তৃতীয় পর্ব
তিন গোয়েন্দা সমগ্র থেকে
#তিন_গোয়েন্দা - রাকিব হাসান
কিশোর!’ ডাক শোনা গেল মেরিচাচীর। ‘এদিকে আয়। রডগুলো বেড়ার ধার ঘেঁষে তুলে রাখবি? মুসা…রবিন, তোমরা একটু সাহায্য কর বন্ধুকে।’
কড়া রোদ। ইয়ার্ডে ব্যস্ততা। রবিনের পা ভাঙা, ভারি কাজ তার পক্ষে সম্ভব না। উল্টে রাখা পুরানো একটা বাথটাবে আরাম করে বসে রডের হিসেব রাখছে সে। গত দু’দিন ধরেই খুব কাজ হচ্ছে ইয়ার্ডে। কবে আবার হেডকোয়ার্টারে আলোচনায় বসতে পারে তিনজন কে জানে! মিস্টার ফিসফিসের সঙ্গে দেখা করে আসার পর আর এগোয়নি তদন্ত। আসলে সময়ই পায়নি। ইয়ার্ডে ব্যস্ত থেকেছে কিশোর। মুসার বাড়িতে কাজ ছিল, সারতে হয়েছে। লাইব্রেরিতে রবিনেরও কাজের চাপ পড়েছিল বেশ।
গত দু’দিন খুব কম সময়ই বাড়িতে থাকতে পেরেছেন রাশেদ চাচা। বড়সড় একটা নিলাম হচ্ছে এক জায়গায়। ওখানে মাল কিনতে ব্যস্ত তিনি। ট্রাক বোঝাই হয়ে কেবলই মালের পর মাল এসে জমা হচ্ছে ইয়ার্ডে। কবে যে শেষ হবে, কে জানে!
একটানা কাজ করে গেল ওরা খুশিমনেই। মেরিচাচীর কাজ করে দিতে দ্বিধা নেই তিন গোয়েন্দার। প্রচুর চুইংগাম কিংবা টফির লোভ আছে। সঙ্গে আছে মেরিচাচীর হাতে তৈরি কেক। বয়ে বয়ে বেড়ার কাছে নিয়ে রড জমা করছে মুসা আর কিশোর। বাথটাবে বসে ওগুলোর হিসেব রাখছে রবিন। দুপুরের দিকে ফুরসত মিলল কিছুক্ষণের জন্য। বড় ট্রাকটা দেখা গেল ইয়ার্ডের গেটে। রাশেদ চাচা এসেছেন। ছোটখাট হালকা পাতলা মানুষ, ঈগলের মত বাঁকানো বিরাট নাকের তলায় পেল্লাই গোঁফ। ট্রাক বোঝাই মালপত্রের স্তূপের ওপর একটা পুরানো ধাঁচের চেয়ারে বসে আছেন রাজকীয় ভঙ্গিতে।
পুরানো জিনিস কিনতে গেলে, যা যা চোখে পড়ে কিছুই ফেলে আসেন না রাশেদ চাচা। কাজে লাগবে কি লাগবে না, বিক্রি হবে কিনা, ওসব নিয়ে মাথা ঘামান না। কিনে নিয়ে আসেন। পরে দেখা যাবে কি করা যায়।
ইয়ার্ডের চত্বরে এসে থামল ট্রাক। মালের দিকে একবার চেয়েই স্বামীর উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন মেরিচাচী, ‘তুমি...তুমি পাগল হয়ে গেছ! ওটা এনেছ কেন?’
পায়ে পায়ে চাচীর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে তিন কিশোর। দাঁতের ফাঁক থেকে পাইপটা নিয়ে ওদের দিকে একবার দোলালেন রাশেদ চাচা। হাসলেন।
অবাক চোখে এক গাদা ধাতব পাইপের দিকে চেয়ে আছে তিন কিশোর। আট ফুট উঁচু একটা পাইপ অর্গান।
‘অর্গানটা কিনেই ফেললাম, মেরি,’ গলা খুব ভারি রাশেদ চাচার। ‘বোরিস...রোভার ধর তো। নামিয়ে ফেলি। খুব সাবধানে নামাতে হবে। ভেঙেটেঙে ফেল না আবার।’
লাফ দিয়ে মাটিতে নেমে এলেন রাশেদ চাচা। অর্গানটা নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল বোরিস আর রোভার।
‘পাইপ অর্গান...,’ কথা আটকে গেল মেরিচাচীর। ‘যেশাস! পাগল হয়ে গেছে লোকটা! ...অর্গান...পাইপ-অর্গান দিয়ে কি হবে!’
নাক-মুখ দিয়ে গলগল করে ধোঁয়া ছাড়লেন রাশেদ চাচা। রসিকতা করলেন, ‘বাজানো শিখব। পার্ট টাইম চাকরি করা যাবে সার্কাসে।’ হাসলেন তিনি। হাত লাগালেন বোরিস আর রোভারের সঙ্গে।
বোরিস আর রোভার দুই ভাই। বাভারিয়ার লোক। দু’জনেই ছয় ফুট চার ইঞ্চি লম্বা, সেই অনুপাতে চওড়া। মাথার চুল সোনালি। গায়ে মোষের জোর। সহজেই ধরে ধরে নামিয়ে আনছে ভারি পাইপগুলো।
শোবার ঘরের কাছে বেড়ার ধারে অর্গানটা বসানোর সিদ্ধান্ত নিলেন রাশেদ চাচা। ওখানেই নিয়ে গাদা করে রাখা হল অর্গানের পাইপ আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি। পরে জুড়ে দেয়া যাবে।
‘খুব ভাল জিনিস,’ তিন কিশোরকে বললেন রাশেদ চাচা। ‘লস আঞ্জেলেসের পুরানো এক থিয়েটার হাউজ থেকে এনেছি।’
‘খুব ভাল করেছ!’ গোমড়া মুখে বললেন মেরিচাচী। ‘কপাল ভাল, কাছেপিঠে প্রতিবেশী নেই।’ কাজ করতে চলে গেলেন তিনি।
‘অনেক বড় অডিটোরিয়ামের জন্যে তৈরি হয়েছিল অর্গানটা,’ ছেলেদেরকে বললেন রাশেদ চাচা। ‘জোরে বাজালে কানের পর্দা ফেটে যাবে মানুষের। চাইলে খুব নিচুতে নিয়ে আসা যায় এর শব্দ। এতই নিচু, মানুষের কানেই ঢোকে না সে-আওয়াজ।’
‘না-ই যদি শোনা গেল, ওটা আবার শব্দ হল নাকি?’ চাচার দিকে চেয়ে বলল কিশোর।
‘মানুষের কানে ঢোকে না, সার্কাসের হাতির কানে ঢুকবে,’ মুচকে হাসলেন রাশেদ চাচা। চলে গেলেন সেখান থেকে।
‘কান তো সবারই এক,’ বলল মুসা। ‘মানুষের কানে না ঢুকলে হাতির কানে ঢুকবে নাকি?’
