দ্বিতীয় পর্ব
তিন গোয়েন্দা সমগ্র থেকে
#তিন_গোয়েন্দা- রাকিব হাসান
ছুটতে ছুটতে বাঁকের কাছে চলে এল ওরা। গতি কমাল একটু। বাঁক ঘুরল। পেছনে ফিরে চাইল একবার কিশোর। বাঁকের ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেছে টেরর ক্যাসলের গর্বিত টাওয়ার।
সামনে অনেক নিচে উপত্যকায় লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের আলো মিটমিট করছে। থামল না ওরা। ছুটতে ছুটতে পাথর-মাটির স্তূপের কাছে চলে এল। এখানেও থামল না। চলে এল ওপাশে। একশো গজ নিচে দাঁড়িয়ে আছে কালো রোলস-রয়েস।
গতি একটু কমাল দু’জনে। ঠিক এই সময়ই শোনা গেল তীক্ষ্ণ প্রলম্বিত একটা চিৎকার। অনেক পেছনে ক্যাসলের দিক থেকে আসছে। থেমে গেল হঠাৎ করেই। যেন দম আটকে গেছে গলায়। চমকে উঠে আবার ছোটার গতি বাড়িয়ে দিল দুই গোয়েন্দা। এক ছুটে এসে দাঁড়াল গাড়ির কাছে।
তারার আলোয় চিকচিক করছে বিশাল রোলস-রয়েসের সোনালি হাতল। ঝটকা দিয়ে খুলে গেল এক পাশের দরজা। হাত বাড়িয়ে মুসাকে ভেতরে টেনে নিল রবিন। মুসার পরই উঠে বসল কিশোর। ‘হ্যানসন!’ চেঁচিয়ে উঠল সে, ‘জলদি গাড়ি ছাড়ুন। বাড়ি ফিরে চলুন।’
‘যাচ্ছি, মাস্টার পাশা,’ শান্ত গলায় বলল হ্যানসন।
মৃদু গুঞ্জন তুলে স্টার্ট হয়ে গেল ইঞ্জিন। প্রায় নিঃশব্দে পাহাড়ী পথ ধরে ছুটল গাড়ি। যতই নামছে, গতি বাড়ছে ততই। আরও বেশি, আরও।
‘কি হয়েছিল?’ সিটে এলিয়ে পড়া দুই বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল রবিন। ‘ওই চিৎকারটা কিসের?’
‘জানি না,’ বলল কিশোর।
‘এবং আমি জানতে চাই না,’ কিশোরের কথার পিঠে বলল মুসা। ‘যদি কেউ জানেও, আমাকে বলতে মানা করব।’
‘কিন্তু হয়েছিল কি?’ আবার জিজ্ঞেস করল রবিন। ‘নীল ভূতের দেখা পেয়েছ?’
মাথা নাড়ল কিশোর। ‘কিছুই দেখিনি। তবে ভয় পাইয়ে ছেড়েছে আমাদের কিছু একটা।’
‘ভুল হল,’ শুধরে দিল মুসা। ‘আতঙ্কিত করে ছেড়েছে।’
‘তাহলে গালগল্পগুলো সব সত্যি?’ হতাশ হয়েছে যেন রবিন। ‘ভূতের উপদ্রব আছে দুর্গে।’
‘আছে মানে! সারা আমেরিকার যত ভূতপ্রেত, জিন, ভ্যাম্পায়ার, ওয়্যারউলফ সবকিছুর আড্ডা ওটা। হেডকোয়ার্টার!’ শ্বাসপ্রশ্বাস সহজ হয়ে আসছে মুসার। ‘ওই ভূতের খনিতে আর কখনও ঢুকছি না আমরা, কি বল?’
সমর্থনের আশায় নেতার দিকে চাইল মুসা।
কিশোর শুনল কি-না বোঝা গেল না। হেলান দিয়ে বসে আস্তে আস্তে চিমটি কাটছে নিচের ঠোঁটে। গভীর চিন্তায় মগ্ন।
‘আর ওই দুর্গে ফিরে যাচ্ছি না আমরা, তাই না?’ আবার জিজ্ঞেস করল মুসা।
কিন্তু এবারেও সাড়া নেই কিশোরের। ছুটন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে আছে। একনাগাড়ে চিমটি কেটে যাচ্ছে নিচের ঠোঁটে।
ইয়ার্ডে এসে পৌঁছুল গাড়ি।
ড্রাইভারকে ধন্যবাদ জানিয়ে নেমে পড়ল তিন গোয়েন্দা।
‘পরেরবার বেটার লাক আশা করছি, মাস্টার পাশা,’ জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে বলল হ্যানসন। ‘সত্যি খুব ভাল লাগছে আপনাদের সঙ্গ। বুড়ো ব্যাংকার আর ধনী বিধবাদের কাজ করে বিরক্ত হয়ে পড়েছিলাম। একঘেয়েমী কাটছে।’
গাড়ি নিয়ে চলে গেল ইংরেজ শোফার।
বন্ধুদের নিয়ে জাংক-ইয়ার্ডে এসে ঢুকল কিশোর।
ইয়ার্ডের ভেতরে একধারে একটা ছোট বাংলোমত বাড়ি। তারই একটা ছোট্ট ঘরে ঘুমান চাচা-চাচী। ঘরের জানালা দিয়ে আলো আসছে। টেলিভিশন দেখছেন দু’জনে।
‘রাত বেশি হয়নি,’ বলল কিশোর। ‘তাড়াতাড়িই ফিরেছি।’
‘আরও আগে ফেরা উচিত ছিল। তাড়া খাওয়ার আগেই,’ বলল মুসা। এখনও ফ্যাকাসে হয়ে আছে চেহারা।
কিশোরের চেহারাও ফ্যাকাসে। ‘আমি আশা করেছিলাম চিৎকারটা রেকর্ড করবে তুমি। তাহলে আবার এখন শোনা যেত। বোঝা যেত কিসের চিৎকার।’
‘তুমি আশা করেছিলে!’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ‘প্রাণ নিয়ে পালাতে দিশে পাচ্ছিলাম না, চিৎকার রেকর্ড করব!’
‘আমার নির্দেশ ছিল, যে-কোন রকমের শব্দ রেকর্ড করার দায়িত্ব তোমার,’ শান্ত গলায় বলল কিশোর। ‘তবে পরিস্থিতি তো নিজের চোখেই দেখেছি, তোমাকে আর কি বলব!’
সহজ তিন-এর দিকে বন্ধুদের নিয়ে গেল কিশোর। হেডকোয়ার্টারে ঢোকার এটা সবচেয়ে সহজ গোপন পথ। ফ্রেমে আটকানো বিরাট একটা ওক কাঠের দরজা। গ্র্যানাইট পাথরে তৈরি ধসে পড়া একটা বাড়ি থেকে খুলে এনেছেন রাশেদ চাচা। ওটাকেই একটা দানবীয় স্টীম ইঞ্জিনের পুরানো বয়লারে এক প্রান্তে কায়দা করে বসিয়ে নেয়া হয়েছে।
লোহালক্কড়ের মাঝে একটা খোঁড়লে হাত ঢুকিয়ে দিল কিশোর। ভেতরে বসানো আছে একটা ছোট বাক্স, তাতে চাবি রাখা। এমন জায়গায় বাক্স, আর তার ভেতর দরজার চাবি থাকতে পারে, কল্পনাই করবে না কেউ। দরজার তালা খুলল কিশোর। টান দিয়ে খুলল পাল্লা। ঢুকে গেল বিরাট বয়লারে।
পুরো সোজা হয়ে দাঁড়ানো যায় না। মাথা সামান্য নুইয়ে বয়লারের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল তিন কিশোর। শেষ মাথায় বড় গোল একটা ফুটো। ওটার ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দিল কিশোর। শরীরটা বের করে নিয়ে এল ট্রেলারের ভেতর। তার পেছনে একে একে ঢুকে পড়ল মুসা আর রবিন।
সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিল কিশোর। ডেস্কের ওপাশে সুইভেল চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল।
‘এখন,’ কথা শুরু করল কিশোর, ‘দুর্গে কি কি ঘটেছে, আলোচনা করব আমরা। মুসা, কিসে ছুট লাগাতে বাধ্য করল তোমাকে?’
‘কেউ বাধ্য করেনি,’ সাফ জবাব দিল মুসা। ‘আমার নিজেরই ছুটতে ইচ্ছে করছিল।’
‘বুঝতে পারনি আমার প্রশ্ন। ছুটতে ইচ্ছে হল কেন তোমার? কি হয়েছিল?’
‘শুরুতে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। আস্তে আস্তে বাড়ল অস্বস্তি, ভয় ভয় করতে লাগল। তারপর হঠাৎ করেই চেপে ধরল দারুণ আতঙ্ক। এরপর আর না ছুটে উপায় আছে?’
‘ঠিক,’ নিচের ঠোঁটে চিমটি কেটে বলল কিশোর, ‘ঠিক একই ব্যাপার ঘটেছে আমার বেলায়ও। শুরুতে অস্বস্তি তারপর ভয় ভয়। শেষে দারুণ আতঙ্ক। কিন্তু আসলে কি ঘটেছিল! প্রথম থেকে ভেবে দেখা উচিত। ইকো হল—প্রতিধ্বনি শুনে প্রথম ভয় পাওয়া। জলদস্যুর ছবি। কাছে পরখ করতে যাওয়া। তারপর ঠাণ্ডা বাতাসের স্রোত…’
‘হিম শীতল বাতাসের স্রোত!’ শুধরে দিল মুসা। ‘ছবিটার কথা নতুন করে ভেবেছ কিছু? ওটার চোখ এত জ্যান্ত মনে হল কেন প্রথমে?’
