Header Ads Widget

Responsive Advertisement

চতুর্থ এবং শেষ পর্ব #তিন_গোয়েন্দা সিরিজ থেকে #আলাস্কা_অভিযান - রাকিব হাসান

 


চতুর্থ এবং শেষ পর্ব 


#তিন_গোয়েন্দা সিরিজ থেকে

#আলাস্কা_অভিযান - রাকিব হাসান


ভিতরের কথা ভালমত শোনার জন্য জানালায় কান পেতে দাঁড়িয়েছিল মুসা। ভালুকের গোঁ-গোঁ শুনে চমকে গেল। কেবিন থেকে শোনা গেল বিগ্সের কথা, কীসের শব্দ!

ভালুক, গোল্ডের জবাব। দাঁড়াও, আসছি।

আঙুলের ইশারায় মুসাকে একটা পাথরের চাঙড় দেখাল কিশোর।

মাথা ঝাঁকাল মুসা। মুহূর্ত পরেই কেবিনের দরজা খুলে গেল। শব্দ শুনে দরজার দিকে মুখ ফেরাল ভালুকটা। এই সুযোগে এক দৌড়ে গিয়ে পাথরের আড়ালে লুকাল কিশোর ও মুসা। ভালুক আর গোল্ডকে দেখতে পাচ্ছে এখান থেকেও।

এই ব্যাটা, বন্দুক চিনিস? হাতের রাইফেল দেখিয়ে হুমকি দিল গোল্ড। জলদি ভাগ। নইলে দুনিয়া থেকে ভাগাব।

গর্জে উঠল ভালুক। নড়ল না।

রাইফেল নেড়ে আবার চেঁচিয়ে উঠল গোল্ড, ভাগ! ভাগ! জলদি ভাগ! হোল্কা হাঁদা কোথাকার। কথা কানে যাচ্ছে না? ভাগ বলছি।

আবার গর্জে উঠল ভালুক। তবে গলার জোর কমে গেছে।

ও, ভাল কথায় যেতে ইচ্ছে করে না! রাইফেলের নল আকাশের দিকে তুলে গুলি করল গোল্ড।

আর সাহস ধরে রাখতে পারল না ভালুকটা। ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে পালাল। বনে যাওয়ার আগে থামল না আর।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মুসা। ভয় পাচ্ছিল, তাড়া খেয়ে ভালুকটা ওদের দিকে ছুটে আসে।

গুলি করলে না কেন? গোল্ডের পিছন থেকে কথা বলল বিগ।

অকারণে মেরে লাভ কী? পরক্ষণে হেসে উঠল গোল্ড। ও, ভালুকের মাংস খেতে চেয়েছিলে? আগে বললে না কেন…

আমি যাচ্ছি, বিগৃস্ বলল। যা বললাম, মনে রেখো।

আমি যা বললাম, তুমিও মনে রেখো, গোল্ডও পাল্টা জবাব দিল।

দরজা লাগানোর শব্দ হলো। বিগসের পায়ের শব্দ ক্রমশ দূরে চলে গেল। আর বসে থেকে লাভ নেই। উঠে দাঁড়াল কিশোর। চলো, যাই।

শহরে ফেরার পথে মুসা বলল, গোল্ডকে কিন্তু বিগসের লোক মনে হলো না।

কী জানি! আমি ঠিক বুঝতে পারছি না!

আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে পুরো ব্যাপারটাই একটা নাটক, মুসা বলল। আমাদেরকে দ্বিধায় ফেলার জন্য করেছে। নিশ্চয় আমাদেরকে পিছু নিতে দেখেছিল বিগস্। কেবিনে ঢুকে ইশারায় কোনভাবে গোল্ডকে বুঝিয়ে দিয়েছে আমরা পিছু নিয়েছি। তারপর দুজনে ঝগড়ার নাটক করেছে।

মাথা নাড়ল কিশোর। উঁহু, আমার তা মনে হয় না। কেন এ সব করছে অপরাধী, আসল কারণটা না জানলে ওকে ধরা কঠিন হবে। এখনও আমরা জানি না, এ সবের মূলে থিম পার্ক, না অন্য কিছু। দড়ি কেটে রেড লাইটকে ছেড়ে দেয়ার সঙ্গে ভোটেরই বা কী সম্পর্ক?

জবাব না পেয়ে চুপ হয়ে গেল মুসা।

শহরে ঢুকল ওরা। মুনকে দেখল। ঢাল বেয়ে নেমে আসছে। কাঁধে ময়দার বস্তা। দূর থেকে ওদের চিনতে পেরে হাত নাড়ল মুন। বস্তাটা নামিয়ে রেখে ওদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ওরা কাছে গেলে বলল, মনে মনে তোমাদেরকেই খুঁজছিলাম। একটা জিনিস দেখে এলাম। জরুরি কি না জানি না, তোমরা শুনলে হয়তো বুঝবে।

কী জিনিস? জানতে চাইল কিশোর। দ্বিধা করতে লাগল মুন। তারপর বলল, পোস্ট অফিসে গিয়েছিলাম, আমাদের নামে কোন চিঠি এসেছে কি না দেখতে। ইলকিস বিগসও গিয়েছিল চিঠি নিতে।

এত তাড়াতাড়ি পোস্ট অফিসে চলে গেল? ভুরু কোঁচকাল মুসা। একটু আগে তো দেখে এলাম।

কোথায় দেখেছ?

গোল্ডের ওখানে।

আমি দেখেছি কয়েক মিনিট আগে, মুন জানাল। বহু চিঠি এসেছে ওর নামে। ওর একটা চিঠির ঠিকানা দেখে ফেলেছি।

কিশোর জিজ্ঞেস করল, কী দেখলে?

অন্যের চিঠি চুরি করে দেখাটা অভদ্রতা, জানি, মুন বলল, কিন্তু চোখ চলে গেলে কী করব?

কার ঠিকানা? অধৈর্য হয়ে হাত নাড়ল মুসা।

চোখের পাতার বড় বড় পাপড়ি নাচাল মুন। নীল চোখে অস্বস্তি। ডিনামাইট!

মানে?

খামের গায়ের ফিরতি ঠিকানাটা ফেয়ারব্যাংকসের নর্থফিল্ড ডিনামাইট কোম্পানির। ডিনামাইট কোম্পানি থেকে বিগসের নামে কেন চিঠি আসে? খটকা লাগে না?

মাথা ঝকাল কিশোর। লাগে।

তথ্যটা কাজে লাগবে তোমাদের?

লাগতে পারে।

খুশি হলো মুন। আমি যাই। ময়দার ভারী বস্তাটা অবলীলায় কাঁধে তুলে নিয়ে স্বচ্ছন্দ গতিতে পাহাড়ী রাস্তা ধরে হেঁটে চলল।

কিশোরের দিকে ফিরল মুসা। ভুরু নাচাল। ডিনামাইট কোম্পানিকে বিগসের কী দরকার?

ডিনামাইট দিয়ে ঘরবাড়ি ওড়ানো যায়, ঠোট কামড়াল কিশোর।

ছাউনি পোড়ানো যায় না?

চিন্তিত ভঙ্গিতে মুসার দিকে তাকাল কিশোর। চলো। বিগসকে পেলে জিজ্ঞেস করব।

শহরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলল দুজনে। গ্লিটার এতই ছোট শহর, কেউ রাস্তায় বেরোলে দেখা হবেই। ঠিকই পেয়ে গেল বিগৃকে। একটা কেবিন থেকে বেরোচ্ছে।

হাই, বয়েজ, ওদের দেখে উল্লসিত গলায় হাঁক ছাড়ল ও। গ্লিটার তোমাদের কেমন লাগছে?

ভালই লাগত, জবাব দিল কিশোর। কিন্তু এত উত্তেজনা, আগুন, বোমাবাজি, ডিনামাইট… আচ্ছা, নর্থফিল্ড ডিনামাইট কোম্পানির নাম শুনেছেন?

রাগ দেখা গেল বিগসের চোখে। সামলে নিয়ে হাসল। শুনেছি, তবে আজই প্রথম। খবরটা এত তাড়াতাড়ি কে দিল তোমাদের? পোস্ট অফিস থেকে কেউ চুরি করে খামের ঠিকানা দেখে গেছে নিশ্চয়?

আপনিই তো বলেছিলেন এখানে কোন কথা গোপন থাকে না, হেসে বলল কিশোর। হঠাৎ করেই আপনার কাছে চিঠি লিখে বসল কোম্পানিটা?

হ্যাঁ। প্রাইস লিস্ট পাঠিয়েছে।

কেমন কাকতালীয় না ঘটনাটা? লুক স্টার্লিঙের ঘরে বোমা ফাটার একেবারে পরদিনই বিস্ফোরক কোম্পানির প্রাইস লিস্ট এসে হাজির।

কাকতালীয়ই, জবাব দিল বিগস। আমি ওদের কাছে প্রাইস লিস্ট চাইনি। ডিনামাইটের কোন প্রয়োজন নেই আমার। লাগলে

তো লুকের কাছ থেকেই নিতে পারতাম।

কুঁচকে গেল মুসার ভুরু। লুক ডিনামাইটও বিক্রি করে?