‘ঢুকতেও পারে,’ জবাবটা দিল রবিন। ‘কুকুরের হুইসেলের নাম শোনোনি? মানুষের কানে ঢোকে না, কিন্তু কুকুর ঠিকই শুনতে পায় ওই বাঁশির আওয়াজ।’
‘সাবসোনিক,’ যোগ করল কিশোর। ‘বিলো সাউন্ডও বলে একে। ভাইব্রেশন বেশি না হলে মানুষের কানে ঢোকে না শব্দ। একটা বিশেষ রেঞ্জের কাঁপন হলে তবেই শুনতে পায় মানুষ।’
পাইপ অর্গান আর শব্দ-রহস্য নিয়ে এতই মগ্ন ওরা, গেটের কাছে দাঁড়াল এসে নীল স্পোর্টস কারটা, খেয়ালই করল না। ড্রাইভার—টিং-টিঙে রোগাটে শরীর, লম্বা এক তরুণ। জোরে হর্ন বাজাল।
চমকে ফিরে চাইল তিন কিশোর।
তিন গোয়েন্দাকে চমকে দিতে পেরে খুব মজা পেল যেন গাড়ির আরোহীরা। জোরে হেসে উঠল ড্রাইভার আর তার দুই সঙ্গী।
‘শুটকো টেরি!’ লম্বা তরুণকে ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে আসতে দেখে বলে উঠল মুসা।
‘ওর এখানে কি?’ বিড় বিড় করল রবিন।
বছরের একটা বিশেষ অংশ রকি বীচে কাটাতে আসে ডয়েল পরিবার, সারা বছর থাকে না। কিন্তু ওই কয়েকটা মাসই যথেষ্ট। জ্বালিয়ে মারে কিশোর, মুসা আর রবিনকে। খালি পেছনে লেগে থাকে।
নিজের বুদ্ধির ওপর অগাধ আস্থা টেরিয়ার ডয়েলের, অন্য কেউ সেটা মানল কি মানল না, তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। নিজের গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে। বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কিশোর বয়েসী ছেলেছোকরাদেরকে অধীনে রাখার চেষ্টা করে। রকি বীচের বেশির ভাগ ছেলেমেয়েই পাত্তা দেয় না তাকে, এড়িয়ে চলে। তবে বখে যাওয়া কিছু ছেলেকে দলে টানতে পেরেছে টেরিয়ার। প্রায়ই পার্টি দেয়, ওদেরকে দাওয়াত করে। তার গাড়িতে তুলে ঘোরায় সারা শহর। দরাজ হাতে খরচ করে।
এগিয়ে আসছে টেরিয়ার। হাতে একটা জুতোর বাক্স। গাড়িতে বসা দুই সঙ্গীর চোখ তার ওপর। তিন গোয়েন্দাও দেখছে তাকে। কাছাকাছি এসেই পকেটে হাত ঢোকাল সে। ঝটকা দিয়ে বের করে আনল আবার। হাতে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস। রাশেদ চাচা আর দুই বাভারিয়ান ভাইয়ের দিকে তাকাল। পাইপ অর্গানটা নিয়ে ব্যস্ত তারা। এখান থেকে তার কথা শুনতে পাবে না। বিশেষ কায়দায় ভুরু কুঁচকাল সে। গুরুগম্ভীর একটা ভাব ফুটিয়ে তুলল চেহারায়। ম্যাগনিফাইং গ্লাসের ভেতর দিয়ে পুরো ইয়ার্ডে চোখ বোলাল একবার। ‘ভুল জায়গায় এসে পড়লাম না তো!’
টেরিয়ারের অভিনয়ে খুব মজা পেল তার দুই সঙ্গী, হেসে উঠল হো হো করে।
‘কি চাই এখানে, শুটকি?’