‘হয়ত নিছক কল্পনা,’ বলল কিশোর। ‘আসলে সত্যি সত্যি এমন কিছু দেখিনি আমরা, কিংবা শুনিনি, যাতে আতঙ্কিত হতে হয়।’
‘নাই বা দেখলাম, টের তো পেয়েছি!’ বলল মুসা। ‘এমনিতেই পুরানো আমলের বাড়িগুলোতে ঢুকতে ভয় ভয় লাগে। আর ক্যাসলটা তো ভূতের আড্ডাখানা। তা-ও যে সে ভূত না, বাঘা বাঘা সব ব্যাটাদের বাস। মানুষ তো মানুষ, ছোটখাট ভূতেরাই ঢুকতে সাহস করবে না ওখানে! জায়গাটা দেখলেই ভয় লাগে!’
‘আসল রহস্যটা হয়ত ওখানেই,’ বলল কিশোর। ‘আবার টেরর ক্যাসলে ঢুকব...’ বাধা পেয়ে থেমে গেল। বেজে উঠেছে টেলিফোন।
অবাক হয়ে সেটটার দিকে চেয়ে আছে তিন গোয়েন্দা। মাত্র হপ্তা খানেক আগে এসেছে ওটা। টেলিফোন বুকে নাম ওঠেনি এখনও কিশোরের। অফিসের দু’চারজন, আর তারা তিনজন ছাড়া আর কেউই জানে না নাম্বারটা। তাহলে! কে করল ফোন!
আবার হল রিঙ। আবার।
‘তুমিই ধর,’ ফিসফিস করে কিশোরকে বলল মুসা।
হাত বাড়াল কিশোর। আরেকবার রিঙ হতেই ধরল রিসিভার। তুলে কানে ঠেকাল। ‘হ্যালো’ বলেই নামিয়ে আনল, ধরল একটা মাইক্রোফোনের সামনে।
পুরানো মাইক্রোফোনটা জাংক-ইয়ার্ড থেকেই জোগাড় করেছে কিশোর। পুরানো একটা রেডিও থেকে খুলে নিয়েছে স্পীকার। মাইক্রোফোন আর স্পীকারের কানেকশন করে দিয়েছে। টেলিফোন এলে, তিনজনে একই সঙ্গে শোনার জন্যে এই ব্যবস্থা।
কথা নেই, শুধু অদ্ভুত একটা গুঞ্জন স্পীকারে।
আবার রিসিভার কানে ঠেকাল কিশোর। ‘হ্যালো?’ নামিয়ে এনে ধরল মাইক্রোফোনের সামনে।
এবারেও শুধু গুঞ্জন। ক্রেডলে রিসিভার রেখে দিল কিশোর। ‘রঙ নাম্বার-টাম্বার কিছু একটা হয়েছে। হ্যাঁ, যা বলেছিলাম। টেরর ক্যাসলে...’
আবার বেজে উঠল টেলিফোন।
স্থির চোখে এক মুহূর্ত সেটটার দিকে চেয়ে রইল কিশোর। ছোঁ মেরে তুলে নিল রিসিভার।
‘হা হ্যাল্লো?’ নামিয়ে আনল মাইক্রোফোনের সামনে।
আবার গুঞ্জন স্পীকারে। না, আগের মত নয়। একটু যেন পরিবর্তন হয়েছে। বহুদূর থেকে আসছে যেন শব্দটা, কাছিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। হঠাৎই গুঞ্জনের ভেতর থেকে ভেসে এল বিদঘুটে একটা ঘড়ঘড়ানি, গলার কাছে পানি নিয়ে কুলি করছে যেন কেউ। তারপর অনেক কষ্টে যেন একটা শব্দ উচ্চারিত হল, ‘দূরে…’ থেমে গেল কথা। শাঁই শাঁই ঝড় বইছে যেন স্পীকারে। আবার উচ্চারিত হল দুটো শব্দ, ‘দূরে...থাকবে…’ থেমে গেল কথা। হঠাৎ গলা টিপে ধরে থামিয়ে দেয়া হয়েছে যেন।
ধীরে ধীরে কমে এল শাঁই শাঁই, দূর থেকে দূরে মিলিয়ে গেল গুঞ্জন।
‘কি থেকে দূরে থাকব?’ রিসিভারের দিকে চেয়ে ওটাকেই যেন প্রশ্ন করল কিশোর। তারপর আস্তে করে নামিয়ে রাখল ক্রেডলে।
দীর্ঘ এক মুহূর্ত কেউ কোন কথা বলল না। তারপর হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়াল মুসা। ‘বাড়ি যেতে হচ্ছে আমাকে। এই মাত্র মনে পড়ল, জরুরি একটা কাজ ফেলে এসেছি।’
‘আমি যাব,’ রবিনও উঠল। ‘আমিও যাব তোমার সঙ্গে।’
‘আমারও যাওয়া দরকার। মেরিচাচী হয়ত ভাবছেন,’ উঠে দাঁড়াল কিশোরও।
হুড়োহুড়ি ঠেলাঠেলি করে বেরুতে গিয়ে একে অন্যের গায়ে ধাক্কা খেল ওরা। কে কার আগে বেরোবে সেই চেষ্টায় ব্যস্ত।
বাক্য পুরো করতে পারেনি অদ্ভুত গলাটা। কিন্তু বুঝতে একটুও অসুবিধে হল না ছেলেদের, আসলে কি বলতে চেয়েছে ওটা।
বলতে চেয়েছেঃ টেরর ক্যাসল থেকে দূরে থাকার!
সত্যিই, একটা সমস্যায়ই পড়া গেল!’ বলল কিশোর।
পরদিন বিকেলে হেডকোয়ার্টারে বসে আছে দুই গোয়েন্দা। কিশোর বসে আছে তার সুইভেল চেয়ারে। পোড়া ডেস্কের এপাশে বসেছে মুসা। রবিন গেছে লাইব্রেরিতে।
‘সমস্যা আসলে দুটো,’ আবার বলল গোয়েন্দাপ্রধান।
‘বলছি, কি করে সমাধান করবে সমস্যার?’ বলল মুসা। ‘খুব সহজ। রিসিভার তুলে ফোন কর মিস্টার ক্রিস্টোফারকে। বলে দাও, তাঁর জন্যে ভূতুড়ে বাড়ি খুঁজে বের করতে পারব না আমরা। জানাও, একটার কাছে গিয়েছিলাম কোনমতে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরেছি। আর একবার ওটার কাছে ঘেঁষতে চাই না।’
মুসার পরামর্শের ধার দিয়েও গেল না কিশোর। ‘আমাদের প্রথম সমস্যা,’ বলল সে। ‘জানা, কে ফোন করেছিল গতরাতে।’
‘কে নয়,’ শুধরে দিল মুসা। ‘বল কিসে। ভূত, প্রেতাত্মা, ওয়্যারউলফ, ভ্যাম্পায়ার!’
‘ওদের কেউই টেলিফোন ব্যবহার করতে জানে না,’ মনে করিয়ে দিল কিশোর।
‘সে-তো পুরানো আমলের কথা। আমরা আধুনিক হয়েছি, ভূতেদেরও আধুনিক হতে দোষ কি? গতরাতে যে-ই ফোন করে থাকুক, গলাটা মোটেই মানুষের মত মনে হয়নি আমার।’
চিন্তিত দেখাল গোয়েন্দাপ্রধানকে। ‘ঠিকই বলছ। আমরা তিনজন আর হ্যানসন ছাড়া কোন মানুষের জানার কথা না, গতরাতে টেরর ক্যাসলে গিয়েছিলাম!’
‘প্রেতাত্মাদের জানতে বাধা কোথায়?’ প্রশ্ন রাখল মুসা।
‘তা নেই,’ অনিচ্ছা সত্ত্বেও সায় দিল কিশোর। ‘তবে, দুর্গটা সত্যিই ভূতুড়ে কিনা দেখে ছাড়ব। জন ফিলবির ব্যাপারে আরও অনেক বেশি জানতে হবে আমাদের। টেরর ক্যাসলে কারও প্রেতাত্মা থেকে থাকলে, ওরই আছে।’
‘হ্যাঁ, এটা একটা কথার মত কথা বলেছ,’ খুশি হয়ে বলল মুসা। ‘এবার বল দ্বিতীয় সমস্যাটা কি?’
‘এমন কাউকে খুঁজে বের করা, যে জন ফিলবির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশেছে।’
‘কিন্তু সে-তো অনেক বছর আগের কথা! তেমন কাকে পাব আমরা?’
‘অনেক আর কত? আত্মহত্যা না করলে এখনও বেঁচে থাকতে পারত জন ফিলবি। তার সঙ্গী-সাথীদের অনেকেই নিশ্চয় বেঁচে আছে এখনও। হলিউডে খোঁজ করলে তেমন কাউকে না কাউকে পেয়ে যাবই আমরা।’
‘তা হয়ত পেয়ে যাব।’
‘আমার মনে হয়, ফিলবির ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি বলতে পারবে তার ম্যানেজার, মিস্টার ফিসফিস।’
‘মিস্টার ফিসফিস!’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ‘এটা আবার কেমন নাম?’
