। ‘আমার অভিনয় করা সমস্ত ছবির একটা করে ফিল্ম। এক সময় কোটি কোটি লোককে অনেক আনন্দ দিয়েছি। অথচ আজ আমাকে ভূত সেজে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে লোকচক্ষুর আড়ালে!’ কেমন বিষণ্ণ গলা অভিনেতার, সবারই মন ছুঁয়ে গেল। ‘তা-ও রেহাই পেলাম না। তোমরা এলে। ছদ্মবেশ খুলে ফেললে আমার। কাল সকাল থেকেই পিলপিল করে লোক আসতে থাকবে। হাসাহাসি করবে, টিটকিরি দেবে।’
কেউ কোন কথা বলল না।
‘তবে, গলার স্বর নিয়ে আর কেউ হাসতে পারবে না এখন,’ আবার বলল ফিলবি। ‘ওষুধ খেয়ে আর প্র্যাকটিস করে করে সারিয়ে ফেলেছি আমি।’
নিচের ঠোঁটে সমানে চিমটি কেটে চলেছে কিশোর।
‘কিন্তু এত কষ্ট করে কি পেলাম!’ অভিনেতার গলায় ক্ষোভ। ‘আবার আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে লোকে। ক্যাসলটা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে ব্যাংক। এবার হয়ত সত্যিই আত্মহত্যা করতে হবে আমাকে!’
‘মিস্টার ফিলবি,’ হঠাৎ বলল কিশোর, ‘ওই ক্যানগুলোতে আপনার অভিনীত সমস্ত ছবি আছে, না?’
‘হ্যাঁ। কোথাও ভূত সেজেছি আমি, কোথাও দানব, কোথাও জলদস্যু…’
‘নির্বাক ছবির যুগ তো অনেক আগেই শেষ। তারমানে অনেকদিন থেকেই পড়ে আছে। আর কোন হলে দেখানো হচ্ছে না এখন।’
‘না, হচ্ছে না। সবাক ছবি ফেলে নির্বাক ছবি কেন দেখবে লোকে? কিন্তু এসব কথা কেন?’
‘মনে হচ্ছে, আপনার ক্যাসল আপনারই থাকবে। একটা বুদ্ধি এসেছে মাথায়। আগামী কাল জানাব আপনাকে। আর হ্যাঁ, এখান থেকে কোথাও যাবেন না। ভয়ের কিচ্ছু নেই। আপনিই টেরর ক্যাসলের ভূত, কথাটা এখনই ফাঁস করছি না আমরা। অনেক রাত হল। আচ্ছা চলি। কাল দেখা হবে।’
সুড়ঙ্গ পথেই আবার ক্যাসলে ফিরে এল ওরা—তিন গোয়েন্দা আর হ্যানসন। বেরিয়ে এল ক্যাসল থেকে।
আজ আর ভূতের ভয় নেই। ধীরেসুস্থে নেমে এল পথে। রোলস রয়েসে উঠল।
পরদিন সকালে আবার হলিউডে রওনা হল দুই গোয়েন্দা, কিশোর আর মুসা। রবিন আসতে পারেনি। কাজের চাপ বেশি। লাইব্রেরিতে চলে গেছে।
প্যাসিফিক স্টুডিওর ফটকে এসে থামল রোলস রয়েস। আজ আর কোন অসুবিধে হল না। কেরি ওয়াইল্ডার জানে ওরা আসছে, জানিয়ে রেখেছে গার্ডকে। খুলে গেল দরজা। ভেতরে ঢুকে পড়ল রোলস রয়েস।
কয়েক মিনিট পরেই মিস্টার ক্রিস্টোফারের অফিসে এসে ঢুকল দুই গোয়েন্দা।
‘এসে গেছ। বস,’ ভারি গলা পরিচালকের, ‘তারপর? কি খবর?’
‘ভূতুড়ে বাড়ি খুঁজে পেয়েছি, স্যার,’ বসতে বসতে বলল কিশোর।
‘তাই নাকি?’ ভুরু কোঁচকালেন পরিচালক। ‘কি ধরনের ভূত?’
‘ধরন ঠিক করা কঠিন,’ বলল কিশোর। ‘আসলে ভূতুড়ে করে রেখেছিলেন একজন মানুষ। মরা নয়, জ্যান্ত।’
‘তাই! মজার ব্যাপার!’ চেয়ারে হেলান দিলেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। ‘খুলে বল তো, সব।’
চুপচাপ সব শুনলেন পরিচালক। তারপর বললেন, ‘জন ফিলবি বেঁচে আছে জেনে ভালই লাগছে। এককালের মস্ত অভিনেতা, কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু একটা ব্যাপার তো বললে না। নার্ভাস করত কি করে লোককে?’
‘গতরাতে মিস্টার ফিলবির ওখান থেকে ফিরে অনেক ভেবেছি, স্যার। শেষে বুঝে ফেলেছি ব্যাপারটা। পাইপ অর্গান।’
‘পাইপ অর্গান!’