মুসার কথা যেন শুনতেই পেল না টেরিয়ার। ম্যাগনিফাইং গ্লাসের ভেতর দিয়ে তাকাল কিশোরের দিকে। অনেক কষ্টে যেন চিনতে পারল। গ্লাসটা আবার ভরে রাখল পকেটে। ‘এই যে কিশোর হোমস, পৃথিবী বিখ্যাত গোয়েন্দা। দেখা করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। একটা কেস নিয়ে এসেছি আপনার কাছে, স্যার। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডও বিমূঢ় হয়ে গেছে, কোন সুরাহা করতে পারেনি কেসটা। শেষ পর্যন্ত আপনার শরণাপন্ন হতে হল। নির্দয়ভাবে খুন করা হয়েছে বেচারাকে। আশা করি এই জটিল রহস্যের সমাধান করতে পারবেন।’ বাক্সটা বাড়িয়ে ধরল সে।
টেরিয়ারের বলার ভঙ্গিতে হেসে লুটোপুটি খেতে লাগল তার দুই বন্ধু।
বিচ্ছিরি গন্ধ আসছে বাক্সের ভেতর থেকে। কি আছে, আন্দাজ করতে পারল তিন গোয়েন্দা। হাত বাড়িয়ে বাক্সটা নিল কিশোর। ডালা খোলার আগে একবার চাইল টেরিয়ারের দিকে।
হাসছে টেরিয়ার। অপেক্ষা করছে।
ডালা খুলল কিশোর। নাকে এসে যেন বাড়ি মারল পচা গন্ধ। বিরাট এক সাদা ইঁদুর, পচে ফুলে ঢোল হয়ে আছে।
‘কি মনে হয়, মিস্টার হোমস?’ সামান্য সামনে ঝুঁকে এল টেরিয়ার। ‘ভয়াবহ এই খুনের কিনারা করতে পারবেন? আসামীকে ধরতে পারলে বড় পুরস্কার পাবেন। পঞ্চাশটা স্ট্যাম্প।’
হাসির রোল উঠেছে গাড়িতে।
আড়চোখে সেদিকে একবার চাইল কিশোর। চেহারায় কোন পরিবর্তন হল না। গম্ভীর চোখ মুখ, আস্তে করে মাথা ঝোঁকাল। গাড়িতে বসা টেরিয়ারের দুই বন্ধুকে শুনিয়ে জোরে জোরে বলল, ‘আপনার মনের অবস্থা আমরা বুঝতে পারছি, মিস্টার শুটকি। খুবই দুঃখ পেয়েছেন। পাবেনই তো? হাজার হোক, নিহত জীবটা আপনার খুব প্রিয় বন্ধু ছিল।’
হঠাৎ থেমে গেল হাসির শব্দ। সতর্ক হয়ে উঠেছে গাড়িতে বসা ছেলে দুটো। চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে টেরিয়ারের।
‘বেচারার মৃত্যুর কারণ অনুমান করতে পারছি,’ আবার বলল কিশোর। ‘বদহজম। খইল খেয়েছিল এক গরু বন্ধুর সঙ্গে, একই গামলায়। গরুটার নামের আদ্যাক্ষর দুটো জানি। টি ডি। ভুরিভোজনের পরই হয়ত টেরর ক্যাসলে গিয়েছিল, ভূতের তাড়া খেয়ে প্যান্ট নষ্ট করতে করতে ফিরেছে।’
‘নিজেকে খুব চালাক মনে কর, না?’ হিসিয়ে উঠল টেরিয়ার।
‘বিশ্বাস হচ্ছে না? দাঁড়াও, দেখাচ্ছি,’ বলেই ঘুরল কিশোর। একছুটে গিয়ে ঢুকল ঘরে। কয়েক মুহূর্ত পরেই বেরিয়ে এল।
‘এই যে, আদ্যাক্ষর খোদাই করা আছে এটাতে,’ টর্চটা টেরিয়ারের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল কিশোর। আগে একটা এস থাকলেই তোমার পুরো নাম হয়ে যেত। শুটকি টেরিয়ার ডয়েল।’
হা হা করে হেসে উঠল মুসা। ‘টর্চটা শুটকিকে দিয়েই দাও না, কিশোর। একটা এস বসিয়ে নেবে।’
থাবা মেরে কিশোরের হাত থেকে টৰ্চটা নিয়ে নিল টেরিয়ার। ঘুরে দাঁড়াল। গটমট করে হেঁটে চলে গেল গাড়ির কাছে। ড্রাইভিং সিটে উঠে বসে ফিরে চাইল। ‘আহাহা, তিন গোয়েন্দা! শুনলেই হাসি পায়! শহরের ছেলেদের কারই জানতে বাকি নেই ভড়ঙের কথা। কেউ হাসি ঠেকাতে পারছে না।’
জবাবে তালে তালে হাততালি দিতে লাগল কিশোর, মুসা আর রবিন।
আরও খেপে গেল টেরিয়ার। রাগে ভাষা হারিয়ে ফেলল। ঝাল মেটাল গাড়িটার ওপর। বন বন করে ঘুরে উঠল স্টিয়ারিং। কর্কশ আর্তনাদ উঠল টায়ারের। ঘুরে গেল নীল স্পোর্টস কারের নাক। জোর এক ঝাঁকুনি খেয়েই লাফ দিল সামনে। তীব্র গতিতে ছুটে চলে গেল।
‘লাইব্রেরিতে আমার কার্ড ও-ব্যাটাই চুরি করেছে,’ কথা বলল রবিন। ‘আমরা কাজে নেমেছি, জেনে গেছে ব্যাটা।’
‘জানুক, লোককে জানাতেই তো চাই আমরা,’ বলল কিশোর। ‘তবে, কাজটা আরও জরুরি হয়ে পড়ল আমাদের জন্যে। প্রথম কেসে ফেল করা চলবে না কিছুতেই।’
পেছনে ফিরে চাইল একবার কিশোর। পাইপ অর্গান নিয়ে ব্যস্ত এখন রাশেদ চাচা, বোরিস আর রোভার। চাচীকে দেখা যাচ্ছে না। নিশ্চয় টেবিলে খাবার সাজাতে গেছেন।
‘একটু সময় পাওয়া গেল,’ বলল কিশোর। ‘চল, লাঞ্চের ডাক পড়ার আগেই মীটিং শেষ করে ফেলি।’
দুই সুড়ঙ্গের দিকে এগিয়ে চলল তিন গোয়েন্দা।
তাড়াহুড়ো করে এগোতে গিয়ে অঘটন ঘটাল কিশোর। মাটিতে পড়ে থাকা একটা আলগা পাইপে পা দিয়ে বসল। গড়িয়ে চলে গেল পাইপ। তাল সামলাতে না পেরে বেকায়দা ভঙ্গিতে পড়ে গেল সে।
তাড়াতাড়ি দু’দিক থেকে গোয়েন্দা প্রধানকে তুলে বসাল রবিন আর মুসা।
প্রচণ্ড ব্যথায় দাঁতে দাঁত চেপে আছে কিশোর। ‘আমার পা! ...ভেঙেই গেছে বোধহয়!’ গুঙিয়ে উঠল সে। ‘উফ্ফ্, এই যে, এখানে!’