‘ডাক নাম। লোকে ওই নামেই ডাকত। আসল নাম হ্যারি প্রাইস। এই যে, ওর ছবি।’
একটা কাগজ সহকারীর দিকে ঠেলে দিল গোয়েন্দাপ্রধান। একটা ছবি, তার নিচে কিছু লেখা। পুরানো একটা খবরের কাগজ থেকে ফটোকপি করে এনেছে রবিন। ছবিতে দু’জন লোক। একজন লম্বা, হালকা-পাতলা, পুরো মাথায় টাক। হাত মেলাচ্ছে তার চেয়ে সামান্য বেঁটে একটা লোকের সঙ্গে। মাথায় ঘন চুল। হাসিখুশি সুন্দর চেহারা। টাকমাথা লোকটার চোখ দেখলেই ভয় লাগে, গলায় একটা গভীর কাটা দাগ।
‘ইয়াল্লা!’ বিস্মিত মুসা। ‘এই জন ফিলবির আসল চেহারা! খামোকাই ছদ্মবেশে অভিনয় করেছে। আসল চেহারা দেখালেই ভয় বেশি পেত লোকে! এই চোখ আর গলার কাটা কলজে কাঁপিয়ে দেয়।’
‘ভুল করছ। ও নয়, জন ফিলবি হল অন্য লোকটা। চেহারা সুন্দর, হাসিটাও আন্তরিক।’
‘খাইছে!’ আরও বিস্মিত হল মুসা। ‘ওই লোকটা ফিলবি। ভূত-প্রেত আর দানবের অভিনয় করত! এত সুন্দর মানুষটা!’
‘হ্যাঁ। ব্যক্তিগত জীবনে নাকি খুবই লাজুক লোক ছিল ফিলবি। তাছাড়া তোতলাতো। বন্ধু-বান্ধব ছিল না বললেই চলে। কি করে জানি ফিসফিসের সঙ্গে ভাব হয়ে গিয়েছিল, শেষে ম্যানেজার নিযুক্ত করে ফেলল। লোকে আগে ঠকাত ফিলবিকে। ফিসফিস ম্যানেজার হওয়ার পর আর পারেনি।’
‘স্বাভাবিক!’ মন্তব্য করল মুসা। ‘সামনে না করে কার বাপের সাধ্য। করলেই তো ছুরি বের করবে।’
‘ওকে খুঁজে পেলে কাজ হত। অনেক কিছু জানতে পারতাম ফিলবির ব্যাপারে।’
‘কি করে ওর খোঁজ পাওয়া যাবে, কিছু ভেবেছ?’
‘টেলিফোন গাইড।’
গাইডের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল দুই গোয়েন্দা। শেষ অবধি নামটা খুঁজে পেল মুসা।
‘এই যে!’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ‘হ্যারি প্রাইস। আটশো বারো উইন্ডিং ভ্যালি রোড। ফোন করবে ওকে?’
‘না, লোক জানাজানি হয়ে যেতে পারে। ওর সঙ্গে দেখা করব আমরা,’ টেলিফোনের দিকে হাত বাড়াল কিশোর। গাড়ি দরকার।
‘গাড়িটা পাওয়ায় খুব উপকার হয়েছে!’ কিশোরের দিকে চেয়ে বলল মুসা, ‘আচ্ছা, তিরিশ দিন শেষ হয়ে গেলে কি করব, বল তো?’
‘সে তখন দেখা যাবে। বুদ্ধি একটা ভেবে রেখেছি...হ্যালো। ...কিশোর পাশা। ...গাড়িটা চাই, এখুনি।’ রিসিভার নামিয়ে রাখল কিশোর। ‘চল, উঠি। চাচীকে বলতে হবে, রাতে দেরি করে খাব।’
বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করাতে পারল বটে কিশোর, কিন্তু সন্দেহ গেল না মেরিচাচীর। গাড়ি এসে গেছে। রাজকীয় রোলস রয়েসের দিকে চেয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে এদিক ওদিক মাথা নাড়লেন তিনি। ‘এর পর কি করবি কিশোর, তুইই জানিস! এই বয়েসেই রোলস রয়েস...! তা-ও আবার আরব শেখের ফরমাশ দেয়া! নষ্ট হয়ে যাবি তো!’
আবার যদি মত পাল্টে ফেলে মেরিচাচী, এই ভয়ে কিশোর তাড়াতাড়ি গিয়ে উঠে পড়ল গাড়িতে। মুসা উঠে বসতেই দ্রুত ইয়ার্ড থেকে বেরিয়ে যাবার নির্দেশ দিল হ্যানসনকে।
কোথায় যেতে হবে শোফারকে জানাল কিশোর।
ম্যাপ বের করে দেখে নিল হ্যানসন উইন্ডিং ভ্যালিটি কোথায়। রকি বীচ থেকে বেশ দূরে একটা পর্বতমালার ধারে উপত্যকাটা। নিঃশব্দে ছুটে চলল রোলস রয়েস।
পাহাড়ী পথ ধরে উঠে যাচ্ছে গাড়ি। সেদিকে চেয়ে বলল কিশোর, ‘হ্যানসন, ব্ল্যাক ক্যানিয়নের দিকে যাচ্ছি কেন?’
‘ওদিক দিয়েই যেতে হবে, মাস্টার পাশা। ক্যানিয়নের মাইলখানেক দূর দিয়ে বেরিয়ে যাব।’
‘ভালই হল। আবার একবার ঢুকব ব্ল্যাক ক্যানিয়নে। কয়েকটা ব্যাপারে শিওর হওয়া দরকার।’
মিনিট কয়েক পরেই গিরিপথের প্রবেশমুখে পৌঁছে গেল ওরা। ভেতরে ঢুকে পড়ল গাড়ি। পরিচিত পথ, অথচ কেমন অপরিচিত মনে হচ্ছে এখন! দিনের আলোয় একেবারে অন্যরকম লাগছে পথটাকে।
ভেঙে পড়া ক্রসবার আর পাথরের স্তূপের কাছে এনে গাড়ি রাখল হ্যানসন। পথের দিকে চেয়ে বলে উঠল, ‘দেখুন দেখুন, আরেকটা গাড়ির টায়ারের দাগ! গতরাতেই ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছি। কেউ অনুসরণ করেছিল আমাদেরকে।’
‘অনুসরণ! কে?’ একে অন্যের দিকে চাইল মুসা আর কিশোর।
‘আরেক রহস্য মাথা চাড়া দিচ্ছে,’ বলল কিশোর। ‘যাকগে। আগের কাজ আগে শেষ করি। টেরর ক্যাসলের বাইরেটা ঘুরে দেখব চল।’
‘চল,’ বলল দ্বিতীয় গোয়েন্দা। ‘বাইরে দিয়ে ঘুরতে আমার কোন আপত্তি নেই।’
দিনের আলোয় অনেক সহজে অনেক কম সময়ে দুর্গের কাছে পৌঁছে গেল ওরা। বিশাল টাওয়ার, আকাশ ছুঁতে চাইছে যেন।
‘গতরাতে ওই ভূতের আড্ডায় ঢুকেছিলাম, ভাবলে এখনও গা ছমছম করে,’ বলল মুসা।
দুর্গের বাইরের দিকে পুরো একপাক ঘুরে এল কিশোর। তারপর আবার চলল পেছনে। ওখান থেকে প্রায় খাড়া নিচে নেমে গেছে পাহাড়টা।
‘বাড়িটাতে মানুষ থাকে কিনা বুঝতে চাইছি,’ বলল কিশোর। ‘তাহলে তার কিছু না কিছু চিহ্ন থাকবেই। জুতোর ছাপ…সিগারেটের পোড়া টুকরো...’
পাওয়া গেল না তেমন কিছু। পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ল দু’জনেই। দুর্গের পাশে বিশ্রাম করতে বসল।
‘নাহ্, মানুষ থাকে না এখানে,’ বলল কিশোর। ‘ভূত আছে, তা-ও বিশ্বাস করতে পারছি না…’
হঠাৎ তীক্ষ্ণ এক চিৎকারে চমকে উঠল দু’জনেই। মানুষ! মানুষের গলা! লাফিয়ে উঠে ছুটল ওরা। কয়েক পা এগিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল। দুর্গের সদর দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে দুটো মানুষ। আতঙ্কিত গলায় চেঁচাচ্ছে। হঠাৎ কিসে হোঁচট লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল একজন। চকচকে কিছু একটা ছিটকে পড়ল হাত থেকে। কিন্তু ওটা তুলল না সে। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে কোনমতে উঠেই সঙ্গীর পেছনে ছুট লাগাল আবার।
‘ভূত না!’ বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই বলে উঠল মুসা। ‘তবে ছোটার ধরন দেখে মনে হচ্ছে ভূতের সঙ্গে দেখা হয়েছে!’