করে। খনির কাজে লাগে ডিনামাইট। তা ছাড়া গাছের বড় বড় গুঁড়ি উপড়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজনীয় জিনিস, চাহিদা আছে, লুকের দোকানে পাওয়া না যাওয়ার কোন কারণ নেই। চলি। পরে দেখা হবে। পা বাড়িয়েও ফিরে তাকাল বিগস্। তোমাদেরকে একটা উপদেশ দিই, যদিও শুনতে ভাল লাগবে না; সেই পুরানো প্রবাদটা জানো তো, বেশি কৌতূহলে বিড়াল মরে?

চলে গেল বিগ। কিশোরের দিকে তাকাল মুসা। ও কি হুমকি দিয়ে গেল আমাদের?

তাই তো মনে হলো।

ওর কথা বিশ্বাস করেছ?

করা কঠিন, কিশোর বলল। কিন্তু দোষীই যদি হবে, প্রাইস লিস্ট পাঠানোর কথা স্বীকার না করলেও পারত।

চালাকি করেছে। স্বীকার না করলেই বরং বেশি সন্দেহ করতাম ওকে। ও সেটা জানে। কিন্তু আমি ভাবছি শেষ কার কাছে ডিনামাইট বিক্রি করেছেন লুক, জানতে পারলে ভাল হতো।

চলো না গিয়ে জিজ্ঞেস করি।

দোকানের কাছাকাছি এসে লুককে দেখতে পেল মুসা। নদীর ধারে একটা অদ্ভুত মেশিনের সামনে দাঁড়ানো। ওই যে।

তার দিকে এগোল দুজনে।

কয়েক গজ দূরে থাকতে বলল কিশোর, কী করছেন?

আচমকা ডাক শুনে ভীষণ চমকে গেলেন লুক। ফিরে তাকালেন। তোমরা! উফ, হার্ট অ্যাটাক করিয়ে দিয়েছিলে। ছায়ার মত হাঁটো। একটু শব্দ হয় না।

ঝরঝরে পুরানো মেশিনটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা, কী মেশিন? চাঁদ থেকে আনালেন নাকি?

না, বৃহস্পতি গ্রহ থেকে, হাসলেন লুক। সামলে নিয়েছেন। এর নাম ফিশহুইল। গরমকালে নদীর বরফ গলে গেলে স্রোতের মুখে বসিয়ে দেয়া হয়। স্রোতের টানে চাকা ঘোরে। চাকায় লাগানো এই যে তারের থলিগুলো দেখছ, এগুলো ডোবে আর ভাসে। ডুবে যাওয়া থলিগুলো স্যামন মাছে ভর্তি হয়ে ওপরে উঠে আসে, ওপরেরগুলো তখন নীচে চলে যায়। মাছগুলো আপনাআপনি একটা বাক্সে পড়তে থাকে। খালি থলি নীচে নামে, ভরা থলি ওপরে ওঠে। এভাবেই চলতে থাকে মাছ ধরা।

দারুণ মেশিন তো, মুসা বলল। আপনার?

না, জো সারটনের। একটা লোককে এটার কাছে ঘুরঘুর করতে দেখে সন্দেহ হয়েছিল। দেখতে এসেছি, এটাও নষ্ট করে দিল কি না, বেচারার নৌকাটার মত। নৌকাটা নষ্ট করে খুব খারাপ কাজ করেছে।

লোকটাকে চিনতে পেরেছেন?

দ্বিধা করলেন লুক। পিছন থেকে দেখেছি তো, ঠিক চিনতে পারিনি। তবে হাঁটার ভঙ্গি গোল্ড ফেরানির মত। তোমরা কোথায় যাচ্ছিলে?

আপনার কাছেই এসেছি। কথা ছিল।

দোকানে চলো।

কয়েক সেকেণ্ড নীরবে ফিশহুইলটার দিকে তাকিয়ে থেকে ঘুরে দাঁড়াল কিশোর। লুকের সঙ্গে তার দোকানের দিকে এগোল। হাঁটতে হাঁটতে ডিনামাইটের কথা জিজ্ঞেস করল।

নাহ, দুচার দিনের মধ্যে কারও কাছে বিক্রি করিনি, লুক বললেন। শেষ বিক্রি করেছি শীতের শুরুতে। আমার ছাউনিটার কথা ভুলতে পারছ না তোমরা, তাই না? তবে লিখে দিতে পারি, ডিনামাইট দিয়ে পোড়ায়নি। ডিনামাইটের দাম আছে। মাছি মারতে কামান দাগতে যাবে না। আমি শিওর, আগুন লাগার মূলে ওই জেরিক্যানের পেট্রল। দোকানের বারান্দায় উঠে গেলেন তিনি। ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ডিনামাইটের কথা মাথায় এল কেন তোমাদের?

বিগসের কাছে ডিনামাইট কোম্পানি চিঠি দিয়েছে, ফস করে বলে ফেলেই বুঝল মুসা, গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়াটা ভুল হয়ে গেছে।

তাই নাকি? তাহলে তো চিন্তার কথাই… দোকানে ঢুকে গেলেন লুক।

নিজেদের কেবিনে ফিরে চলল দুই গোয়েন্দা। মুসা বলল, আমাদের চোখ এড়িয়ে ফিশহুইলটার কাছে কীভাবে গেল গোল্ড, বুঝতে পারছি না। রাস্তা তো মোটে ওই একটা। এমন নির্জন রাস্তা দিয়ে একজন লোক হেঁটে গেল আর আমাদের চোখে পড়ল না, এত কানা তো এখনও হইনি।

লুক তো বললেনই পিছন থেকে দেখেছেন। গোল্ড কি না শিওর নন তিনি। চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। আচ্ছা, গোল্ডকে বিপদে ফেলার জন্য মিথ্যে কথা বলেননি তো?

তা কেন বলতে যাবেন?

কারণ, তিনি গোল্ডকে দেখতে পারেন না।

তা নাহয় বললেন। কিন্তু ফিশহুইলটার কাছে তো কেউ একজন নিশ্চয় গিয়েছিল। নইলে দেখতে যেতেন না লুক। সেই লোকটা কে?

বিগ নয়, এটা ঠিক। লুকের রহস্যময় লোকটা যখন ফিশহুইলের কাছে, বিগ তখন আমাদের সামনে। আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল।

রাস্তার মোড়ের কাছে আসতে ওপাশ থেকে কুকুরের চিৎকার কানে এল। হুকুম শোনা গেল, হাইক! হাইক!

মোড় ঘুরে ছুটে এল টেড সিউলের কুকুরবাহিনী।

হাইক! হাইক! বলে চেঁচিয়ে কুকুরগুলোকে গতি বাড়ানোর নির্দেশ দিতে থাকল টেড। স্লেজ নিয়ে ছুটে আসছে ঢাল বেয়ে। কিশোর-মুসা সেই পথের ওপরই দাঁড়ানো। ওদের দেখেও দেখল যেন টেড।

দাঁত বেরিয়ে গেছে সামনের নেতা-কুকুরটার। বিকট মুখভঙ্গি। কিশোরের কাছ থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে রয়েছে। থামার কোন লক্ষণই নেই।

স্লেজটা গায়ের ওপর এসে পড়বে।


এক ধাক্কায় কিশোরকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিল মুসা। লাফ দিয়ে নিজেও সরে গেল একপাশে। বেরিয়ে থাকা বরফের টুকরোয় হোঁচট খেল কিশোর। সামলাতে পারল না। বরফে ঢাকা ঢাল বেয়ে গড়ানো শুরু করল। মুসা দাঁড়িয়ে রইল। চেঁচিয়ে বলল, টেড, দাঁড়াও, তোমার সঙ্গে কথা আছে…

জবাবে দস্তানা পরা হাত তুলে ঘুসি দেখাল টেড।

রেগে গেল মুসা। থাবা দিয়ে টেডের বাড়ানো হাতটা ধরে ফেলল। কজিতে মোচড় দিয়ে মারল হ্যাচকা টান। এটা আশা করেনি টেড। রানারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। স্লেজ থেকে উড়ে এসে পড়ল রাস্তার ওপর। সতর্ক হয়ে গেল বুদ্ধিমান কুকুরগুলো। কয়েক গজ এগিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।

ধীরে ধীরে উঠে বসল টেড। মাথার পিছনে ব্যথা পেয়েছে, হাত বোলাচ্ছে সেখানে। বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মুসার দিকে।

কিশোরও উঠে এসেছে।

রাগ যায়নি মুসার। চিৎকার করে উঠল, কী মনে করো তুমি নিজেকে, টেড? আমাদের ওপর কীসের রাগ তোমার? গ্লিটারে যখনই কোন দুর্ঘটনা ঘটছে, তার আশপাশে দেখা যাচ্ছে তোমাকে। টিনুকদের কেবিনে যখন আগুন লেগেছিল, তোমাকে স্লেজ নিয়ে ছুটে পালাতে দেখেছি। বিষ মেশানো আপেল এনে দিয়েছ তুমি ওদেরকে। কাল যখন লুকের ছাউনিতে বোমা ফাটানো হলো, টাউন হলের মিটিঙে ছিলে

তুমি। আমি আরও জানতে চাই, জোসির রেড লাইটের দড়ি কাটল কে?

কথা শেষ হয়েছে তোমার? রুক্ষ কণ্ঠে জবাব দিল টেড। তাহলে শোনো, আমিও জানতে চাই, আমার কেনলে বিষ মাখানো মাংস ফেলেছিল কে। কে আমার লাগামের অর্ধেকটা কেটে রেখেছিল। আমার রানার ওয়্যাক্সে বালি দিয়ে রেখেছিল কে।

মুসা জিজ্ঞেস করল, কে?