দেখা গেল, ইতিমধ্যেই ফুলে উঠতে শুরু করেছে ডান পায়ের গোড়ালির ওপরের গাঁট।
‘ভীষণ ব্যথা!’ বিকৃত হয়ে গেছে কিশোরের মুখ। ‘উফ্ফ্, বোধহয় ডাক্তারই ডাকতে হবে!’
দুই দিন পর।
বিছানায় পড়ে আছে কিশোর। সেদিন, সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সারাদিন আটকে রাখলেন ডাক্তার। পায়ের এক্সরে করলেন। তারপর কি একটা তরল পদার্থে পা ভিজিয়ে রাখতে দিলেন। বিকেলের দিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে সে।
ডাক্তার অভয় দিয়েছেন, শিগগিরই আবার দৌড়াতে পারবে কিশোর। সারাদিন বিছানায় পড়ে না থেকে একটু একটু হাঁটাচলা করতেও বলেছেন।
ওঠার চেষ্টা করে কিশোর, পারে না। একটু নড়াচড়া করলেই প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হয়।
মনে স্বস্তি নেই গোয়েন্দা প্রধানের। দেরি হয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয় আর অপেক্ষা করবেন না মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফার। হয়ত ইতিমধ্যেই একটা ভূতুড়ে বাড়ি ঠিক করে ফেলেছেন তিনি।
কাজে নামতে না নামতেই এই অঘটন। এর চেয়ে বড় অস্বস্তিকর কারণ আর কি হতে পারে তিন গোয়েন্দার জন্যে?
কিশোরের বিছানার পাশে মলিন মুখে বসে আছে মুসা আর রবিন।
‘এখনও ব্যথা করে?’ জানতে চাইল মুসা।
‘করে,’ বলল কিশোর। ‘আক্কেল হয়েছে আমার। এত অসাবধান কেন হলাম? পা-টা যে ভাঙেনি এই যথেষ্ট। যাক গে। এখন আসল কথায় আসছি। ওই টেলিফোন কল, ওটার তো কোন সুরাহা হল না। হ্যানসনের সঙ্গে আলাপ করেছি। ও জানিয়েছে, সে রাতে টেরর ক্যাসল থেকে ফেরার পথেও নাকি কে অনুসরণ করেছিল আমাদেরকে। শুটকি হতে পারে।’
‘সহজেই পারে,’ সায় দিল রবিন। ‘ওই ব্যাটা জানে, টেরর ক্যাসলের ব্যাপারে আমরা কৌতূহলী।’
‘আমার বিশ্বাস হয় না,’ এদিক ওদিক মাথা নাড়ল মুসা। ‘গলার স্বর এভাবে বদলে ফেলার ক্ষমতা ওই ব্যাটার নেই। অন্য কেউ করেছে। মানুষ হয়ে থাকলে, মস্তবড় অভিনেতা ওই লোক।’
‘ঠিক,’ বলল কিশোর। ‘তবে সবই অনুমান।’ একটু থেমে বলল, ‘নিজের চোখে না দেখলে, ভূতে ফোন করেছে এটা মোটেই বিশ্বাস করব না আমি।’
‘তা না হয় হল,’ অনিশ্চিত রবিনের গলা। ‘ধরে নিলাম ভূতে করেনি ফোন। কিন্তু তোমাদের ওপর পাথর ফেলল কে?’
‘ঠিক,’ রবিনের কথায় জোর পেল মুসা। ‘পাথর ফেলল কে?’
‘আপাতত ওটা নিয়ে ভাবছি না,’ বলল কিশোর। ‘তবে আমার ধারণা, ভূত নয়। শুটকিও না! এর পেছনে অন্য কেউ রয়েছে।’
‘কে?’ জানতে চাইল মুসা।
‘জানলে তো বলতামই। আরও কিছু ঘটনা না ঘটলে জানা যাবে না। হ্যারি প্রাইসের কথায় আসা যাক। কেন মিছে কথা বলল লোকটা? ঝোপ কাটছিল না, তবু কেন বলল কাটছিল? লেমোনেডের কথাই ধর। সাজিয়েই রেখেছিল টেবিলে। ফ্রিজ থেকে বরফও বের করে রেখে ছিল। যেন জানত, আমরা যাব। অবাক লাগছে না?’
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
মাথা চুলকাল মুসা। বিড়বিড় করল, ‘খালি প্যাঁচ। বাড়ছেই! সুরাহা হবার কোন লক্ষণই দেখছি না!’
ঠিক এই সময় ঘরে এসে ঢুকলেন মেরিচাচী। কাছে এসে দাঁড়ালেন। ‘এখন কেমন লাগছে রে?’
‘ভাল,’ দায়সারা জবাব দিল কিশোর। তাদের আলোচনায় বাধা পড়েছে। চাইছে, মেরিচাচী চলে যাক এখন।
গেলেন না চাচী। বিছানার পাশে বসে কিশোরের আহত জায়গায় হাত রাখলেন। ‘ব্যথা লাগে এখনও?’
‘না।’
হেসে ফেললেন চাচী। ‘আমাকে তাড়াতে চাইছিস, না?’
‘না, ইয়ে...মানে...,’ ধরা পড়ে গিয়ে আমতা আমতা করতে লাগল কিশোর।
‘একটা কথা জানাতে এসেছি,’ বললেন চাচী। ‘আরও আগেই বলতাম। কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম। ইস্স্, কি ভাবনায়ই না ফেলে দিয়েছিলি!’ বাবা-মা হারা ছেলেটার জন্যে ভাবনার অন্ত নেই তাঁর।
‘চাচী, কি বলবে, বলে ফেল না?’ তাড়া দিল কিশোর।
‘গতকাল সকালে এক বুড়ি এসেছিল। তুই তখন ঘুমিয়েছিলি। সে এক আজব বুড়ি!’