‘জলদি!’ বলেই ছুটতে শুরু করল কিশোর। ‘ব্যাটাদের চেহারা দেখা দরকার।’
দ্রুত দৌড়াচ্ছে কিশোর। পেছনে মুসা।
প্রায় চোখের আড়ালে চলে গেছে। বাঁকটা ঘুরলেই অদৃশ্য হয়ে যাবে, ধরা যাবে না ওদেরকে। বুঝে ছোটার গতি কমিয়ে দিল কিশোর। দাঁড়িয়ে পড়ল এসে, যেখানে আছাড় খেয়েছিল একজন। কাছেই পড়ে আছে চকচকে জিনিসটা। টর্চ। নিচু হয়ে তুলে নিল কিশোর। খুদে একটা নেমপ্লেট আটকানো টর্চের গায়ে। তাতে দুটো অক্ষর খোদাই করা।
‘টি ডি!’ জোরে জোরে পড়ল কিশোর। ‘কে হতে পারে, বল তো, মুসা?’
‘টেরিয়ার ডয়েল!’ প্রায় ফেটে পড়ল মুসা। ‘শুঁটকো টেরি! কিন্তু তা কি করে হয়? ব্যাটা এখানে আসবে কেন?’
‘এসেছে! লাইব্রেরিতে রবিনের কাজকর্ম দেখছিল, ভুলে গেছ? আমাদের কার্ড ওই ব্যাটাই চুরি করেছে। গতরাতে ফলো করেছিল ওই। সব সময়েই তো পেছনে লেগে থাকে শুঁটকো। কি করি না করি জানার চেষ্টা করে। এবারেও নিশ্চয় একই ব্যাপার। আমাদের কাজে গোল বাধানোর তালে আছে।’
‘তা হতে পারে,’ চিন্তিত দেখাচ্ছে সহকারী গোয়েন্দাকে। ‘রাতে আমরা ঢুকেছি, দেখেছে! তখন সাহস করেনি। দিনের বেলা দেখতে এসেছে, কেন গিয়েছিলাম দুর্গের ভেতরে। কেমন মজা! খেলি তো ভূতের তাড়া।’ হাসি একান-ওকান হয়ে গেল মুসার।
ব্যাপারটাকে এত হালকাভাবে নিতে পারল না কিশোর। টর্চটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে বলল, ‘এত হাসির কিছু নেই। ভূত আমাদেরকেও ছাড়েনি। তবে আমরা আবার ঢুকব ওদের আড্ডায়, কিন্তু শুঁটকো আর এদিক মাড়াবে না। ভাবছি, এখুনি আবার ঢুকব দুর্গে। দিনের আলোয় ভাল করে দেখতে চাই সব।’
প্রতিবাদ করতে গিয়েও থেমে গেল মুসা। ভারি কিছু ধসে পড়ার শব্দ কানে আসছে। চমকে চোখ তুলে চাইল দু’জনেই। ঠিক মাথার ওপরে পাহাড়ের চূড়ার কাছ থেকে গড়িয়ে নেমে আসছে বিশাল এক পাথর।
ছুট লাগাতে যাচ্ছিল মুসা, খপ করে তার হাত ধরে ফেলল কিশোর। ‘থাম! আমাদের ওপর পড়বে না! কয়েক গজ দূর দিয়ে চলে যাবে।’
ঠিকই। ওদের কয়েক গজ দূর দিয়ে তুমুল গতিতে ছুটে গেল পাথরটা, দশ গজ নিচের রাস্তায় আছড়ে পড়ল। পথের সর্বনাশ করে দিয়ে, চারদিকে কংক্রীটের গুঁড়ো ছড়িয়ে ফেলে গড়িয়ে নেমে চলে গেল ঢালু পথ বেয়ে।
‘ইয়াল্লা!’ এখনও গা কাঁপছে মুসার। ‘গায়ে পড়লে টেরর ক্যাসলের ভূতের সংখ্যা আরও দুটো বাড়ত!’
‘দেখ দেখ!’ মুসার হাত খামচে ধরে টান দিল কিশোর। ‘ঢালের গায়ে ওই যে ঝোপটা, কে যেন নড়াচড়া করছে ওর ভেতরে! নিশ্চয় ব্যাটা শুঁটকো। অন্য ধার দিয়ে ঘুরে আমাদের অলক্ষ্যে গিয়ে চড়েছে ওখানে। পাথর গড়িয়ে দিয়েছে আমাদের দিকে।’
‘এবার আর ব্যাটাকে ছাড়ছি না আমি,’ শার্টের হাতা গুটাতে লাগল মুসা। ‘শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব।’
খাড়াই বেয়ে তাড়াহুড়ো করে উঠতে শুরু করল দুই গোয়েন্দা। আলগা পাথর আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে জন্মে থাকা কাঁটা ঝোপ বাধা সৃষ্টি করছে। খানিকটা ওঠার পরেই দেখল ওরা, দ্রুত সরে যাচ্ছে একটা মূর্তি, দেখতে দেখতে হারিয়ে গেল একপাশে।
আরও দ্রুত ওঠার চেষ্টা করল দু’জনে। পাহাড়ের গা থেকে কার্নিসের মত বেরিয়ে থাকা বিরাট এক চ্যাপ্টা পাথরের কাছে এসে থমকে গেল। ওটা ডিঙানো সম্ভব না। ওখানেই দাঁড়িয়ে জোরে জোরে হাঁপাতে লাগল দু’জনে।
কার্নিসের মত পাথরটার একপাশে পাহাড়ের গায়ে বড়সড় একটা চৌকোণা গুহামুখ। গুহার নিচ থেকে টেনে সামনে বেরিয়ে আছে বড় আরেকটা চ্যাপ্টা পাথর, অনেকটা ঝোলা বারান্দার মত। আরাম করে বসা যাবে ওখানে। ওটার দিকে এগিয়ে চলল দুই বন্ধু।
প্রায় পৌঁছে গেছে বারান্দার কাছে, এই সময় মাথার ওপরে চাপা গম্ভীর একটা শব্দ হল। তারপরই পাথরে পাথরে ঠোকাঠুকির আওয়াজ। চমকে আবার চোখ তুলে চাইল দু’জনেই। এবার আর একটা নয়, অসংখ্য পাথরের ধস নেমে আসছে।
বরফের মত জমে গেল যেন মুসা। কি করবে বুঝে উঠতে পারল না।
কিন্তু বুদ্ধি হারাল না কিশোর। এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। পরক্ষণেই সঙ্গীর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মারল। ঝোলা বারান্দার ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে এসে পড়ল দু’জনে। জোরে এক ধাক্কা দিয়ে মুসাকে গুহার ভেতরে ঠেলে দিল কিশোর। নিজেও গড়িয়ে চলে এল ভেতরে। দ্রুত গড়াতে গড়াতে গর্তের একেবারে শেষ সীমায় চলে এল দু’জনে। ঠিক এই সময় প্রথম পাথরটা আঘাত হানল বারান্দায়। দেখতে দেখতে শুরু হয়ে গেল পাথরবৃষ্টি। ছোট, মাঝারি, বড়, সব রকমের, সব আকারের পাথর পড়ছে একনাগাড়ে।
বজ্রের গর্জন তুলে আছড়ে এসে বারান্দায় পড়ছে পাথর, কিছু গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে, কিছু যাচ্ছে আটকে, কিছু গড়িয়ে চলে আসছে ভেতরে। একটার পর একটা জমছে পাথর, দেয়াল উঠে যাচ্ছে গর্তের সামনের খোলা অংশে।
গর্তের শেষ মাথায় দেয়ালের গায়ে সেঁটে বসে রইল দুই বন্ধু। আলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে তাদের চোখের সামনে থেকে, হারিয়ে যাচ্ছে আকাশ। কয়েক সেকেণ্ডেই পাহাড়ের ঢালে পাথরের কবরে আটকে গেল ওরা। জ্যান্ত কবর। আলো আর আকাশ পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে চোখের সামনে থেকে। ঘুটঘুটে অন্ধকার।
বাইরে ধীরে ধীরে কমে এল পাথর। ধসের গর্জন। স্তব্ধ হয়ে গেছে দুই বন্ধু। নিকষ কালো অন্ধকার। গর্তের ভেতরে ছোট্ট পরিসর, বাতাসে ভাসছে ধূলিকণা। দম আটকে দিতে চাইছে।
‘কিশোর!’ কাশতে কাশতে বলল মুসা। ‘ফাঁদে আটকে গেছি আমরা! আর বেরোতে পারব না! দম বন্ধ হয়ে মরব এবার!’
‘নাকে রুমাল চাপা দাও, জলদি!’ বলল কিশোর। ‘শিগগিরই নেমে যাবে ধূলিকণা।’ অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে সঙ্গীর কাঁধ চেপে ধরল সে। ‘ভেব না, দম বন্ধ হয়ে মরব না। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এই গুহা। আমি দেখেছি, এক পাশের দেয়ালে বড় একটা ফাটল আছে। কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে জানি না। তবে ওটা দিয়ে বাতাস চলাচল করে। শুঁটকোকে ধন্যবাদ। ওর সৌজন্যেই একটা টর্চ আছে এখন আমার পকেটে।’
‘ঠিকই, শুঁটকোকে ধন্যবাদ,’ ব্যঙ্গ করল মুসা। ‘ওর সৌজন্যেই এই কবরে আটকেছি আমরা! ইসস, বগাটাকে যদি হাতের কাছে পেতাম এখন। সরু ঘাড়টাই মটকে দিতাম!’