উঠে দাঁড়াল টেড। কে আবার? তোমাদের প্রিয় বন্ধু জোসি। একা শয়তানি করে মন ভরেনি। তোমাদেরকে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ডেকে নিয়ে এসেছে সাহায্য করার জন্য। তবে আমি তোমাদেরকে আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেব না। কখনই না!

টেডের কথায় স্তম্ভিত হয়ে গেছে কিশোর ও মুসা দুজনেই। ধোকা দিচ্ছে না তো টেড? নাকি জোসির মত টেডও একই ষড়যন্ত্রের শিকার?

এ সব ঘটনা কবে ঘটেছে? আমরা গ্লিটারে আসার পর? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

টেড বলল, না, আগে। জোসি আমার এত প্রিয় বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও ওর ওপর রাগ কেন আমার বুঝতে পারছ না? কেন ওকে এখন দেখতে পারি না? স্বার্থপর হিংসুক বন্ধু থাকার চেয়ে না থাকা ভাল।

মুসা জিজ্ঞেস করল, জোসিই যে দোষী, কী করে বুঝলে?

ও ছাড়া আর কে? আমার ওপর আর কার এমন আক্রোশ থাকবে?

ও তোমার বন্ধু, টেড।

ছিল। এখন নেই।

কণ্ঠস্বরে যতটা সম্ভব আন্তরিকতা ফুটিয়ে তুলে কিশোর বলল, টেড, জোসি এ সব করছে না। কারণ, কেউ একজন জোসিরও ক্ষতি করতে চাইছে। তোমাদের পুরো শহরটাকেই ধ্বংস করে দিতে চাইছে ওই লোক। জোসি, ওর চাচা-চাচী, চাচাত বোন, সবাই চাইছে রহস্যটার সমাধান করি আমরা। যে এ সব করে বেড়াচ্ছে, ওকে খুঁজে বের করি।

আমরা গুণ্ডাপাণ্ডা নই, টেড, যা তুমি ভাবছ, মুসা বলল। আমরা গোয়েন্দা।

জ্বলে উঠল টেডের চোখ। তাহলে বলো, লোকটা কে? দেখো ওর কী করি!

এখনও জানি না আমরা, জবাব দিল কিশোর। এতদিন তো তোমাকেই সন্দেহ করে এসেছি।

আমি কিছু করিনি। নিজের শহর ধ্বংস করে দেব, এত বোকা আমাকে ভাবলে কী করে?

জোসিও চায় না শহরটা ধ্বংস হয়ে যাক।

চুপ হয়ে গেল টেড। নীরবে দেখতে লাগল কিশোর ও মুসাকে। সন্দেহ যাচ্ছে না ওর। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল। চলে গেল ওর জেটার কাছে, যেখানে অসীম ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করছে কুকুরগুলো।

কিশোর-মুসাও. হাঁটতে শুরু করল আবার। উল্টো দিকে। টিনুকদের কেবিনের কাছে এসে থামল। দরজায় টোকা দিল কিশোর। খুলে দিলেন এরিনা। হাতে একটা ডোরাকাটা স্কার্ফ। তোমরা। আমি মনে করেছি গোল্ড। স্কার্ফটা ফেলে গেছে তো, ভাবলাম ফেরত নিতে এসেছে বুঝি। দাঁড়িয়ে কেন, এসো।

ঘরে ঢুকে পার্কা খুলতে খুলতে মুসা জিজ্ঞেস করল, গোল্ড কখন এসেছিল?

মিনিট পনেরো আগে। এইমাত্র গেল। কেন?

স্টোভের কাছে চেয়ারে বসে আছেন জেফরি। থিম পার্কের পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য আমাকে বোঝাতে এসেছিল গোল্ড। হাসলেন তিনি। টুর গাইডের চাকরির অফারও দিয়ে গেছে আমাকে।

দরজা খুলে গেল আবার। হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল গোল্ড। বাতাসের ঝাপটা লাগল। ওর বুটে লেগে থাকা তুষার গলে গলে

পড়ছে।

গোল্ড বলল, গলার কাছে ঠাণ্ডা লাগতে মনে পড়ল স্কার্ফটা ফেলে গেছি। আরেকটু হলে গলাটাই বরফ হয়ে যাচ্ছিল।

এরিনার হাত থেকে স্কার্ফটা নিয়ে গলায় পেঁচাল গোল্ড। বেরোনোর জন্য ঘুরে দাঁড়াল।

কিশোর জিজ্ঞেস করল, গোল্ড, জো সারটনের ফিশহুইলটার কাছে গিয়েছিলেন কেন?

ঝটকা দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল গোল্ড। কে বলেছে?

লুক। একটু আগে নাকি ওটার কাছে দেখেছেন আপনাকে।

জেফরিকে সাক্ষী মানল গোল্ড। শুনলে! শুনলে মিথুকটার কথা! আমি নাকি নদীর ধারে জো সারটনের ফিশহুইলের কাছে গেছি! কিশোরের দিকে ফিরল ও। কখন দেখেছে বলল?

আধঘণ্টা আগে, মুসা বলল।

লাল হয়ে গেছে গোল্ডের মুখ। আধঘণ্টা আগে যদি নদীর ধারে গিয়ে থাকি, তা হলে এখানে ছিল কে? আমার ভূত?

অবাক মনে হলো জেফরিকে। গোল্ড এখানেই ছিল, আমাদের সাথে। লুক নিশ্চয় ভুল করেছে।

শীতকালে এ ধরনের ভুল হতেই পারে, এরিনা বললেন। কাপড়-চোপড় দিয়ে গা ঢেকে শরীরটাকে পুটলি বানিয়ে রাখে সবাই। দূর থেকে চেনা কঠিন।

তাই হবে! বিড়বিড় করল কিশোর। তারমানে লুক ভুল করেছেন।

সারটনের ফিশহুইলটারও কিছু হয়েছে নাকি? শঙ্কিত মনে হলো গোল্ডকে।

তা তো জানি না। জো গিয়ে ওটা দেখলে বুঝতে পারবে।

ফিশহুইলটাও যদি নষ্ট হয়ে থাকে, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল গোল্ড, কার কাজ, আর সন্দেহ থাকবে না আমার। সোজা গিয়ে ওই চামারটার ঘাড় চেপে ধরব, সব বেরিয়ে যাবে।

কার কথা বলছেন?

কার আবার? ওই অর্থপিশাচ লুক স্টার্লিংটার। টাকার জন্য পারে না ও, এমন কাজ নেই।

গটমট করে বেরিয়ে গেল গোেল্ড। পিছনে দড়াম করে লাগিয়ে দিয়ে গেল দরজার পাল্লা।

প্রথমে কিশোরের দিকে তাকালেন জেফরি। তারপর মুসার দিকে। বললেন, গোল্ডের আচরণে মনে হয় না জানি কী ভয়ঙ্কর লোক। কিন্তু আমি জানি, ওর ওই বদমেজাজ আর রুক্ষতার আড়ালের মনটা খুব নরম। আর মোটেও অসৎ নয়। মাঝে মাঝে ওর কথাবার্তায় আমারও রাগ লাগে। তবে ওকে আমি অবিশ্বাস করি না।

দরজা খুলে গেল আবারও। লাকড়ির বোঝা নিয়ে ঘরে ঢুকল মুন কিশোর-মুসাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, ডিনামাইটের খোঁজ নিয়েছিলে?

অবাক মনে হলো জেফরি ও এরিনাকে। বিগৃসের চিঠির কথা জানানো হলো ওঁদের।

কিশোর বলল, বিগসকে জিজ্ঞেস করেছি। ডিনামাইট কোম্পানির চিঠির কথা স্বীকার করেছে ও।

ডিনামাইট দিয়ে ও কী করবে? কপাল ডলতে লাগলেন জেফরি। কী যে সব কাণ্ড শুরু হলো গ্লিটারে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কাকে সন্দেহ করব, তা-ও বুঝতে পারছি না। কিশোর, কিছু একটা করো তোমরা জলদি! শহরটাকে বাঁচাও!

পরদিন সকাল সকাল কেবিন থেকে বেরোল কিশোর ও মুসা। শহরের প্রান্তে একটা পাহাড়ের গোড়ায় জেফরি ও এরিনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাত নাড়ল কিশোর। জেফরিও হাত নাড়লেন।

এগিয়ে গেল দুজনে। পাহাড়ের গোড়ার এক টুকরো খোলা জায়গা লোহার রেলিঙ দিয়ে ঘেরা। তুষার ভেদ করে মাথা তুলে রেখেছে। অসংখ্য কবরফলক। শহরের গোরস্থান এটা, বুঝতে পারল ওরা।

কেউ মারা গেল নাকি?

জিজ্ঞেস করে জানা গেল, মারা যায়নি, তবে আজ পটল্যাচের দিন। পটল্যাচ হলো আলাস্কার আদিবাসীদের একটা বিশেষ উৎসব। সকালে কবরস্থানে ফুল দিতে আসে মৃতের আত্মীয়রা। বিকাল থেকে শুরু হয় উৎসব-অনুষ্ঠান।

ব্ৰিণ্ডল জ্যাককে দেখা গেল ওখানে। জেফরিকে দেখেই বেরিয়ে গেল গোরস্থান থেকে। কিশোরের মনে পড়ল, সন্দেহভাজনদের সে-ও একজন। অথচ বেমালুম ভুলে গিয়েছিল ওর কথা, আশ্চর্য!

জোসিকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে জ্যাকের কথা জিজ্ঞেস করল কিশোর।

শহরেই ছিল না ও, জোসি বলল। মিঙ্ক রিভারের ওপারের জঙ্গলে ফাদ পেতে জানোয়ার ধরতে চলে গিয়েছিল। গ্লিটার থেকে বহুদূরে। ওই জায়গা নিয়ে চাচার সঙ্গে ঝগড়া নেই ওর। আজ এসেছে পটল্যাচে যোগ দিতে। পটল্যাচ না থাকলে আসত না।

মুসা বলল, তারমানে জ্যাকও সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ। কমতে কমতে তো শেষ! কাকে সন্দেহ করব এরপর?

সে-কথাই তো ভাবছি, চিন্তিত ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। সন্দেহভাজনই যদি কেউ না থাকে, সন্দেহ করব কাকে?

সেদিন বিকেলে শহরবাসীদের সঙ্গে অ্যাসেম্বলি হলে গিয়ে পটল্যাচে অংশ নিল দুই গোয়েন্দা। স্থানীয় ভাষায় গান গাইছে কয়েকজন অ্যাথাবাস্কান। একঘেয়ে ভঙ্গিতে হাত ওঠাচ্ছে আর নামাচ্ছে। কিছু লোক গানের তালে তালে নেচে চলেছে।

এক সময় শেষ হলো নাচ। শহরের সবচেয়ে প্রবীণ মানুষটি শহরবাসীদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিলেন। দিনটার বিশেষত্ব নিয়ে আলোচনা করলেন। তারপর নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা দুজন অ্যাথাবাস্কান মহিলা এগিয়ে এল। একজনের হাতে একটা বড় কড়াই, আরেকজনের হাতে ছোট ছোট অনেকগুলো বাটি ও একটা হাতা। ঘরের প্রতিটি মানুষের কাছে যেতে লাগল ওরা। বাটিতে করে ধূমায়িত ঘন ঝোল খেতে দিল।

কী খাচ্ছে? নিচুস্বরে জোসিকে জিজ্ঞেস করল মুসা।

মুচকি হাসল জোসি। সুপ। সবাইকেই খেতে হবে। এটাই নিয়ম।

কীসের সুপ? ভালুকের মাংস?

আরে নাহ্। দুর্ভিক্ষ না লাগলে ভালুক কে খায়, জোসির হাসিটা চওড়া হলো। মুজের মাথা।

আস্ত মাথা হাঁড়িতে ফেলে সিদ্ধ করেছে?

হ্যাঁ, করেছে। চোখ, কান, দাঁত কিছুই ফেলেনি।

চামড়া?

সিদ্ধ হওয়ার পরে ফেলেছে।

এই সুপ খেতে হবে ভেবে নিজের অজান্তেই মুখটা বিকৃত হয়ে গেল কিশোরের। এমন জানলে অনুষ্ঠানেই আসত না।

ওর মুখের অবস্থা দেখে হাসল জোসি। অত মুখ বাঁকাচ্ছ কেন? খেতে খারাপ লাগে না।

প্রথমে মুসার কাছে এসে দাঁড়াল দুই মহিলা। বাটিতে করে ঝোল খেতে দিল। ঢোক গিলল ও। ঠোটে লাগিয়ে চুমুক দিল। ওর দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাল কিশোর। নীরবে জানতে চাইল, কেমন।

ভাল বলতে পারব না, তবে যতটা খারাপ ভেবেছিলাম ততটা লাগল না, মুসা জবাব দিল। আর অতিরিক্ত লবণ।

বাটি হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল কিশোর। কোন ফাঁকে ফেলে দেবে সেই সুযোগ খুঁজছে। পারল না।

কোনমতে ঘন তরল পদার্থটা গিলে নিয়ে বাটিটা ফিরিয়ে দিল মুসা। ঘরের চারপাশে তাকাল। সবাই সুপ খেতে ব্যস্ত। চোখ আটকে গেল দরজার দিকে। কিশোর, ফিসফিস করে বলল ও, লুককে বেরিয়ে যেতে দেখলাম। চোখে চোরা চাহনি। দেখব নাকি কোথায় যান?

চলো।

জোসির দিকে তাকাল কিশোর। জোসি, আমরা বাইরে যাচ্ছি। কাজ আছে। বলে জোসি কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজের হাতের বাটিটা ওর হাতে ধরিয়ে দিল।

খেলে না? সুপটা কি এতই খারাপ? নাকি বাথরুমে যাচ্ছ? হেসে জিজ্ঞেস করল জোসি।

কিশোর হাসল, না, বাথরুমে যাচ্ছি না। পরে বলব। মুসার হাত ধরে টান দিল। এসো।

লুককে অনুসরণ করে শহরের পশ্চিম প্রান্তে চলে এল দুজনে। তাকে একটা কেবিনে ঢুকতে দেখল।

কেবিনটায় কেউ আছে বলে মনে হলো না। নিশ্চয় পটল্যাচ অনুষ্ঠানে চলে গেছে। চারপাশে তাকাল কিশোর। একটা উঁচু টিলা চোখে পড়ল। ওখানে উঠে বসলে কেবিনের ভিতরটা দেখতে পারব। চলো।

টিলাটাকে ছোটখাট একটা পাহাড় বলা চলে। প্রচুর গাছপালা জন্মে আছে। ওগুলোর ভিতর দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল দুজনে। চূড়ায় উঠে আবার কেবিনটা চোখে পড়ল। লুককে দেখা যাচ্ছে জানালা দিয়ে।

কী করছেন লুক? বিড়বিড় করল কিশোর।

চোখের পাতা সরু করে তাকাল মুসা। কেবিনের পিছনের ঘরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন লুক। চারপাশে তাকাচ্ছেন। হঠাৎ হাত বাড়িয়ে টান দিয়ে হুক থেকে দুটো স্লে–পেড়ে বা বগলের নীচে চেপে ধরলেন। পার্কা থেকে কী যেন বের করে ছুঁড়ে দিলেন মেঝেতে।

জুতো চুরি করছেন! বলল অবাক কিশোর। কী কাণ্ড!

মেঝেতে কী ফেললেন? মুসার প্রশ্ন।

ভালমত দেখার জন্য আরেকটু এগোতে গেল কিশোর। উত্তেজনায় খেয়ালই রইল না, খাড়া দেয়ালের কিনারে রয়েছে ও। হাত ফসকাল। ডিগবাজি খেয়ে উল্টে পড়ে গেল।


কিশোরের চিৎকারে ফিরে তাকাল মুসা। বরফে ঢাকা ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে দেখল কিশোরকে। থাবা দিয়ে ধরে ফেলল ওর বাঁ পায়ের গোড়ালি। কিশোরের ওজন ওকেও নীচে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে। বুটের ডগা তুষারে গেঁথে ফেলে নিজের পতন ঠেকানোর চেষ্টা করল। পারল না। পড়ে যেতে শুরু করল সে-ও কিশোরের সঙ্গে।

তিরিশ ফুট নীচের পাথরে পড়লে কী ঘটবে আর ভাবতে চাইল না। মরিয়া হয়ে পা দিয়ে কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চাইছে। পা ঠেকল একটা সিডারের চারায়। ছোট্ট ওই গাছটাকেই পা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরল। ভারের চোটে বাঁকা হয়ে গেল গাছ। তবু শিকড় উপড়াল না।

ঝুলে থাকো, মুসা বলল। একটুও নড়বে না। আমি তোমাকে টেনে তুলছি।

ডান হাতে কিশোরের গোড়ালি ধরে আছে ও। গাছের চারায় পা আটকে নিয়ে বাঁ হাতটাও বাড়িয়ে দিল। দুই হাতে এখন কিশোরের গোড়ালি ধরল। এক হাতের ওপর চাপ কিছুটা কমল। পেটের পেশীকে ব্যবহার করে ইঞ্চি ইঞ্চি করে পিছাতে শুরু করল ও। সঙ্গে কিশোরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ডান পা উঁচু করল কিশোর এক হাতে বা পাটা ধরে রেখে অন্য হাতে কিশোরের ডান পাটাও ধরল মুসা। ধীরে ধীরে টেনে তুলে আনতে লাগল কিশোরকে। বরফে ঢাকা দেয়ালের কিনারে আঙুল বাধানোর অবিরাম চেষ্টা চালাচ্ছে কিশোর। সুবিধে করতে পারছে না।

অবশেষে বহু কসরত করে ওকে আগের জায়গায় নিয়ে এল মুসা। বরফের ওপর চিত হয়ে শুয়ে পড়ল দুজনে। ভয়ানক পরিশ্রমে হাঁপাচ্ছে।

গেছিলাম আজ! হাঁপাচ্ছে কিশোর।

হ্যাঁ, মুসাও হাঁপাচ্ছে। লুক মেঝেতে কী ফেলেছেন?

জানি না। তোমার কোন অসুবিধে হচ্ছে না তো?