‘আজব বুড়ি,’ সতর্ক হয়ে উঠল কিশোর।
চাচীর কথায় আগ্রহী হয়ে উঠছে মুসা আর রবিনও।
‘এক জিপসি বুড়ি।’
জিপসি বুড়ি! পিঠ সোজা হয়ে গেছে মুসা আর রবিনের। কিশোরও বালিশে পিঠ রেখে আধশোয়া হল। ব্যথা ভুলে গেছে। ‘তারপর?’
‘দরজায় টোকা দিল বুড়ি। খুললাম। ভেতরে ডাকব কি ডাকব না ভাবছি, এই সময়ই তোর নাম বলল সে। পা মচকানোর কথা বলল। ভবিষ্যদ্বাণী করলঃ সাবধান না হলে আরও বড় বিপদ হবে তোর। এর আগে কখনও দেখিনি ওকে। তোর নাম জানল কি করে, পা মচকানোর খবর পেল কোথায়, ঈশ্বরই জানে!’
সাবধান হতে বলেছে! এক জিপসি বুড়ি। একে অন্যের দিকে চাইছে তিন গোয়েন্দা।
‘ভেতরে ডাকলাম বুড়িকে,’ আবার বললেন মেরিচাচী। ‘এল। বসল। ঝোলার ভেতর থেকে কয়েকটা তাস বের করল। বুঝলাম, তাসের ম্যাজিক জানে বুড়িটা। তাস চালাচালি করে লোকের ভবিষ্যৎ জানতে পারে। এসবে কোনদিনই বিশ্বাস নেই আমার। কিন্তু বুড়িটা যেভাবে বলল, অবিশ্বাসও করতে পারলাম না। তিনবার তাস চালল সে তোর নাম করে। তিন বারে তিনটে কথা বললঃ টি সি থেকে দূরে থাকতে হবে তোকে। পা মচকানোর পেছনে টি সি রয়েছে। এরপরও যদি টি সি-কে এড়িয়ে না চলিস, আরও বিপদ হবে তোর।’
‘তুমি কিছু বললে না?’
‘কি আর বলব? হেসে উড়িয়ে দিয়েছি বুড়ির কথা। একটু যেন ক্ষুণ্ণ হল সে। ঝোলার ভেতরে তাসগুলো ভরে উঠে চলে গেল। কিছু একটা দেখেছি ওর চোখে, খটকা লেগেছে মনে। ...কিশোর, বাপ, একটু সাবধানে থাকিস তুই! কি জানি, কিছু ঘটেও যেতে পারে।’ উঠলেন চাচী। ‘তোরা কথা বল। আমি যাই। কাজ পড়ে আছে ওদিকে।’
বেরিয়ে গেলেন মেরি চাচী। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। নিচে নেমে যাচ্ছেন তিনি।
চাচী বেরিয়ে যাবার পরও অনেকক্ষণ কোন কথা বলতে পারল না তিন গোয়েন্দা। একে অন্যের দিকে চেয়ে রইল।
‘টি সি…’ অবশেষে কথা ফুটল রবিনের মুখে। শুকনো গলা। ‘মানে, টেরর ক্যাসল।’
‘শুটকির কাজও হতে পারে,’ বলল কিশোর। সামান্য ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে তার চেহারা। ‘সে-ই হয়ত পাঠিয়েছে বুড়িকে। কিন্তু টেরির এত বুদ্ধি, নাহ্! বিশ্বাস হচ্ছে না! মরা ইঁদুর এনে ইয়ার্কি মারা পর্যন্তই তার দৌড়।’
‘কেউ...,’ বলল মুসা। ‘মানে, কিছু একটা চায় না, আমরা টেরর ক্যাসলে যাই। প্রথমে ফোনে হুঁশিয়ার করেছে। তারপর জিপসি বুড়ির ওপর ভর করে তাকে হাঁটিয়ে এনেছে ইয়ার্ডে। তার মুখ দিয়ে নিজে কথা বলেছে।’ দুই সঙ্গীর দিকে চাইল সে। কেউ কিছু বলল না। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ ধরে নিয়ে বলল, ‘এরপর থেকে টেরর ক্যাসলের ধারেকাছে যাওয়াও আর উচিত না আমাদের। কি বল, রবিন?’
‘ঠিক।’
‘কিশোর?’