‘কিন্তু ও-ই করেছে কাজটা, কোন প্রমাণ নেই। পাথরের ধস কেন নেমেছে কিছুই জানি না আমরা এখনও,’ বলতে বলতেই টর্চের বোতাম টিপে দিল কিশোর। গাঢ় অন্ধকার চিরে দিল তীব্র আলোর রশ্মি।
আলো ফেলে দেখল কিশোর। ফুট ছয়েক উঁচু গুহাটা, পাশ চার ফুট মত। এক পাশের দেয়ালে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত নয় দশ ইঞ্চি চওড়া একটা ফাটল। ঝিরঝির করে বাতাস আসছে ওপথে। কিন্তু ওদিক দিয়ে বেরোনো যাবে না।
বিরাট এক পাথর আটকে গেছে গর্তের মুখে। ওটার আশপাশে ওপরে ছোট বড় আরও পাথর ঠেসে আটকেছে, তার ওপর জমেছে বালি আর মাটি।
‘হুঁম্ম্ খুব সুন্দর ভাবেই পাথরের দেয়াল উঠেছে,’ যেন ভাল একটা কাজের কাজ হয়েছে এমনি ভঙ্গিতে বলল কিশোর।
‘এখনও বড় বড় কথা গেল না তোমার!’ মুসার গলায় ক্ষোভ। ‘বলে ফেললেই হয় ভালমত আটকে গেছি আমরা। আর বেরোতে পারব না।’
‘সেটা বলতে যাব কেন? এখনও জানি না বের হতে পারব কিনা। এস ঠেলা লাগাই। যদি নাড়াতে পারি...’
গায়ের জোরে ঠেলা লাগাল দু’জনে। এক চুল নড়ল না পাথর। হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ল ওরা বিশ্রাম নিতে।
‘হ্যানসন নিশ্চয় আসবে।’ কেঁদেই ফেলবে যেন মুসা। ‘কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পাবে না আমাদের। শেষে পুলিশে খবর দেবে। পুলিশ আসবে, বয় স্কাউটরা আসবে, খোঁজাখুঁজি হবে প্রচুর। আমরা চেঁচালেও সে আওয়াজ বাইরে যাবে না। তারমানে আর কোন দিনই...’ চুপ করে গেল সে।
কিশোর শুনছে না কথা। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। হাতের টর্চের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে গুহার পেছন দিকটা। তীক্ষ্ণ চোখে সেদিকেই চেয়ে আছে সে।
‘ছাই দেখা যাচ্ছে,’ বলল কিশোর। ‘কোন কারণে এখানে আশ্রয় নিয়েছিল কেউ।’ বলতে বলতেই উঠে গিয়ে ছাইয়ের কাছে বসল সে। এক হাতে টর্চ নিয়ে অন্য হাতে খুঁড়তে শুরু করল ছাই আর ধূলোর গাদা। আধ ইঞ্চিমত বেরিয়েছিল, খুঁড়ে খুঁড়ে প্রায় ইঞ্চি চারেক বের করে ফেলল ওটার মাথা। একটা শক্ত ডাল। টানাহেঁচড়া করে ডালটা বের করে নিয়ে এল সে। ফুট চারেক লম্বা, ইঞ্চি দুয়েক পুরু। এক মাথা পোড়া।
‘কপাল ভাল আমাদের,’ বলে উঠল কিশোর। ‘ডালটা পেয়ে গেছি। নিশ্চয় এর মাথায় খাবার গেঁথে পুড়িয়ে খেয়েছিল লোকটা।’
ডালটার দিকে হাবার মত চেয়ে রইল মুসা। পুরানো, আধপোড়া ওই লাঠি তাদের কি কাজে লাগবে বুঝতে পারছে না।
‘এটা দিয়ে চাড় লাগিয়ে পাথর সরানোর কথা ভাবছ নাকি?’ জানতে চাইল মুসা। ‘খামোকাই খাটবে তাহলে।’
‘না, চাড় দেব না।’
কোন কথা মনে এলে আগেভাগেই সেটা জানিয়ে দেয়ার পক্ষপাতী নয় কিশোর। আগে দেখে নেয়, তার পরিকল্পনায় খুঁত বেরোয় কিনা, তারপর দরকার হলে প্রকাশ করে। এটা জানে মুসা, তাই, ডালটা দিয়ে কি করবে না করবে সে ব্যাপারে আর কোন প্রশ্ন করল না সঙ্গীকে।
কোমরের বেল্টে ঝোলানো আটফলার ছোট সুইস ছুরিটা খুলে নিল কিশোর। একটা কাটিয়ং ব্লেড বের করে কাজে লেগে গেল।
ডালের পোড়া মাথাটা চেঁছে চোখা করে ফেলল কিশোর। ছুরিটা আবার আগের জায়গায় রেখে দিয়ে ডাল হাতে করে গিয়ে দাঁড়াল পাথরের দেয়ালের সামনে। আলো ফেলে ভালমত পরীক্ষা করে দেখল দেয়ালটা। বোঝার চেষ্টা করল কোন্ দিকে পাথরে সংখ্যা কম। তারপর লাঠির চোখা মাথা দিয়ে খোঁচা লাগাল দেয়ালের একপাশে। কয়েক ইঞ্চি ঢুকেই ঠেকে গেল লাঠির মাথা। জোরাজুরি করেও আর ঢোকানো গেল না। নিশ্চয় পাথরে আটকে গেছে। টেনে বের করে এনে আবার খানিকটা ওপরে ঢোকাল সে। আবার কয়েক ইঞ্চি ঢুকে ঠেকে গেল মাথা। আবার বের করে এনে আরেক জায়গায় ঢোকাল। এবার আর ঠেকল না। ওপাশে বেরিয়ে গেল চোখা মাথাটা। হ্যাঁচকা টানে বের করে আনতেই হড়হড় করে ঝরে পড়ল কিছু বালি মাটি।
আপন মনেই মাথা ঝোঁকাল কিশোর। ছিদ্রটাতে আবার লাঠি ঢোকাল। আস্তে আস্তে চাড় দিতে লাগল চারদিকে। বালি-মাটি ঝরে পড়তে লাগল। হাত ঢোকানো যায় এমন একটা গর্ত হয়ে গেল দেয়ালের গায়ে শিগগিরই। আলো চুঁইয়ে ঢুকছে গুহার ভেতর।
আবার কাজে লেগে গেল কিশোর। কয়েক মিনিটেই গর্তটার পাশে ওরকম আরেকটা গর্ত করে ফেলল। দুটো গর্তের মাঝামাঝি আবার লাঠি ঢুকিয়ে দিল। খোঁচাতে খোঁচাতে বালি-মাটি ফেলে এক করে ফেলল দুটো গর্ত। বেশ বড় একটা ফোকর হয়ে গেছে এখন। ফোকরের কাছে চোখ নিয়ে গিয়ে বাইরে তাকাল সে। চোখের সামনে ফুটে উঠল গোল একটা বড় পাথর।
‘এবার,’ সন্তুষ্ট গলায় বলল কিশোর, ‘এস, হাত লাগাও।’
ফোকর দিয়ে লাঠি ঢুকিয়ে দিল আবার। পাথরে ঠেকাল লাঠির মাথা। দু’জনে মিলে এপাশ থেকে ঠেলা লাগাল জোরে।
প্রথমে নড়তে চাইল না পাথর! শেষ অবধি পরাজিত হতেই হল। চাপা ভোঁতা একটা আওয়াজ তুলে বালি মাটি আর সঙ্গী পাথরের আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে, গড়িয়ে পড়তে লাগল। পড়ার সময় কিছু আলগা সঙ্গীকে নিয়ে গেল সাথে করে। ফোকরের বাইরের মুখটা বড় হল আরেকটু।
ফোকরের ওপর দিকে একটা পাথর বেছে নিল কিশোর। কতখানি বড় পাথর, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। লাঠির মাথা পাথরের নিচের দিকে ঠেকিয়ে ঠেলে যেতে লাগল দু’জনে। এক চুল নড়ল না পাথর। পরিশ্রমে দরদর করে ঘামছে দু’জনে। পিচ্ছিল হয়ে আসছে লাঠি ধরা হাত। কিন্তু বিরত হল না। বেশিক্ষণ আর অনড় থাকতে পারল না পাথর। হড়াৎ করে একটা শব্দ তুলে খুলে এল বালিমাটির আকর্ষণ থেকে। বিশাল পাথর। ধুপ করে আছড়ে পড়ল নিচের সঙ্গী সাথীদের ওপর। অনেকগুলো পাথরকে নড়িয়ে ফেলল ধাক্কা দিয়ে, সঙ্গে নিয়ে গড়াতে গড়াতে চলে গেল ঢাল বেয়ে।
বেশ প্রশস্ত হয়ে গেছে এখন ফোকরের বাইরের দিকটা। এপাশটাও প্রশস্ত করতে লেগে গেল ওরা। খুব বেশিক্ষণ লাগল না। ক্রল করে বেরিয়ে যাবার উপযোগী একটা সুড়ঙ্গ তৈরি করে ফেলল ওরা।
‘কিশোর, তুমি একটা জিনিয়াস।’ প্রশংসা না করে পারল না মুসা।
‘বেশি বাড়িয়ে বলছ,’ প্রতিবাদ করল কিশোর। ‘যা করেছি, এর জন্যে প্রতিভার দরকার পড়ে না। বাঁচার তাগিদেই মাথায় এসে গিয়েছিল বুদ্ধিটা।’
‘কিন্তু আমার মাথায় তো আসেনি...’