না। উঠে দাঁড়াল মুসা। চলো, কাছে গিয়ে দেখি।

সাবধানে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল দুজনে।

চলে গেছেন লুক। কেবিনে ঢুকল ওরা। মেঝেতে একটা হাতুড়ি পড়ে থাকতে দেখে তুলে নিল কিশোর। হাতলে খোদাই করা দুটো ইংরেজি অক্ষর: টি এফ।

টি এফ, আনমনে বলল ও। টেক্স ফেরানির নামের আদ্যাক্ষর।

নিজে জুতো চুরি করে ঘরে গোল্ডের হাতুড়িটা ফেলে গেছেন লুক, যাতে দোষটা গোল্ডের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে, কিশোর বলল। কেবিনটা কার জানতে পারলে ভাল হতো।

নিশ্চয় এমন কেউ, যে থিম পার্কের বিপক্ষে।

হ্যাঁ!

তারমানে লুকই অপরাধী! বিশ্বাস হতে চাইছে না মুসার। এখন বুঝলাম, ফিশহুইলের কাছে কেন গিয়েছিলেন তিনি। আমরা সময়মত চলে গিয়েছিলাম বলে রক্ষে, নইলে ওটাও যেত। নষ্ট করে দিতেন। সর্বনাশ হয়ে যেত জো বেচারার। এখন বোেঝা গেল, নৌকার তলাও লুকই ফুটো করেছেন। রাত দুপুরে নিজের বাড়িতে ইলেকট্রিক করাত চালিয়ে রেখে গিয়েছিলেন, যাতে ওই শব্দে গজালের ওপর হাতুড়ি পিটানোর শব্দ চাপা পড়ে যায়। কেবিনে থেকে মহিলা তাই শুধু করাতের শব্দই শুনেছিল।

কিন্তু তাঁকে ধরার মত কোনও প্রমাণ নেই আমাদের কাছে, নীচের ঠোট কামড়াল কিশোর। জুতো চুরি করতে দেখলেও হাতেনাতে ধরতে না পারলে তার মত প্রভাবশালী টাকাওয়ালা একজন মানুষকে জেলে পাঠানো কঠিন। শুধু আমাদের মুখের কথায় হবে না।

কী করা যায় বলো তো?

চিবুকে টোকা দিল কিশোর। একটা বুদ্ধি আসতে আরম্ভ করেছে মাথায়। দেখি, আরেকটু ভাবি।

অ্যাসেম্বলি হলে ফিরে এল ওরা। পটল্যাচ শেষ। লোকজন চলে যেতে শুরু করেছে। ইলকিস বিগ আছে এখনও। ওকে একপাশে ডেকে নিয়ে এল কিশোর। নিচুস্বরে বলল, আপনার সঙ্গে কথা আছে। এখানে বলা যাবে না।

দীর্ঘ একটা মুহূর্ত কিশোরের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা ঝাঁকাল বিগস। ঠিক আছে, আমার কেবিনে চলো।

কেবিনে ঢুকে কিশোর বলল, আপনি জানেন, গ্লিটারে গত কয়েক দিন ঘরে যে সব দুর্ঘটনা ঘটছে, তার জন্য আপনাকে আর আপনার কোম্পানিকে দায়ী করছে লোকে?

অন্যায় করছে, বিগ বলল। আমি কিছু করিনি। আমার কোম্পানি কিছুই জানে না।

আপনার কোম্পানির কোন দুর্নাম নেই, খবর নিয়েছি আমরা। তবে টাকার টানাটানিতে আছে। যা-ই হোক, আমরা আপনাকে দোষী ভাবছি না। গ্লিটারবাসীর কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার একটা সুযোগ আপনাকে দিতে পারি। তাতে আপনার লাভই হবে। অপরাধীকে ধরতে আমাদের সাহায্য করুন।

কিন্তু তোমরা তো ছেলেমানুষ…

বয়েস কম বলতে পারেন। তাতে কী? আরও অনেক কম বয়েস থেকেই গোয়েন্দার কাজ করছি আমরা, শখের গোয়েন্দা। অনেক জটিল কেসের সমাধান করেছি। পুলিশকে অপরাধী ধরতে সাহায্য করেছি। বিশ্বাস না হলে জোসিকে জিজ্ঞেস করুন। সে সব জানে।

জোসি ভাল ছেলে, চিন্তিত ভঙ্গিতে ঠোট কামড়াল বিস্। পরিবারটাও খুব ভাল, যদিও আমাদের থিম পার্কের বিপক্ষে। তবে বিরোধিতা করলেই মানুষ খারাপ হয় না। যাই হোক, আমিও এ সব দুর্ঘটনা বন্ধ করতে চাই। বদনাম হয়ে গেলে আমার ক্যারিয়ার শেষ।

মুসার দিকে তাকাল কিশোর। স্বস্তি বোধ করছে। অপরাধীকে ধরতে বিগস্ সাহায্য করতে রাজি না হলে ওকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে পারত না। লুক আর বিগস যুক্তি করে দুর্ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে, এই ভাবনাটা জোরাল হতো।

চলুন এখন, অপরাধীকে ধরতে যাই, মুসা বলল।

হাঁ হয়ে গেল বিগস্। কে অপরাধী, জানো নাকি?

মাথা ঝাঁকাল মুসা। লুক স্টার্লিং।

কী বলছ? চেঁচিয়ে উঠল বিগস্।

বিশ্বাস করলেন না তো?

না, করেছি। ওর যা টাকার লোভ, ওকে দিয়ে সব সম্ভব এখানকার হস্তশিল্পের বাজারটাকে ও কোণঠাসা করে ফেলেছে। মানুষকে বাকিতে জিনিস দেয়, কেউ কিছু চাইলে কখনও না করে না, যে যা চায় দিয়ে দেয়। ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে। তারপর সুযোগ বুঝে চাপে ফেলে ঋণ শোধ করার নামে খুব কম দামে ওদের ঠকিয়ে দামি দামি জিনিসগুলো আদায় করে নেয়। এভাবে প্রচুর জিনিস জমিয়েছে। সেগুলো যে কোন মিউজিয়ামের কাছে চড়া দামে বেচতে পারবে।

কিন্তু বিক্রি করবেন না, কিশোর বলল। তার উদ্দেশ্য এখন আমার কাছে পরিষ্কার। মানুষকে হ্যাঁ ভোটে বাধ্য করার জন্য রাজ্যের শয়তানি করে বেড়াচ্ছেন তিনি। জো সারটনের মত দিন-আনা দিন-খাওয়া মানুষগুলোর সহায়-সম্বল ধ্বংস করে দিয়ে ওদের অসহায় করে ফেলতে চাইছেন, যাতে টাকার অভাবে থিম পার্কের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য হয় ওরা। গ্লিটারে থিম পার্ক হলে সবচেয়ে বেশি লাভ তার। টুরিস্টদের কাছে জিনিস বিক্রি করবেন। যত ইচ্ছে দাম নেবেন। গ্লিটারে আর কোন দোকান নেই, ভবিষ্যতেও বসতে দেবেন না–একচেটিয়া ব্যবসা করবেন। স্থানীয়দের কাছ থেকে ঠকিয়ে নেয়া অ্যান্টিক দেখিয়ে টুরিস্টদের আকৃষ্ট করবেন। ওসব জিনিসের নকল তৈরি করে সুভনিয়ার হিসেবে চড়া দামে বিক্রি করবেন। হস্তশিল্পের ব্যবসাটাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলবেন এখানে, তবে শুধুই নিজের জন্য। কী সাংঘাতিক প্ল্যান!

একটু থেমে দম নিয়ে আবার লল কিশোর, বিগ, শুনুন, আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। আপনার প্যাডের কাগজে লুককে একটা চিঠি লিখুন। তাকে বলুন, তাঁর কাজ আপনার পছন্দ হয়েছে। আপনি এবং আপনার কোম্পানি সেটা প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখছেন। তাকে নানারকম সুযোগ দিতে চান। এ নিয়ে আলোচনার জন্য তাঁর সঙ্গে মিটিঙে বসতে চান।

মাথা নেড়ে বিগস বলল, উঁহু, আমি তা করতে পারব না। ওই চিঠি অন্য কারও হাতে পড়লে ভীষণ বিপদে পড়ব। আমার চিঠি প্রমাণ করে দেবে, আমিও লুকের সহযোগী। না, আমি পারব না।

বিপদে পড়বেন কেন? মুসা বলল। চিঠির কোথাও তো দুর্ঘটনার কথা লেখা থাকছে না। শুধু লিখবেন ওর কাজ আপনার পছন্দ হয়েছে। কাজ তো কত রকমেরই হতে পারে।

আর কেউ না বুঝলেও লুক ঠিকই বুঝবে কোন কাজের কথা আপনি বলেছেন, কিশোর বলল।

মস্ত ঝুঁকি নেয়া হয়ে যাবে, দ্বিধা যাচ্ছে না বিগসের।

দেখুন, আজ হোক কাল হোক লুককে আমরা ধরবই, দৃঢ় কণ্ঠে বলল কিশোর। ওকে ধরতে সাহায্য করে গ্লিটারবাসীর কাছে ভাল হওয়ার এই সুযোগটা আপনি ছাড়বেন কেন? বলা যায় না, কাজটা করলে আপনার পক্ষে ভোটও বেড়ে যেতে পারে।

ভ্রূকুটি করল বিগস্। কথাটা মন্দ বলনি। বেশ, আমি তোমাদের সাহায্য করব। তবে এই চিঠি লেখার ব্যাপারটা আমার একটুও ভাল লাগছে না। লুক কী করবে, কিছু জানি না। আমাদের ফাঁদে যদি সে পা না দেয়?