‘ঠিক বেঠিক জানি না, তবে আবার যেতে হবে টেরর ক্যাসলে,’ বলল গোয়েন্দাপ্রধান। ‘লোক হাসাতে চাও? শুটকি কি বলে গেছে, মনে নেই? ভয় পেয়ে এখন পিছিয়ে গেলে থু থু দেবে সে আমাদের মুখে। সারা রকি বীচে আমাদের গোয়েন্দাগিরির খবর রটিয়ে দিয়েছে। প্রথম কেসেই ফেল করলে মুখ টিপে হাসবে সবাই আমাদের দেখলে। পিছিয়ে আসার আর উপায় নেই। এগিয়ে যেতেই হবে।’
চুপ করে রইল দুই সহকারী।
‘তাছাড়া,’ আবার বলল কিশোর, ‘জিপসি বুড়ি এসে নতুন আরেক রহস্য যোগ করে দিয়ে গেল। বুঝতে পারছি, ঠিক পথেই এগোচ্ছি আমরা।’
‘মানে?’ জানতে চাইল মুসা।
‘এর আগে অনেকেই ঢুকেছে টেরর ক্যাসলে। এর রহস্য ভেদ করতে চেয়েছে। কাউকেই হুঁশিয়ার করা হয়নি আমাদের মত। এর একটাই মানে। ঠিক পথেই এগোচ্ছি আমরা। টেরর ক্যাসলের আজব রহস্য ভেদ করে ফেলি, চায় না কেউ একজন।’
‘বেশ, ধরে নিলাম তোমার কথাই ঠিক,’ বলল মুসা। ‘তাহলেও আর এগুতে পারছি না আমরা। তুমি পড়ে আছ বিছানায়। তোমার পা ভাল না হলে কাজে নামতে পারছি না আর।’
‘ভুল বললে,’ বলল কিশোর। ‘বিছানায় শুয়ে আছি বটে, ব্রেনটা অকেজো হয়ে যায়নি, বরং ঠাণ্ডা মাথায় ভাবার সুযোগ পেয়েছি বেশি, আমি না হয় না-ই যেতে পারলাম, তোমরা যাও, আরেকবার ঘুরে এস ক্যাসল থেকে।’
‘আমরা যাব!’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল রবিন। ‘মোটেই না। টেরর ক্যাসলের ওপর বড়জোর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারি আমি। তার বেশি কিছু করতে পারব না।’
‘খুব বেশি কিছু করতে হবেও না তোমাদেরকে,’ সহজ গলায় বলল কিশোর। ‘একটা ব্যাপারে শুধু শিওর হয়ে আসতে হবে। অস্বস্তি বেড়ে আতঙ্কে রূপ নেয় কিনা জানতে হবে, আর সে আতঙ্ক কতখানি তীব্র, তাও বুঝে আসতে হবে।’
‘কতখানি তীব্র!’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ‘এখনও বোঝার বাকি আছে নাকি? আতঙ্কে হার্টফেল করতে বসেছিলাম গত বার, মনে নেই?’
‘সেজন্যেই রবিনকে যেতে বলছি এবার সঙ্গে,’ বলল কিশোর। ‘ওরও একই অবস্থা হয় কিনা, জানা দরকার। আরেকটা ব্যাপার। অবস্থাটা কতক্ষণ স্থায়ী হয়, জেনে আসতে হবে। মানে, ক্যাসলের বাইরে ঠিক কতদূরে এলে পরে ওই আতঙ্ক চলে যায়, বুঝতে হবে।’
‘এর আগের বারে ছিল পনেরো মাইল,’ জবাব দিল মুসা। ‘বাড়িতে গিয়ে নিজের বিছানায় শোয়ার পর তবে গেছে।’
‘এবারে গিয়ে শিওর হয়ে নাও, সত্যিই পনেরো মাইল কিনা,’ শান্ত গলা কিশোরের। ‘আগের বারের মত পড়িমড়ি করে ছুটবে না। আস্তে আস্তে পিছিয়ে আসবে, ক্যাসলের বাইরে বেরোবে, পথে নামবে। খানিক পর পরই থেমে বোঝার চেষ্টা করবে, আতঙ্ক চলে গেছে কিনা।’
‘আস্তে আস্তে,’ শুকনো হাসি হাসল মুসা। ‘আবার থামবও খানিক পর পর।’
‘হয়ত আতঙ্কিতই হবে না,’ বলল কিশোর। ‘কারণ এবারে দিনে যাচ্ছ। দিনের আলো থাকতে থাকতেই পরীক্ষা করবে ক্যাসলের ঘরগুলো। সাহসে কুলালে রাত নামার পরেও অপেক্ষা কোরো একটু। হ্যাঁ, আগামীকাল বিকেলেই যাচ্ছ তোমরা।’
‘কি?’ রবিনের দিকে চেয়ে বলল মুসা। ‘যাবে তো?’
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল রবিন। ‘আগামীকাল হলে আমি পারছি না। লাইব্রেরিতে কাজ আছে। পরশু এবং তার পরদিনও পারব না।’
‘আগামী দু’তিন দিন আমারও কাজ আছে,’ বলল মুসা। ‘বাড়িতে। আমিও যেতে পারছি না।’
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। ‘হুঁমম, ভাবনার কথাই। তাহলে তো প্ল্যান বদলাতেই হচ্ছে!’
‘ঠিক,’ খুশি হয়ে বলল মুসা। ‘প্ল্যান বদলাতেই হচ্ছে।’
‘বেশ,’ বলল কিশোর। ‘এখনও দিনের আলো থাকবে কয়েক ঘণ্টা। তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বেরিয়ে পড়। ঘুরে এস ক্যাসল থেকে।’
ধুত্তরি।’ মুখ গোমড়া মুসার। ‘কখনও পারি না-ওর সঙ্গে। কথার প্যাঁচে ফেলে দিয়ে ঠিক কাজ আদায় করে নেয়।’
‘ঠিক,’ সায় দিল রবিন। আর কিছু বলল না।
গিরিপথে এসে দাঁড়িয়েছে দু’জনে। সামনেই পাহাড়ের ঢালে টেরর ক্যাসল আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে সূর্য। তেরছাভাবে রোদ এসে পড়েছে বিশাল টাওয়ারের গায়ে। পেঁচিয়ে ওঠা আঙুর-লতার ফাঁকে ফাঁকে শার্শিভাঙা জানালার ফোকর, ভয়াবহ দানবের চোখ যেন।
শিউরে উঠল একবার রবিন। ‘চল, ঢুকে পড়ি। সুরুজ ডুবতে বড়জোর আর দু’ঘণ্টা। তারপর ঝপাৎ করে নামবে অন্ধকার।’
ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করল দু’জনে। মাঝামাঝি উঠে পেছনে ফিরে চাইল একবার মুসা। বাঁকের ওপারে। পাথরের স্তূপের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে রোলস রয়েস। অপেক্ষা করছে হ্যানসন।
‘কি মনে হয়?’ উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করল মুসা। ‘এবারেও শুটকি ফলো করছে আমাদের?’