‘হয়েছে হয়েছে, বেরোও এখন। বেশি নড়াচড়া কোরো না। ওপর থেকে পাথর পড়ে থেঁতলে যেতে পারে মাথা।’
খুব সাবধানে পাঁকাল মাছের মত দেহটাকে মুচড়ে মুচড়ে গর্তের বাইরে বের করে নিয়ে এল মুসা। সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে মাথা ঢোকাতে বলল বন্ধুকে।
বেশি কষ্ট করতে হল না কিশোরকে। হাত ধরে টেনে ওকে গুহার বাইরে বের করে নিয়ে এল মুসা।
ঢাল বেয়ে নিরাপদ জায়গায় সরে এল দু’জনে। নিজেদের দিকে তাকাবার সময় পেল এতক্ষণে।
‘সেরেছে!’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ‘কেউ দেখলে আমাদেরকেই ভূত ঠাউরাবে এখন।’
‘ও কিছু না,’ বলল কিশোর। ‘কোন সার্ভিস স্টেশনে থেমে হাত-মুখ ধুয়ে নিলেই হবে। ভাল করে ঝাড়লে কাপড়েও বালি থাকবে না আর তেমন। এ অবস্থায় দেখা করতে হচ্ছে না মিস্টার ফিসফিসের সঙ্গে!’
‘এত কিছুর পরেও দেখা করতে যাচ্ছি আমরা!’ অবাক হয়ে বন্ধুর দিকে চাইল মুসা।
‘কেন নয়? ওটাই তো আসল কাজ, সেজন্যেই তো বেরিয়েছি। চল চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে,’ তাড়া দিল কিশোর।
সারা পথে পাথরের ছড়াছড়ি। হাঁটতেই কষ্ট হচ্ছে। এমনিতে যা লাগার কথা তার দ্বিগুণ সময় লেগে গেল পথটা পেরোতে।
কাছে এসে ভয়ে ভয়ে দুর্গের সদর দরজার দিকে তাকাল মুসা।
‘না, আজ আর ঢুকছি না,’ বন্ধুকে অভয় দিল কিশোর। ‘এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। মিস্টার ফিসফিসের সঙ্গে দেখা করাটা বেশি জরুরি।’
বাঁক পেরিয়ে এল দু’জনে। গাড়িটা দেখা যাচ্ছে। অস্থিরভাবে পায়চারি করছে হ্যানসন। উদ্বিগ্ন।
কিশোর আর মুসাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল শোফার। ‘ফিরেছেন তাহলে! খুব ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলাম!’ দু’জনের সারা গায়ে একবার চোখ বোলাল সে। ‘কোন দুর্ঘটনা?’
‘তেমন কিছু না,’ জবাব দিল কিশোর। ‘আচ্ছা, মিনিট চল্লিশেক আগে দুটো ছেলেকে এদিক দিয়ে যেতে দেখেছেন?’
‘চল্লিশ মিনিট নয়, তারও বেশি আগে,’ গাড়িতে উঠে বসতে বসতে বলল হ্যানসন। ‘ক্যাসলের দিক থেকে ছুটে এল দুটো ছেলে। আমাকে দেখেই পাশ কেটে একটা ঝোপের ওপাশে চলে গেল। খানিক পরেই ইঞ্জিনের শব্দ শুনলাম। ঝোপের ওপাশ থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল একটা নীল স্পোর্টস কার।’
একে অন্যের দিকে চাইল মুসা আর কিশোর। মাথা ঝোঁকাল দু’জনেই। টেরিয়ারের গাড়িটাও নীল রঙের স্পোর্টস কার।
‘তারপর,’ আগের কথার খেই ধরল হ্যানসন, ‘পাথর গড়িয়ে পড়ার আওয়াজ শুনলাম। অপেক্ষায় রইলাম আপনাদের। দেরি হচ্ছে দেখে ভাবনায়ই পড়ে গিয়েছিলাম। আমার ওপর হুকুম আছে, কিছুতেই যেন গাড়িটাকে চোখের আড়াল না করি। কিন্তু আপনাদের ফিরতে আরেকটু দেরি হলেই হুকুম অমান্য করতাম, না গিয়ে পারতাম না।’
‘ছেলে দুটো চলে যাবার পর পাথর গড়ানোর আওয়াজ শুনেছেন? ঠিক?’ নিশ্চিত হতে চাইছে কিশোর।
‘নিশ্চয়,’ জবাব দিল হ্যানসন। ‘এখন কোথায় যাব, স্যার?’
‘আটশো বারো উইন্ডিং ভ্যালিরোড, যেখানে রওনা হয়েছিলাম,’ কেমন আনমনা মনে হল কিশোরকে।
বন্ধুর মনে এখন কিসের ভাবনা চলছে, জানে মুসা। নিশ্চয় ভাবছে, পাথর ধসের আগেই যদি চলে গিয়ে থাকে টেরিয়ার, তাহলে পাথর ঠেলে ফেলল কে? পাশে বসা সঙ্গীর দিকে চাইল সে। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর, গভীর চিন্তায় মগ্ন।
‘শুঁটকো নয়, তাহলে কে করল কাজটা?’ আপনমনেই বিড়বিড় করল কিশোর। ‘একটা মানুষকে দেখেছি পাহাড়ের ওপরে, সে-তো মিথ্যে নয়!’
‘না, মিথ্যে নয়,’ বন্ধুর সঙ্গে একমত হল মুসা। ‘এবং ও মানুষই। ভূত-প্রেত কিছু নয়।’
‘ব্যাপারটা একটু অদ্ভুতই।’ বাস্তবে ফিরে এল যেন কিশোর। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যানসন, একটা সার্ভিস স্টেশনে একটু রাখবেন। হাত-মুখ ধুতে হবে।’
ঝেড়েঝুড়ে জামাকাপড় যতটা সম্ভব পরিষ্কার করে নিল দুই গোয়েন্দা। হাতমুখ ধুয়ে চুল আঁচড়ে নিল। তারপর আবার এসে উঠল গাড়িতে।
পাহাড়ী পথ ধরে আবার ছুটে চলল রোলস রয়েস। পাহাড়ের ওপাশে নিচের উপত্যকায় নেমে গেছে পথটা। ডানে মোড় নিয়ে আরও মাইল খানেক এগিয়ে গিয়ে মিশেছে উইন্ডিং ভ্যালি রোডে।
শুরুতে পথটা বেশ চওড়া, দু’ধারে সুন্দর সুন্দর বাড়িঘর। ধীরে ধীরে সরু হয়ে গেছে, হঠাৎ করেই ঢুকে পড়েছে একটা গিরিপথে। দু’ধারে কোথাও কোথাও খাড়া পাহাড়ের দেয়াল, দু’দিক থেকে চেপে ধরতে চাইছে যেন। অনেক বেশি ঘুরেফিরে এগিয়ে গেছে পথ। হঠাৎ করেই কোন এক পাশের দেয়াল যেন লাফ দিয়ে সরে যাচ্ছে, বেরিয়ে পড়ছে খানিকটা খোলা জায়গা। ছোটখাট একআধটা বাংলোমত বাড়ি উঠেছে ওখানে। তারপরই যেন আবার লাফিয়ে পথের গা ঘেঁষে এসে দাঁড়াচ্ছে পাহাড়। এত বেশি ঘোরপ্যাঁচ বলেই পথটার নাম হয়েছে উইন্ডিং ভ্যালি রোড।
একটা জায়গায় এসে আবার ওপরের দিকে উঠে চলল পথ, আরও সরু হয়ে আসতে লাগল। কয়েলের মত ঘুরে ঘুরে উঠে যাওয়া পথ হঠাৎ করে এসে শেষ হয়ে গেছে এক জায়গায়। তারপরেই গোল একটু সমতল জায়গা পাহাড়ের মাথায়, গাড়ি ঘোরানোর জন্যে। তার উল্টোদিকে খাড়া নেমে গেছে দেয়াল, তলায় গভীর খাদ। নিচে কঠিন পাথর। ঘোরানোর সময় ড্রাইভার একটু অসতর্ক হলেই তলায় গিয়ে আছড়ে পড়বে গাড়ি।
গোলমত জায়গাটায় এনে গাড়ি থামিয়ে দিল হ্যানসন। জায়গা দেখে অবাকই হয়েছে যেন সে, চেহারাই জানান দিচ্ছে।
‘পথের শেষ মাথায় চলে এসেছি!’ এদিক ওদিক চেয়ে বলল হ্যানসন। ‘কই, কোন বাড়িঘর তো চোখে পড়ছে না।’
‘ওই যে, একটা মেলবক্স!’ হঠাৎ বলে উঠল মুসা। বাক্সের গায়ের লেখাটা পড়ল, ‘প্রাইস আটশো বারো! তার মানে কাছে পিঠেই কোথাও আছে বাড়িটা।’
গাড়ি থেকে নেমে এল দুই গোয়েন্দা। ক্ষতবিক্ষত একটা ঝোপের পাশে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেলবক্স। ওটার ধার দিয়ে চলে গেছে একটা এবড়োখেবড়ো পাথুরে পথ। জায়গায় জায়গায় ঝোপঝাড়। ওগুলোর মাঝখান দিয়ে সোজা ওপরের দিকে উঠে গেছে পথটা। উঠে চলল দু’জনে। শিগগিরই তাদের অনেক নিচে পড়ে গেল গাড়িটা।
বেশ কয়েকটা ঝোপঝাড় পেরিয়ে এল ওরা। ছোট একটা জংলা মত জায়গা পেরোতেই চোখে পড়ল বাড়িটা। পাহাড়ের ঢালে জোর করে বসিয়ে দেয়া হয়েছে যেন লাল টালির ছাত দেয়া পুরানো টাইপের একটা স্প্যানিশ বাংলো। বাংলোর একপাশে পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে এক বিশাল খাঁচা, ছোটখাট ঘরের সমান। ভেতরে পুরে রাখা হয়েছে অসংখ্য কাকাতুয়া। একনাগাড়ে কিচ-কিচ করে যাচ্ছে পাখিগুলো, হুড়োহুড়ি করছে, উড়ছে খাঁচার স্বল্প পরিসরে।
খাঁচার কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল দু’জনে। চেয়ে আছে উজ্জ্বল রঙের পাখিগুলোর দিকে। এই সময় পেছনে শোনা গেল পায়ের আওয়াজ।
প্রায় একই সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল দু’জনে। যে পথে এসেছে ওরা, সেপথেই আসতে দেখল লোকটাকে। লম্বা, পুরো মাথা জুড়ে টাক, বিরাট সানগ্লাসের আড়ালে ঢাকা পড়েছে চোখ। এক কানের নিচ থেকে শুরু হয়েছে গভীর কাটা একটা দাগ, গলা বেয়ে নেমে গেছে নিচের দিকে, বুকের হাড়ের কাছে গিয়ে ঠেকেছে।
কথা বলে উঠল লোকটা। গা ছমছম করা কেমন এক ধরনের ফিসফিসে আওয়াজ। ‘খবরদার, যেখানে আছ দাঁড়িয়ে থাক! একচুল নড়বে না কেউ।’
স্থির হয়ে গেল দু’জনেই।
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল লোকটা। বাঁ হাতে বাগিয়ে ধরে আছে একটা মাচেটে। রোদ লেগে ঝিলিক দিয়ে উঠছে বিশাল ছুরির তীক্ষ্ণধার ফলা।
এক পা দু’পা করে এগিয়ে আসছে লোকটা।
‘একটু নড়বে না!’ ফিসফিসিয়ে উঠল আবার সে। ‘প্রাণের ভয় থাকলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক!’