ভোটে জেতার জন্য কিছুটা ঝুঁকি তো নিতেই হবে আপনাকে।

আর আপত্তি করল না বিগস্। প্যাড বের করে লিখতে তৈরি হলো। কোথায় দেখা করতে বলব?

বিগৃসের কেবিনটা ভাল করে দেখল কিশোর। ছোট ঘর। একটা অংশকে অফিস বানিয়েছে বিগস্। ছোট একটা রান্নাঘরও আছে এক কোণে। জানালাগুলো ছোট ছোট, ভারী কাঁচ লাগানো, যাতে ঠাণ্ডা ঢুকতে না পারে। ওপরে একটা চিলেকোঠা আছে। ওটা দেখিয়ে বিগকে জিজ্ঞেস করল, ওখানে জায়গা আছে?

থাকতে পারে, জবাব দিল বিগস্। দেখিনি।

ওপরে ওঠার সরু একটা মই আছে। বেয়ে ওপরে উঠে গেল কিশোর ও মুসা। পুরানো কিছু বাক্স আর পিপা রাখা। ওগুলো সরালে কিছুটা জায়গা বেরোবে।

ওখান থেকেই বিগসকে বলল কিশোর, ওকে জানিয়ে দিন, দেড় ঘণ্টার মধ্যে ওর সঙ্গে এখানে দেখা করতে চান আপনি। আশা করি, ততক্ষণে তৈরি হয়ে যেতে পারব আমরা।

ঘণ্টাখানেক পর। চিলেকোঠার সঙ্কীর্ণ জায়গায় ঠাসাঠাসি করে বসেছে কিশোর, মুসা, টেড, জোসি ও জেফরি। উত্তেজিত চারটে মুখের দিকে একে একে তাকাল কিশোর। সাক্ষী হওয়ার জন্য জেফরি, জোসি আর টেডকে ডেকে নিয়ে এসেছে। এখনও নিজেদের মধ্যে আচরণে সহজ হতে পারেনি জোসি ও টেড। তবে মনে মনে দুজনেই খুশি। পুরানো বন্ধুত্বটা জোড়া লাগতে যাচ্ছে আবার।

বিগস নীচে অপেক্ষা করছে। ওর কাশি শোনা গেল। কাগজপত্র ঘাটাঘাটির খসখস শব্দ। নিশ্চিন্ত হলো কিশোর। এত মৃদু শব্দও যখন কানে এসে পৌছাচ্ছে, লুক আর বিগসের সমস্ত কথাবার্তা চিলেকোঠা থেকে শোনা যাবে।

অবশ্য যদি আসে লুক!

চুপচাপ বসে অপেক্ষা করতে লাগল ওরা। বার বার ঘড়ি দেখছে কিশোর। বিগসের চিঠি লুকের মত ধড়িবাজ লোককে টেনে আনতে পারবে কি না নিশ্চিত হতে পারছে না। ঘুণাক্ষরেও যদি সন্দেহ করে বসেন ফাঁদ পাতা হয়েছে, তাহলে কেবিনের ত্রিসীমানা মাড়াবেন না। বরং বিগকে ফাঁসিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন। সোজা চিঠিটা নিয়ে হাজির হবেন আদালতে।

গড়িয়ে কাটছে সময়। ভাবনার ঝড় বইছে কিশোরের মাথায়। লুক চিঠি পাওয়ার পর গোপনে এসে আড়াল থেকে চোখ রাখেননি তো কেবিনের ওপর? কিশোর-মুসা আর অন্যদেরকে দল বেঁধে বিগসের কেবিনে ঢুকতে দেখলেই বুঝে যাবেন, তাঁকে ফাঁদে ফেলার জন্য ওই চিঠি লেখা হয়েছে। তুষারে পাঁচ জোড়া জুতোর ছাপ পড়েছিল। সেগুলো মুছে ফেলা হয়েছে জেফরির নির্দেশে। সতর্ক লোক। সতর্ক না হলে এই বুনো অঞ্চলে টিকতে পারতেন না। তাড়াহুড়ো করে জুতোর ছাপগুলো মোছা হয়েছে। হয়তো কিছু চিহ্ন রয়েই গেছে। চোখে পড়ে যাবে না তো লুকের?

একই কথা মুসাও ভাবছে। ভাবতে ভাবতে মাথা গরম হয়ে যাবার জোগাড়। সময় কাটাতে বিড়বিড় করে কবিতা আবৃত্তি শুরু করল। কাঁধে হাত পড়তে চমকে গেল ও। ঠোটে আঙুল রেখে ওকে শব্দ না করতে ইশারা করছে টেড।

অপেক্ষা করছে ওরা। লুক আর আসেন না। সবাই যখন ভাবতে আরম্ভ করেছে, লুক আসবেন না, অত সাধারণ একটা চিঠির ফাঁদে ধরা দেবেন না তাঁর মত চতুর লোক, ঠিক তখনই দরজায় শোনা গেল টোকার শব্দ। মুহূর্তে বরফের মত জমে গেল যেন চিলেকোঠার সবাই।

নীচে কাঠের মেঝেতে জুতোর শব্দ।

দরজার দিকে এগোচ্ছে বিগস্।

দরজা খোলার শব্দ হলো।

এসেছেন। আন্তরিক কণ্ঠে বিগ ডাকল, আসুন। রাইফেল এনেছেন কেন? শিকারে বেরোবেন নাকি?

সঙ্গীদের দিকে তাকাল মুসা। গম্ভীর হয়ে আছে সবাই। লুক রাইফেল নিয়ে আসবেন ভাবেনি।

গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন লুক, ঝুঁকি নিতে চাইনি।

বিগস বলল, আমার কোম্পানির জন্য ক্ষতির কারণ হয় এমন কোন ঝুঁকি আমিও নিতে চাই না। তবে মনে হচ্ছে একসঙ্গে কাজ আমরা করতে পারব। দাঁড়িয়ে কেন, বসুন না।

বিগস ও লুকের কথাবার্তা টেপ করার জন্য পকেট থেকে একটা মাইক্রো ক্যাসেট রেকর্ডার বের করল কিশোর। অন সুইচ টিপল। খুব সামান্য শব্দ হলো। অতি মৃদু। কিন্তু লুকের কান এড়াল না।

কীসের শব্দ? চাবুকের মত শপাং করে উঠল যেন তাঁর কণ্ঠ।

রাইফেলের বোল্ট টানার শব্দটা যেন বোমা ফাটাল শ্রোতাদের কানে।


ধড়াস করে উঠল কিশোরের বুক। স্থির হয়ে গেল ও। লুক এখন চিলেকোঠায় উঁকি দিলেই সর্বনাশ। ওদের পরিকল্পনা বরবাদ। তা ছাড়া একজন খেপা লোকের মুখোমুখি হতে হবে, যার হাতে আছে গুলিভর্তি রাইফেল। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল কিশোর। লুককে ওপরে উঠতে দেয়া যাবে না। মইয়ের ধাপে পা রাখা মাত্র তাঁকে ফেলে দিতে হবে। গুলি করার আগেই তাকে কাবু করে ফেলতে হবে।

কী করছেন? তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল বিগসের কণ্ঠ। নামান ওটা। নামিয়ে রাখুন। রাইফেল-বন্দুক দেখলে আমার ভয় লাগে।

কিন্তু শব্দ যে শুনেছি তাতে কোন সন্দেহ নেই, লুক বলল। ওপর থেকে এসেছে।

শুনতেই পারেন, বিগস বলল। কেবিন ভর্তি হঁদুর। ইদুরের জ্বালায় মরলাম। ভাবছি, বাড়িওলাকে বলব। ইঁদুর না তাড়ালে ভাড়া দেব না।

রাইফেলের সেফটি ক্যাচ অন করার শব্দ শোনা গেল। মেঝেতে বাটের শব্দ শুনে বোঝা গেল চেয়ারের কিনারে রাইফেলটা ঠেস দিয়ে রেখেছেন। চেপে রাখা দমটা আস্তে আস্তে ছাড়ল কিশোর। নীরবে চলছে টেপরেকর্ডার। যন্ত্রটা পাটাতনে নামিয়ে রাখল ও। অসময়ে টেপটা শেষ না হলেই হয়।

কী করতে চান? লুক জিজ্ঞেস করলেন। চিঠিতে কোন কিছুই স্পষ্ট করে লেখেননি।

ভূমিকার কোন প্রয়োজন দেখছি না, বিগৃস্ বলল। সোজাসাপ্টা কথাই আমার পছন্দ। আপনি কী করে বেড়াচ্ছেন, সব আমি বুঝে ফেলেছি। আমার সুবিধে করে দিয়েছেন। লোকে হা-ভোট দিতে বাধ্য হবে। সেজন্যই ভাবলাম আপনাকে দলে নেয়া যায় কি না আলোচনা করে দেখি।

শুনে খুশি হলাম, কণ্ঠস্বরে কোন পরিবর্তন নেই লুকের।

আশঙ্কা মাথা চাড়া দিচ্ছে কিশোরের মনে। লুককে সন্দেহ করে ভুল করল না তো? হয়তো তিনি অপরাধী নন।

থিম পার্কের পক্ষ থেকে আপনাকে নতুন কোনও কাজ দেয়া যায় কি না ভাবছি। যা আপনি ইতিমধ্যেই করে ফেলেছেন তার জন্য অবশ্যই খরচাপাতি আর মোটা অঙ্কের বোনাস পাবেন।

কবে?