‘না,’ এদিক ওদিক মাথা নাড়ল রবিন। পা ভাঙা। উঠতে কষ্ট হচ্ছে তার, কিন্তু মুসাকে বুঝতে দিচ্ছে না। ‘আমি খেয়াল রেখেছিলাম। ওর নীল গাড়ির ছায়াও দেখিনি। কিশোরের ধারণা, টেরর ক্যাসলের ধার মাড়াবে না আর শুটকি।’
‘আমরাও মাড়াতে চাইনি, জোর করে পাঠানো হয়েছে। তবে, শুটকিকে হয়ত জোর করেও পাঠানো যাবে না।’
রবিনের কাঁধে ঝুলছে ক্যামেরা। মুসার হাতে টেপ রেকর্ডার। কোমরের বেল্টে আটকে নিয়েছে টর্চ, দু’জনেই। টেরর ক্যাসলের বারান্দায় উঠে এল ওরা। হলে ঢোকার বড় দরজাটা বন্ধ।
‘তাজ্জব ব্যাপার তো!’ ভুরু কুঁচকে গেছে মুসার। ‘শুটকি দরজা খোলা রেখেই পালিয়েছিল, দেখেছি।’
‘বাতাসে বন্ধ হয়ে গেছে হয়ত,’ বলল রবিন।
হাত বাড়িয়ে দরজার নব চেপে ধরল মুসা। ঘোরাল। ঠেলা দিতেই তীক্ষ্ণ ক্যাঁ-অ্যাঁ-চ্-চ্-চ্ শব্দ করে খুলে গেল ভারি দরজা।
‘মরচে পড়ে গেছে কবজায়,’ মন্তব্য করল রবিন। ‘ওই শব্দে ভয় পাবার কিছু নেই,’ নিজেকেই যেন বোঝাল সে।
‘কে বলল, ভয় পেয়েছি?’ স্বীকার করতে রাজি না মুসা।
দরজা খোলা রেখেই হলে ঢুকে পড়ল ওরা। হলের এক পাশে একটা বড় ঘর। ঢুকল ওরা। পুরানো আসবাবপত্রে বোঝাই। কাঠের ভারি ভারি চেয়ার টেবিল, বিরাট ফায়ার প্লেস। রহস্যজনক কিছু দেখলেই ছবি তুলে নিতে বলে দিয়েছে কিশোর। কিন্তু তোলার মত তেমন কিছুই চোখে পড়ল না রবিনের। তবু ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ঘরের গোটা দুয়েক ছবি তুলে নিল সে।
তারপর ইকো রুমে এসে ঢুকল ওরা। ঘরে আবছা আলো আঁধারির খেলা! গা শিরশিরে একটা অনুভূতি আবহাওয়ায়, অস্বস্তিকর। বিচিত্র আর্মার সুট আর বিভিন্ন ভঙ্গিতে তোলা জন ফিলবির ছবিগুলোর দিকে চাইলে আরও বেড়ে যায় অস্বস্তি ভাবটা। একপাশে সিঁড়ি, দোতলায় উঠে গেছে। মাঝামাঝি জায়গায় একপাশের দেয়ালে কয়েকটা জানালা। কাচের শার্শি। ধুলোর পুরু আস্তরণ। ওপথেই আসছে আলো।
‘মিউজিয়ম মনে হচ্ছে,’ বলল রবিন। ‘জানই তো, যে-কোন মিউজিয়মে ঢুকলেই কেমন জানি হয়ে যায় মন।’
‘ঠিক,’ সায় দিল মুসা। ‘ঠিক ধরেছ। সেই অনুভূতি। মিউজিয়মে ঢুকলে এমন হয়।’ কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেল সে। ‘ধুলো-বালি, পুরানো, কেমন যেন মরা মরা…।’
‘মরা-অরা-অরা-অরা-অরা-অরা!’
ঘরের ঠিক মাঝামাঝি গিয়ে শেষ শব্দটা উচ্চারণ করছে মুসা, বেশ জোরে। এক লাফে পিছিয়ে এল।
‘ওরে-ব্বাপরে! এত জোরাল!’ বলতে বলতেই ঘরের ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল রবিন। ‘প্রতিধ্বনি।’
‘ধ্বনি-অনি-অনি-অনি-অনি-অনি!’