মুসার কাছে এই হুঁশিয়ারি অহেতুক। নড়ছে না সে এমনিতেই। হঠাৎ বিদ্যুতের চমক দেখা দিল তার আর কিশোরের মাঝামাঝি। দু’জনের ঊরুর কাছ দিয়ে উড়ে চলে গেল মাচেটে। ঘ্যাঁচ করে গিয়ে বিঁধল মাটিতে।
হতাশ গলায় বলে উঠল লোকটা, ‘উঁহহুঁ, গেল মিস হয়ে!’ সানগ্লাস খুলে আনল চোখের ওপর থেকে। নীল আন্তরিক চোখে চেয়ে আছে ছেলেদের দিকে। খানিক আগের মত ভয়াবহ আর লাগছে না এখন তাকে।
‘তোমাদের পেছনে ঘাসের ভেতরে ছিল সাপটা,’ সাফাই গাইল লোকটা। ‘র্যাটলার কিনা বুঝতে পারলাম না। বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি, সেজন্যেই ফসকে গেল নিশানা।’
সাদায়-লালে মেশানো একটা রুমাল বের করে ভুরুর কাছের ঘাম মুছল লোকটা। ‘পাহাড়ের ওপাশে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করছিলাম। বাজে জিনিস। দাবানল ছড়ানোর ওস্তাদ। ইস্স্, ঘেমে নেয়ে গেছি একেবারে। এক গ্লাস করে লেমোনেড খেলে কেমন হয়, অ্যাঁ?’
লোকটার ফিসফিসানিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে ইতিমধ্যে দুই গোয়েন্দা। মুসা আন্দাজ করল, গলার বিচ্ছিরি কাটাটাই ওই স্বর বিকৃতির জন্যে দায়ী।
বাংলোর দিকে হাঁটতে শুরু করল হ্যারি প্রাইস। পিছু পিছু চলল দুই গোয়েন্দা। একটা ঘরে এসে ঢুকল। একপাশে লম্বালম্বি পর্দা ঝোলানো। এপাশে একটা টেবিল ঘিরে কয়েকটা ইজি চেয়ার। টেবিলে বড়সড় একটা জগে বরফ দেয়া লেমোনেড। পর্দার ওপার থেকে ভেসে আসছে কাকাতুয়ার কর্কশ কিচির-মিচির।
‘পাখি পুষে, পাখি বিক্রি করেই পেট চালাই আমি,’ জগ থেকে তিনটে গ্লাসে লেমোনেড ঢালতে ঢালতে বলল প্রাইস। দুটো গ্লাস তুলে দিল দুই কিশোরের হাতে। ‘তোমরা খাও। আমি আসছি, এক মিনিট।’ সানগ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে পাশের ঘরে চলে গেল সে।
ধীরে ধীরে লেমোনেডে চুমুক দিতে লাগল কিশোর। চিন্তিত। ‘মিস্টার প্রাইসকে দেখে কি মনে হয়?’
‘ভালই তো,’ জবাব দিল মুসা। ‘ফিসফিসানিটাই শুধু খারাপ লাগে। এমনিতে লোকটা মন্দ না।’
‘হ্যাঁ, বেশ মিশুক। কিন্তু মিথ্যে কথা বলল কেন? হাত তো দেখলাম পরিষ্কার। ঝোপঝাড় কাটলে কিছু না কিছু লেগে থাকতই।’
‘কিন্তু মিথ্যে কথা বলবে কেন? এর আগে কখনও দেখেনি আমাদের। কোন কারণ নেই।’
মাথা নাড়ল কিশোর। ‘বুঝতে পারছি না। আরও একটা ব্যাপার। ঝোপ কাটতেই যাক আর যেখানেই যাক, বেশিক্ষণ যায়নি। লেমোনেডে বরফের টুকরো রেখে গিয়েছিল। খুব একটা গলেনি।’
‘তাই তো!’
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিশোর, প্রাইসকে ঢুকতে দেখে থেমে গেল।
কাপড় বদলে এসেছে প্রাইস। গায়ে স্পোর্টস শার্ট। গলায় জড়িয়ে নিয়েছে একটা স্কার্ফ।
‘কাটা দাগটা দেখলে অনেকেরই অস্বস্তি লাগে,’ ফিসফিস করে বলল লোকটা। ‘কারও সঙ্গে কথা বলার সময় তাই স্কার্ফ জড়িয়ে নিই। অনেক বছর আগে মালয়ের এক দ্বীপে দুর্ঘটনায় পড়েছিলাম। তখন কেটেছে। সে যাকগে। তা তোমরা এখানে কি মনে করে?’
একটা কার্ড বের করে প্রাইসের দিকে বাড়িয়ে ধরল কিশোর।
হাতে নিয়ে দেখল প্রাইস। ‘তিন গোয়েন্দা! বেশ বেশ! তা এখানে কি তদন্ত করতে এসেছ?’
কিশোর জানাল, জন ফিলবির ব্যাপারে কিছু আলোচনা করতে চায়।
সানগ্লাসটা তুলে নিয়ে পরল প্রাইস। ‘দিনের আলো সইতে পারি না। রাতে ভাল দেখি। ...তো ফিলবির ব্যাপারে হঠাৎ এত আগ্রহ কেন তোমাদের?’
‘একটা আজব কথা কানে এসেছে,’ বলল কিশোর। ‘জন ফিলবি নাকি মরার পরে ভূত হয়ে গেছে। ঠাঁই নিয়েছে ক্যাসলেই। লোককে থাকতে দেয় না। জোর করে কেউ থাকতে চাইলে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়।’
কালো কাচের ওপাশে চোখ দুটো আবছা। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। দেখছে কিশোরকে।
‘আমিও শুনেছি,’ ফিসফিসিয়ে বলল লোকটা। ছবিতে ভূতপ্রেত দৈত্য-দানবের অভিনয় করেছে জন। ভয় পাইয়েছে দর্শককে। কিন্তু আসলে সে ছিল খুবই ভদ্র, লাজুক। খালি ফাঁকি দিত তাকে লোকে। ঠকাতো। বাধ্য হয়ে শেষে আমাকে ম্যানেজার রেখেছিল। এই যে, এই ছবিটা দেখ।’
পেছনে টেবিলে রাখা ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা দেখাল প্রাইস। তুলে বাড়িয়ে ধরল কিশোরের দিকে।
হাতে নিল কিশোর। মুসাও দেখল, দু’জন মানুষ দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। হাত মেলাচ্ছে। একজন প্রাইস। আরেকজন তার চেয়ে বেঁটে, বয়েসও কম। এই ছবিটাই পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, ফটোকপি করেছে রবিন।
ছবির তলায় লেখাঃ প্রিয় বন্ধু হ্যারিকে।—জন।
‘ছবি দেখেই আন্দাজ করতে পারছ, কেমন লোক ছিল জন,’ বলল প্রাইস। ‘লোকের সঙ্গে তর্ক করতে পারত না সে, রাগারাগি করতে পারত না,’ কানের নিচে কাটা জায়গায় একবার আঙুল ছোঁয়াল সে। ‘আমাকে কেন জানি ভয় পায় লোকে। বেশি গোলমাল করে না। জনের অনুরোধে নিলাম তার ম্যানেজারি। অভিনয়ে আরও বেশি মন দিতে পারল সে। কাজটা শুধু তার পেশাই না, নেশাও ছিল। হলে বসে তার অভিনয় দেখে শিউরে উঠত দর্শক। সবাক চলচ্চিত্রের কদর বাড়ল। দেখা দিল বিপত্তি। ভীষণ চেহারার ভূতের তোতলামিতে লোকে হেসেই খুন। ভেঙে পড়ল জন। তখনকার তার মনের অবস্থা নিশ্চয় বুঝতে পারছ?’