বোনাস পাবেন আমরা ভোটে জেতার পর, বিগ বলল। তবে খরচাপাতির টাকা এখনই দিয়ে দিতে পারি।

আমি রাজি, জবাব দিতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করলেন না লুক।

আশঙ্কা দূর হলো কিশোরের। মুসার দিকে তাকাল। হাসি দেখতে পেল। টোপ গিলেছে অতি ধূর্ত রাঘব বোয়াল। বিগস্ এখন ওটাকে খেলিয়ে তীরে তুলতে পারলেই হয়।

আপনি তো রাজি হলেন, বিগ বলছে, কিন্তু আপনিই দুর্ঘটনাগুলো ঘটিয়েছেন, এ ব্যাপারে আমি শিওর হব কীভাবে?

তাহলে আমাকে ডাকলেন কেন?

কানদিন একজ। পুরানো গুড়ে, সেজন্য

ডেকে নিশ্চয় ভুল করিনি? অনেক ভেবেছি। দুর্ঘটনাগুলোর পিছনে আর কারও হাত আছে বলে মনে হয়নি।

নেইই তো। আমিই করেছি সব! একা।

শুধু একটা কথা বুঝতে পারছি না, নিজের ঘরে আগুন দিলেন কেন?

হাসি শোনা গেল লুকের। এই সহজ কথাটা বুঝলেন না? লোকের সন্দেহ যাতে আমার ওপর না পড়ে, সেজন্য। সবাই ভাববে, আমি নই, অন্য কারও কাজ। পুরানো ওই ছাউনিটা এমনিতেই ভেঙে পড়ত যে কোনদিন। একটা ভাল কাজে লাগালাম।

আর জেফরি টিনুকের কেবিন? ওটাতে আগুন লাগালেন কীভাবে?

কিশোর দেখল, কঠিন হয়ে গেছে জেফরির চেহারা। হাত মুঠোবদ্ধ। ইশারায় তাঁকে শান্ত থাকতে অনুরোধ করল ও।

এটা কোন কাজ হলো? পিছনের জানালা দিয়ে স্টোভের কাছে একটা পেট্রলের ক্যান ফেলে, একটা জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি ছুঁড়ে দিলাম, ব্যস, লুক বলল। জোসির বাবার কেবিনে লাকড়ি ছুঁড়লাম ওদের ভয় দেখানোর জন্য। ওই জেফরিটা থিম পার্কের বিপক্ষে বহুত গলাবাজি করে। লোকে মানেও ওকে। ভাবলাম, ওকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখতে পারলে সুবিধে।

মুজের মাংসটাও আপনিই চুরি করেছিলেন? বিগ জানতে চাইল।

তো আর কে? গর্ব করে বললেন লুক। জো সারটনের নৌকাটাও আমিই নষ্ট করেছি, বুঝতেই পারছেন। রাতের বেলা ইলেকট্রিক করাত চালু করে রেখে হাতুড়ি আর গজাল নিয়ে চলে গেলাম। তারপর নৌকার তলায় গজাল বসিয়ে ধ্যাচাং-ধ্যাচাং! ব্যস, গেল বাতিল হয়ে নৌকাটা।

বিগ বলল, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, টেডের কুকুরগুলোর পিছনে লাগলেন কেন আপনি? ওর বাবা তো আমাদের বিপক্ষে নয়।

অট্টহাসি হাসলেন লুক। মুসার মনে হলো, উন্মাদের হাসি। গায়ে কাঁটা দিল ওর।

ওটাই তো আসল চালাকি, লুক বলছেন। জোসির ক্ষতি করে ওর চাচার মনোবল ভাঙতে চেয়েছি। কুকুরের দড়ি কেটেছি টেডের ওপর জোসির সন্দেহ বাড়ানোর জন্য। টেডকে ওর ওপর খেপিয়ে তুলেছিলাম আরও আগেই। কুকুরের ঘরে বিষ মাখানো মাংস ফেলে রেখে, স্লেজের লাগাম কেটে দিয়ে, রানার ওয়্যাক্সে বালি ফেলে। পরম বন্ধুকে চরম শত্রু বানিয়ে দিয়েছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম, আমি অঘটন ঘটানো শুরু করলে লোকের সন্দেহ ওদের ওপর গিয়ে পড়বে। ঘোলাজলে মাছ শিকার করতে সুবিধে হবে আমার। কেউ আমাকে সন্দেহ করবে না।

আর সহ্য করতে পারল না টেড। কিশোর বা মুসা বাধা দেয়ার আগেই লাফ দিয়ে নীচে পড়ল। চিৎকার করে উঠল, শয়তান! ছুঁচো! আমার কুকুরকে বিষ খাইয়ে মেরেছিস! আজ আমি তোকে খুনই করে ফেলব!

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আর চুপ করে থেকে লাভ নেই। নীচে উঁকি দিল কিশোর। টেডের দিকে রাইফেল তাক করেছেন লুক। খবরদার! ঝাঝরা করে ফেলব বলে দিলাম! আর বিগস, তুমি আমার জন্য ফাঁদ পেতেছিলে! তোমাকেও ছাড়ব না

আমি!

রক্ত সরে গেল বিগসের মুখ থেকে। দেয়ালের দিকে পিছিয়ে গেল। আমাকে মেরে আপনিও বাঁচতে পারবেন না।

পারব। খুব পারব। একবার টেডের দিকে, একবার বিগৃসের দিকে নলের মুখ সরাচ্ছেন লুক। গুলি করে মারব আমি তোমাদের। তারপর এমন করে সাজাব, মনে হবে একে অন্যকে খুন করেছ তোমরা। সবাই তখন জানবে, টেডের কুকুরকে বিষ দিয়েছিলে তুমি, রাগে পাগল হয়ে গিয়ে প্রতিশোধ নিতে ছুটে এসেছিল ও।

লুকের কথা শুনে চোখ বড় হয়ে গেল কিশোরের। লোকটা আসলেই উন্মাদ। লুক এখনও ভাবছেন ঘরে বিগস্ ও টেড ছাড়া আর কেউ নেই। মুসা, জেফরি ও জোসির দিকে তাকাল কিশোর। ইশারা করল।

এখন বলল, মজা পাচ্ছেন যেন লুক, কে আগে মরতে চাও? বিগস, তোমারই আগে মরা উচিত। আমার সঙ্গে বেইমানি করার শাস্তি। বিগসের দিকে নিশানা করলেন তিনি।

চিলেকোঠার কিনার থেকে ঝাঁপ দিল কিশোর। মার্শাল আর্ট এক্সপার্টদের মত ইয়া-হু! বলে তীক্ষ্ণ চিৎকার দিয়ে মুসাও লাফিয়ে পড়ল নীচে।

চমকে গেলেন লুক। রাইফেলের নলের মুখ ঘুরে যেতে শুরু করল কিশোর-মুসার দিকে।

বাঘের মত লুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মুসা। মেঝেতে ফেলে দিল লোকটাকে।

গুলি ফোটার প্রচণ্ড শব্দ। মুসার কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল বুলেট। সময় নষ্ট করল না ও। লুকের কলার ধরে টেনে তুলে দশ মনি একটা ঘুসি বসিয়ে দিল চোয়ালে। আবার মেঝেতে পড়ে গেলেন লুক।

রাইফেলটা কেড়ে নিল কিশোর। লুকের বুকের দিকে ধরে রেখে মুসাকে জিজ্ঞেস করল, গুলি লেগেছে?

না, জবাব দিল মুসা।

মই বেয়ে দ্রুত নেমে এল জোসি ও জেফরি।

জেফরির দিকে তাকাল কিশোর। লুকের কথা সবই তো শুনলেন?