‘হ্যাঁ, স্যার। চাচার বুক শেলফে অর্গানের ওপর একটা বই আছে। এক জায়গায় লেখা আছেঃ সাবসোনিক ভাইব্রেশন অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া করে মানুষের স্নায়ুর ওপর। এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। প্রথমে অস্বস্তি বোধ শুরু হয়। বাড়তে থকে অস্বস্তি, তারপর ভয়, এবং সব শেষে আতঙ্কিত করে তোলে।’
‘বুদ্ধি আছে লোকটার!’ বললেন পরিচালক, ‘কিন্তু ভূতুড়ে ক্যাসলের ভূতকে লোকের সামনে বের করে আনাটা কি উচিত হবে? একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে ফিলবি।’
‘এখন একমাত্র আপনিই বাঁচাতে পারেন ওঁকে,’ বলল কিশোর।
‘আমি?’
‘হ্যাঁ, স্যার, আপনি। ওঁর সমস্ত নির্বাক ছবিকে সবাক করে তুলতে পারেন। কণ্ঠ উনিই দিতে পারবেন এখন। গলায় আর কোন দোষ নেই। প্রচুর আয় হবে। ক্যাসলটা আবার কিনে নিতে পারবেন মিস্টার ফিলবি। এতদিন ভূত সেজে মানুষকে কি করে ভয় দেখিয়েছিলেন, প্রকাশিত হবে খবরের কাগজে। লোকে দেখতে আসবে টেরর ক্যাসল। ভেতরের অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা পয়সার বিনিময়ে দেখাতে পারবেন তিনি। বেশ ভালই আয় হবে ওখান থেকেও। মস্ত বড় একটা প্রতিভাকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল লোকে, না বুঝে। এতগুলো বছরে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে তাঁর, তবে আপনি সাহায্য করলে পুষিয়ে নিতে পারবেন কিছুটা।’
‘হুম্ম্ম্!’ হালকা পাতলা ছেলেটার দিকে চেয়ে আছেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। ‘তোমার অনুরোধ আমি রাখব, কিশোর পাশা, কথা দিলাম।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার, থ্যাঙ্ক ইউ!’ খুশি হয়ে উঠল কিশোর। ‘মিস্টার ফিলবির অভিনীত ছবিগুলো এবার দেখতে পাব।’
‘হ্যাঁ, এবার দেখতে পাব,’ বলল পাশে বসা মুসা।
‘হ্যাঁ, ভাল কথা, অনেক খোঁজ-খবর করেছি আমি,’ বললেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। ‘কিন্তু সত্যি সত্যি কোন ভূতুড়ে বাড়ি নেই কোথাও। গুজব থাকে, ভূত আছে ভূত আছে। কিন্তু ভালমত খোঁজখবর করলেই বেরিয়ে পড়ে অন্য কিছু। যাই হোক, ওই প্রোজেক্ট বাদ দিতে হচ্ছে আমার।’
‘তাহলে কি...’ সামনে ঝুঁকল কিশোর।
হাত তুললেন মিস্টার ক্রিস্টোফার। ‘আগে শোন সব কথা। কথা দিয়েছিলাম, তোমাদের নাম প্রচার করব। ব্যবস্থাটা আসলে তোমরাই করে দিলে। চমৎকার এক গল্প হবে, সত্যি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে। টেলিভিশনের জন্য যদি একটা ফিল্ম তৈরি করি? নাম দিইঃ মিস্টার ফিলবি অভ টেরর ক্যাসল, কেমন হয়?’
প্রায় লাফিয়ে উঠল কিশোর আর মুসা। হাততালি দিয়ে উঠল। চেঁচিয়ে উঠল, ‘খুব ভাল হয়, স্যার, খুব ভাল!’
‘হ্যাঁ, আরেকটা ব্যাপার। তোমাদের মাঝে সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি আমি। গোয়েন্দা হিসেবে ভালই নাম করতে পারবে। চালিয়ে যাও। দরকার হলে আমিও সাহায্য করব তোমাদের।’
খুশিতে ধেই ধেই করে লাফানো বাকি রাখল শুধু দুই গোয়েন্দা।
কিশোর বলল, ‘আমরা যাই, স্যার। রবিনকে খবরটা দিতে হবে।’
ঘর থেকে প্রায় ছুটে বেরিয়ে এল দুই কিশোর। পেছনে তাকালে, দেখতে পেত, সারাক্ষণ সদা-গম্ভীর চিত্র-পরিচালকের মাঝেও সংক্রামিত হয়েছে তাদের আনন্দ। কুৎসিত ঠোঁটে ফুটেছে নিষ্পাপ সুন্দর এক চিলতে হাসি।
সমাপ্ত
0 মন্তব্যসমূহ