‘হ্যাঁ, স্যার,’ বলল কিশোর। ‘বুঝতে পারছি। আমাকে নিয়ে কেউ হাসাহাসি করলে, আমারও খুব খারাপ লাগে।’
‘হপ্তার পর হপ্তা পেরিয়ে গেল,’ ফিসফিসিয়ে বলে চলল লোকটা। ‘ঘর থেকে বেরোয় না জন। একে একে বিদায় করে দিল চাকর-বাকরদের। কি আর করব? ওর বাজার-সদাই আমিই করে দিতে লাগলাম। চারদিক থেকে খবর আসছে তখন। ছবিটার ব্যাপারে। যেখানেই দেখানো হচ্ছে, হাসাহাসি করছে লোকে। অনেক বোঝালাম তাকে। লোকের কথায় কান দিতে মানা করলাম। কিন্তু কোন কাজ হল না,’ থামল প্রাইস।
অপেক্ষা করে রইল দুই গোয়েন্দা।
‘তারপর একদিন, আমাকে ডেকে, ছবিটার যে কয়টা প্রিন্ট আছে সব জোগাড় করে নিয়ে আসতে বলল জন। কেউ যেন আর দেখতে না পারে ছবিটা, কেউ যেন আর হাসাহাসি না করতে পারে। বেরোলাম। প্রচুর খরচ-খরচা করে কিনে নিয়ে এলাম সবকটা প্রিন্ট। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা মারতেই যেন এই সময় এল ব্যাংকের সমন। অনেক টাকা ধার হয়ে গেছে। শোধ না দিতে পারলে ক্যাসলটা দখল করে নেবে ব্যাংক। টাকা-পয়সা জমাত না জন। এক হাতে আয় করত আরেক হাতে খরচ করত। ভেবেছিল, বয়েস কম, খ্যাতি হয়েছে। অনেক সময় আছে টাকা জমানোর,’ বলে যাচ্ছে প্রাইস। ‘একদিন, ক্যাসলের মেইন রুমে বসে আছি দু’জনে। আলোচনা হচ্ছে বাড়িটা রাখতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে। ও বলল, মরে গিয়ে হলেও বাড়িটা দখলে রাখবে সে। তার দেহ পচেগলে শেষ হয়ে যায় যাবে, কিন্তু প্রেতাত্মা বেরোবে না ক্যাসল ছেড়ে।’
চুপ করল প্রাইস। কালো কাচের ওপাশে আবছা চোখের দৃষ্টিতে নির্লিপ্ততা।
কেঁপে উঠল একবার মুসা, ‘ইয়াল্লা! মরে তাহলে সত্যি সত্যিই ভূত হওয়ার ইচ্ছে ছিল ফিলবির!’
‘তাই তো মনে হচ্ছে,’ বলল কিশোর। ‘আচ্ছা, মিস্টার প্রাইস, ফিলবি তো খুব ভদ্র ছিল। এমন একজন লোকের প্রেতাত্মাও নিশ্চয় ভদ্রই হবে। লোককে সে ভয় দেখাচ্ছে, তাড়িয়ে দিচ্ছে ক্যাসল থেকে, বিশ্বাস হতে চায় না।’
‘ঠিকই,’ একমত হল প্রাইস। ‘আমার মনে হয় জন না, লোককে তাড়াচ্ছে অন্য প্রেতাত্মা। ওগুলো অনেক বেশি পাজী।’
‘অন্য...!’ ঢোক গিলল মুসা। ‘বেশি পাজী!’
‘হ্যাঁ। বুঝিয়ে বলছি। তোমরা জান, পাহাড়ের তলায় সাগরের ধারে পাওয়া গেছে জন ফিলবির গাড়ি?’
মাথা ঝোঁকাল দুই কিশোর।
‘তাহলে এ-ও জান, একটা নোট রেখে গেছে জন। লিখে গেছে, চিরকালের জন্য অভিশপ্ত করে রেখেছে টেরর ক্যাসলকে?’
আবার মাথা ঝোঁকাল দুই গোয়েন্দা। দু’জনেই চেয়ে আছে প্রাইসের মুখের দিকে।
‘পুলিশের ধারণা,’ বলল প্রাইস। ‘ইচ্ছে করেই পাহাড়ের ওপর থেকে গাড়ি নিয়ে পড়েছে জন। আমিও তাদের সঙ্গে একমত। সেই যে সেদিন কথা হয়েছিল ক্যাসলে, তারপর আর কোনদিন ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। আমাকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছে জন, কোন দিন যেন আর টেরর ক্যাসলে না ঢুকি। হ্যাঁ, কোন কথা থেকে যেন...’
‘অন্য প্রেতাত্মার কথা বলছিলেন,’ মনে করিয়ে দিল কিশোর। ‘খুব খারাপ।’
‘হ্যাঁ, খারাপ প্রেতাত্মা,’ বলল প্রাইস। ‘সারা দুনিয়ার বিখ্যাত সব ভূতুড়ে বাড়ি থেকে মালমশলা জোগাড় করে এনে দুর্গ সাজিয়েছে জন। জাপানের এক ভূতুড়ে মন্দির থেকে এনেছে কাঠ। ভূমিকম্পে ধসে পড়েছিল ওই মন্দির। ভেতরে যে কয়জন লোক ছিল, সব মারা গিয়েছিল ইট কাঠ চাপা পড়ে। ইংল্যান্ডের এক ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাসাদ থেকে এসেছে কিছু লোহার বরগা। ওই বরগার একটাতে দড়ি বেঁধে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল এক সুন্দরী মেয়ে। ধসে পড়ার আগে নাকি প্রায় রাতেই মেয়েটার প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত প্রাসাদের ছাতে। রাইন নদীর ধারের এক পোড়ো দুর্গের পাথর কিনে এনে লাগানো হয়েছে টেরর ক্যাসলে। ওই দুর্গের ভাঁড়ারে নাকি আটকে রাখা হয়েছিল এক পাগলা বাদককে। আটকে থেকে না খেয়ে মরে গেছে লোকটা। তারপর থেকেই গভীর রাতে দুর্গের ভেতর থেকে ভেসে আসত মিষ্টি হালকা বাজনা।’
‘খাইছে!’ চোখ বড় বড় হয়ে গেছে মুসার। ‘দেশ-বিদেশের কুখ্যাত সব ভূতকে এনে টেরর ক্যাসলে তুলেছে জন। ওরা তো লোককে ভয় দেখিয়ে তাড়াবেই। গলা টিপে আজও মারেনি কাউকে, এটাই আশ্চর্য!’
‘কেউ গিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে হয়ত মারবে,’ ফিসফিসিয়ে বলল প্রাইস। ‘তবে আমি যা জানি, কেউ যায় না টেরর ক্যাসলের ধারেকাছে। চোর-ডাকাত ভবঘুরেরা পর্যন্ত এড়িয়ে চলে। মাসে একবার করে ওদিক থেকে ঘুরে আসি আমি। পুরানো বন্ধুকে মনে রাখি। কোন বারই কাউকে ক্যাসলের কাছেপিঠে দেখিনি।’
ওরা ক্যাসলে গিয়েছিল, বলল না কিশোর। ‘আচ্ছা, অনেক কাহিনীই তো শোনা যায় ক্যাসলের ভূত সম্পর্কে। গভীর রাতে নাকি পাইপ অর্গান বাজে, নীল ভূত দেখা যায়। কতখানি সত্যি, বলতে পারেন?’
‘আমিও শুনেছি ওসব কিচ্ছা। বাজনা শুনিনি কখনও, কোন ভূতকে দেখিনি। তবে জন বলত, প্রোজেকশন রুম থেকে গভীর রাতে নাকি ভেসে এসেছে বাজনা। কয়েকবার এই ঘটনা ঘটে যাবার পর একদিন অর্গানের ইলেকট্রিক কানেকশন কেটে রাখল। বন্ধ করে রাখল প্রোজেকশন রুমের দরজা। কিন্তু লাভ হল না কিছু। সে-রাতেও ঠিক শোনা গেল সেই বাজনা।’
ঢোক গিলল মুসা।
চশমা খুলে নিল প্রাইস। দুই কিশোরের দিকে চেয়ে চোখ মিটমিট করছে। ‘টেরর ক্যাসলে ভূত আছে কি নেই, জানি না আমি,’ ফিসফিস করে বলল সে। ‘তবে, আমাকে ঢুকতে বললে ঢুকব না। রাতে ক্যাসলের দরজার ওপাশেই যাব না। লক্ষ-কোটি টাকা দিলেও না।’
0 মন্তব্যসমূহ