শুনেছি, মনেও রেখেছি। মেঝেতে পড়ে থাকা লুকের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন জেফরি। প্রতিটি শব্দ আদালতকে জানাতে পারব আমি।

কেউ বিশ্বাস করবে না… বিড়বিড় করলেন লুক।

টেপরেকর্ডারটা তুলে দেখাল মুসা। এটার কথা তো বিশ্বাস করবে? আপনি হেরে গেছেন, লুক।

হাসল জোসি। এভাবে কারও পরাজয়কে লস অ্যাঞ্জেলেসে বলে, ইয়োর গৃজ ইজ কুকড। আর আমরা অ্যাথাবাস্কানরা বলি, ইয়োর মুজ ইজ কুকড।

হেসে উঠল মুসা।

পরদিন সকালে প্লেনে করে ফেয়ারব্যাংকস থেকে উড়ে এল আলাস্কান পুলিশ। নদীর জমাট বরফের ওপর নামল প্লেন। দুজন পার হাতকড়া পরিয়ে দিল লুকের হাতে। সাক্ষীদের বক্তব্য শুনল। কিশোরের রেকর্ড করা টেপটা পকেটে ভরল।

কিশোর ও মুসাকে ধন্যবাদ দিলেন অফিসার। ওদের গোয়েন্দাগিরির প্রশংসা করলেন।

আসামীকে নিয়ে চলে গেল পুলিশ।

সেদিন অ্যাসেম্বলি হলে একটা মিটিং ডাকল বিগস। গত কয়েক মাসে অনেক কিছু জেনেছি আমি, অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। আপনাদের অহঙ্কার, আপনাদের ঐতিহ্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। সেসব নষ্ট করার কোন অধিকার আমার নেই তারপরেও আমি বলব, আমার কোম্পানিকে কাজ করার একটা সুযোগ দিয়ে দেখুন। আমি কথা দিচ্ছি, আপনাদের জীবনযাত্রায় কোনরকম বাদ সাধা হবে না। বরং, আপনাদের এই সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যই আমাদের পুঁজি। এগুলো দেখতেই তো টুরিস্ট আসবে। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এ সব ধ্বংস হতে দেব না আমরা।

জেফরি, এরিনা, জোসি ও মুনের দিকে তাকাল ও। পাশাপাশি বসেছে গোটা পরিবার। আজ সকালে থিম পার্কের হোম অফিসের সঙ্গে কথা বলেছি আমি। গত কয়েক দিনে এখানে যার যা ক্ষতি হয়েছে, যদিও সেগুলোর জন্য কোনভাবেই দায়ী নয় আমাদের কোম্পানি, তবুও ক্ষতি পূরণ দেবার অঙ্গীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। টিনুকদের কেবিন নতুন করে তৈরি করে দেবে, জো সারটনকে একটা নৌকা কিনে দেবে।

ঘরের মধ্যে জোর গুঞ্জন। হাততালি। থামতে সময় লাগল।

বিগস বলল, ফেয়ারব্যাংকসের সবচেয়ে বড় ফলের দোকানটায় অর্ডার পাঠিয়েছি আমি। বাক্স ভর্তি করে তাজা ফল আনাব। এলে, সবার আগে আমি নিজে খেয়ে দেখব, বিষ মেশানো আছে কি না।

বিগ্সের রসিকতায় আরেক দফা হাসাহাসি, হুল্লোড়।

উঠে দাঁড়ালেন জেফরি। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, বিগস্। আপনি অনেক করেছেন আমাদের জন্য। লুককে ধরার জন্য মস্ত ঝুঁকি নিয়েছেন। অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারত আপনার। আমাদের ধারণায় চিড় ধরিয়ে দিয়েছেন। আমরা বুঝেছি, গ্লিটারের ক্ষতি নয়, মঙ্গলই চাইছেন আপনি। সত্যিই গ্লিটারের উন্নতি দরকার। টাকা ছাড়া কিছু হয় না। পূর্বপুরুষের ঠুনকো আভিজাত্য আর অহঙ্কার আঁকড়ে থেকে না খেয়ে মরারও কোন মানে হয় না। তাদের যুগ চলে গেছে। এখন আমাদের যুগ। বর্তমানকে বুঝে সে-মত চলতে না পারলে অস্তিত্বই টিকিয়ে রাখতে পারব না আমরা।

জোরাল গুঞ্জন। জনতাকে চুপ করাতে হাত তুললেন জেফরি। এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। এখনই ভোট দিচ্ছি না আমরা। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করব। ভাবনা-চিন্তা করব। নিজেদের কোনরকম ক্ষতির আশঙ্কা দেখলে থিম পার্কের পক্ষে ভোট দেব না।

যা বললেন, তাতেই আমি খুশি, বিগৃস্ বলল। পরে আরও মিটিং দরকার হবে আমাদের।

হ্যাঁ, হবে। এতবড় একটা সিদ্ধান্ত, এক মিটিঙেই নেয়া যায় না, জেফরি বললেন। তবে এখন আমি সমস্ত গ্লিটারবাসীকে অন্য একটা অনুরোধ জানাব। কিশোর ও মুসাকে আপনাদের থ্যাংকস-ভোট দিতে অনুরোধ করব, কারণ ওদের সহযোগিতা না পেলে লুক-দানবের হাত থেকে রক্ষা পেতাম না আমরা। শহরটাকে ধ্বংস করে দিত ও। ওর কাছ থেকেও একটা শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত আমাদের। অতিরিক্ত লোভ করা ভাল না। আমরাও করব না। অতি লোভ একটা জাতিকে। ধ্বংস করে দিতে পারে। হাত তুলে বললেন তিনি, এখন, কিশোর ও মুসাকে থ্যাংকস-ভোট।

মুহূর্তে ঘরের সমস্ত চোখ ঘুরে গেল দুই গোয়েন্দার দিকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোনদিন পড়েনি ওরা। অস্বস্তি বোধ করতে লাগল দুজনে।

সবাই উঠে এসে ঘিরে ফেলল ওদেরকে। পিঠ চাপড়ানো, হাত মেলানো আর ধন্যবাদ জানানোর পালা চলল। মুসা নিশ্চিত, এত আন্তরিক আর গর্বিত একটা জাতির উন্নতি হতে বাধ্য।

শুক্রবার সকাল। কুকুরের দল, স্লেজ আর রসদ গোছাতে জোসিকে সাহায্য করল কিশোর ও মুসা। জোসির সঙ্গে ওর স্লেজে করে নদীর ওপর গিয়ে উঠল। মুনও রয়েছে ওদের সঙ্গে। দলবল নিয়ে ওখানে অপেক্ষা করছে টেড।

ডায়মণ্ডহার্টকে দেখে দাঁত বের করে গজরানো শুরু করল টেডের নেতা-কুকুরটা। তবে ডায়মণ্ডহার্টের মেজাজ শান্ত। প্রতিপক্ষের গজরানোতে কান দিল না। পুরোপুরি উপেক্ষা করল। হেসে ফেলল জোসি। আদর করতে লাগল কুকুরটাকে। মুনও ওটার মাথা চাপড়ে আদর করে দিল।

হই-চই শুনে ফিরে তাকাল মুসা। দলে দলে লোক আসছে।

জোসি! মুসা বলল, এত লোক!

ভয় নেই, বরফের স্তর ভাঙবে না। অনেক পুরু।

বরফের কথা বলছি না। আমি ভাবছি, প্লেনে এত লোকের জায়গা হবে?

হেসে ফেলল জোসি। এত লোক তো যাচ্ছে না। আমাদের বিদায় জানাতে এসেছে। তোমাদের জানানো হয়নি, থিম কোম্পানি আমাদের স্পন্সর করছে। বড় দুটো প্লেন পাঠাচ্ছে ওরা। আমার আর টেডের দুটো কুকুরবাহিনী, দুটো স্লেজ আর ওগুলোর সমস্ত মালপত্র যাতে বহন করতে পারে।

দূর থেকে ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এল। আকাশের দিকে তাকাল মুসা। বহুদূরে একটা কালো বিন্দু দেখে বলল, প্রথম প্লেনটা আসছে।

জনতার সঙ্গে জেফরি আর এরিনা রয়েছেন। নদীর বরফের ওপর উঠে এলেন দুজনে।

টেডের দিকে তাকাল জোসি। বলল, ইডিটারোড রেসে যাদের সঙ্গে আমরা প্রতিযোগিতা করছি, তারা সবাই অভিজ্ঞ, বড় বড় রেসার।

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল টেড। তাদেরকে হারিয়ে প্রথম হওয়ার চেষ্টা করতে হবে আমাদের।

খুব কঠিন কাজ, তবে হাল ছাড়ব না আমি। প্রথম হওয়ার চেষ্টা করব।

আমিও করব।

ঠিক, পিছন থেকে বলল বিগস্। গ্লিটারবাসীর মুখ উজ্জ্বল করতে হবে তোমাদের। জনতার দিকে ফিরল ও। শুনুন, জোসি আর টেডের জন্য দোয়া করবেন আপনারা। ওরা যেন প্রথম ও দ্বিতীয় হতে পারে।

সবাই হাততালি আর উৎসাহ দিল দুই রেসারকে। নিজেদের শহরের গর্ব জোসি ও টেডকে।

দুই রেসারের কাঁধে হাত রাখলেন এরিনা। আমার ছেলেরা ফার্স্ট হবেই।

দুজনেই ফাস্ট হতে না পারলে তো আবার একজনের মন খারাপ হবে, হাসল বিস্। যা-ই হোক খেলা খেলাই। ব্যাপারটাকে সেভাবেই দেখতে হবে ওদের। এবার কিশোর-মুসাকে থ্রি চিয়ার্স দিন।

ঘনঘন আনন্দধ্বনি, থ্রি চিয়ার্স আর করতালিতে মুখরিত হলো নদীতীর। আবেগে চোখে পানি এসে গেল মুসার। হাত তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, প্রিয় গ্লিটারবাসী, আমার ও কিশোরের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ গ্রহণ করুন। যে আদর আর অভ্যর্থনা আপনারা আমাদের দিয়েছেন, কোনদিন ভুলব না। আরেকটা কথা, ইডিটারোড রেসে অবশ্যই আমাদের সমর্থন থাকবে গ্লিটারের পক্ষে। মুনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। মুন, তোমাকেও ভুলব না আমরা।

অনেক আনন্দ, অনেক কিছু, কিন্তু একটা কাঁটা রয়েই গেল কিশোরের মনের কোণে–এই আনন্দের মুহূর্তে রবিন নেই ওদের মাঝে। নিজের অগোচরেই দীর্ঘশ্বাস পড়ল ওর।

***

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