হাত চেপে ধরে একটানে রবিনকে সরিয়ে আনল মুসা। ‘ওখানে দাঁড়িয়ে জোরে কথা বললেই ওই কাণ্ড ঘটে।’
প্রতিধ্বনি পছন্দ করে রবিন। জোরে ‘হাল্লো’ বলার ইচ্ছেটা চাপা দিতে হল। ইকো হলের প্রতিধ্বনি মজার নয়, বরং কেমন অস্বস্তি জাগায়।
‘চল, ছবিটা দেখি,’ বলল রবিন। ‘ওই যে, যেটা চোখ টিপেছিল তোমার দিকে চেয়ে।’
‘ওই তো,’ হাত তুলে দেখাল মুসা। ‘জলদস্যুর সাজে জন ফিলবি।’
‘চল, ভালমত দেখি,’ বলল রবিন। ‘একটা চেয়ারে দাঁড়িয়ে দেখ তো, নাগাল পাও কিনা।’
ভারি, পিঠবাঁকা একটা কাঠের চেয়ার ছবিটার তলায় নিয়ে এল মুসা। উঠল চেয়ারে। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েও নাগাল পেল না ছবিটার।
‘ওই যে একটা ব্যালকনি,’ ছবিটার ওপর দিকে চেয়ে বলল রবিন। ওখান থেকে লম্বা তার দিয়ে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে ছবি। ‘চল উঠে যাই। তার ধরে টেনে তুলে নিতে পারব ছবিটা।’
সিঁড়ির দিকে এগোনোর জন্যে ঘুরে দাঁড়াতে গেল রবিন। আধপাক ঘুরেছে, এই সময় তার ক্যামেরা-কেসের চামড়ার ফিতে আটকাল কেউ। চমকে ফিরে চাইল রবিন। ঠিক তার পেছনে, আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা এক মূর্তি। গলা চিরে বিকট চিৎকার বেরিয়ে এল তার, খিঁচে দৌড় মারতে চাইল দরজার দিকে।
পারল না। ফিতেয় হ্যাঁচকা টান লাগল, আবার পিছিয়ে গেল রবিন। ভারসাম্য হারাল। কাত হয়ে গেল এক পাশে। মুখ ফিরিয়ে চাইল কি আছে পেছনে। আর্মার সুট পরা এক বিরাট মূর্তি, কোপ মারার ভঙ্গিতে মাথার উপর তুলে রেখেছে তলোয়ার।
আবার চিৎকার বেরোল রবিনের গলা চিরে। পড়ে গেল মার্বেলের মেঝেতে। সঙ্গে সঙ্গে গড়ান দিয়ে সরে গেল একপাশে।
খটাং করে মেঝেতে পড়ল তলোয়ার, মুহূর্ত আগে ঠিক ওই জায়গাতেই ছিল রবিন। তলোয়ারের পাশেই পড়ল মূর্তিটা। বদ্ধ ঘরে বিকট আওয়াজ হল। ইস্পাতের খালি ড্রাম পড়ল যেন একটা।
ফিতেয় টান নেই আর এখন। গড়িয়ে দূরে সরে গেল রবিন। দেয়ালে এসে ঠেকার আগে থামল না। ফিরে চাইল। খাড়া হয়ে গেছে ঘাড়ের চুল। তার দিকে তেড়ে আসছে না আর্মার সুট পরা মূর্তি। ধড় থেকে মাথা আলাদা হয়ে গেছে ওটার। গড়াতে গড়াতে চলে যাচ্ছে মেঝের ওপর দিয়ে। থেমে গেল দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে।
আরও কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে উঠল রবিন। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল পড়ে থাকা ধড়টার দিকে। পাশে গিয়ে বসল ভয়ে ভয়ে। ধড়ের গলার ভেতরে একবার উঁকি দিয়েই হাঁপ ছাড়ল। খালি। আসলে ওটা একটা আর্মার সুট। আস্ত। কায়দা করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল দেয়ালে ঠেকা দিয়ে। একটা হাত ওপরের দিকে তুলে আটকে দেয়া হয়েছিল কোনভাবে। হাতের মুঠোয় ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল তলোয়ার। খুব কাছাকাছি গিয়েছিল রবিন। বেঁধে গিয়েছিল ফিতে। রবিন পাশে ঘোরার সময় টান লেগেছে, পড়ে গেছে মূর্তিটা। চোট সইতে না পেরে গলা থেকে আলগা হয়ে গেছে লোহার শিরস্ত্রাণ।
চোখ বড় বড় করে সুটটার দিকে চেয়ে আছে রবিন। চমকে উঠল অট্টহাসির শব্দে। হো হো করে ঘর ফাটিয়ে হাসছে মুসা।
হাসিতে যোগ দিল না রবিন। বেকায়দা ভঙ্গিতে পড়ে থাকা সুটের ধড়ের একটা ছবি তুলল। আরেকটা ছবি তুলল মুসার।
‘যাক,’ বলল রবিন। ‘ক্যাসলের এক ভূতের ছবি তুললাম।’ চেয়ারে দাঁড়িয়ে হাসছে। ‘দেখে নিশ্চয় মজা পাবে কিশোর।’
‘ক্যামেরাটা আমার হাতে থাকা উচিত ছিল, রবিন,’ চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল মুসা। ‘কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছ তুমি। পেছনে তলোয়ার উঁচিয়ে আছে আর্মার সুট পরা এক মূর্তি। আহ্, যা দারুণ একখান ছবি হত না!’ আবার হাসতে লাগল সে।
আর্মার সুটটার দিকে একবার তাকাল রবিন। দৃষ্টি দিয়ে ওটাকে ভস্ম করার চেষ্টা চালাল যেন। ব্যর্থ হয়ে ফিরল দেয়ালে ঝোলানো ছবির দিকে। ক্যামেরা চোখের সামনে তুলে এনে শটাশট শাটার টিপে চলল একের পর এক।
কয়েকটা ছবি তুলে নিয়ে মুসার দিকে ফিরল রবিন। ‘হাসি থামবে এবার? অনেক কাজ পড়ে আছে। ওই যে দরজাটা, চল ওঘরে ঢুকি।’ দরজার কপালে বসানো প্লেটের লেখা পড়ল, ‘প্রোজেকশন রুম।’
চেয়ার থেকে নেমে এল মুসা। ‘বাবার মুখে শুনেছি, আগে বড় বড় অভিনেতার বাড়িতে নিজস্ব প্রোজেকশন রুম থাকত। ঘরে বসেই নিজের ছবি দেখত, বন্ধুদের দেখাত। চল দেখি ঘরটা।’
হাতল ধরে জোরে টান দিল রবিন। ধীরে ধীরে খুলে গেল পাল্লা, যেন ওপাশ থেকে টেনে ধরে রেখেছে কেউ। এক ঝলক হাওয়া এসে ঝাপটা মারল গায়ে, নাকে এসে লাগল ভ্যাপসা গন্ধ। দরজার ওপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নিরেট অন্ধকার।
বেল্টে ঝোলানো টর্চ খুলে নিল মুসা। আলো ফেলল ভেতরে।
অন্ধকারের কালো চাদর ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল আলোক রশ্মি। চোখের সামনে ভেসে উঠল প্রোজেকশন রুম। বেশ বড় একটা হলঘর। কয়েক সারিতে রাখা হয়েছে শ’খানেক চেয়ার! একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট এক পাইপ অর্গান!
‘মুভি-থিয়েটারের মত সাজানো হয়েছে,’ বলল মুসা। ‘অর্গানটা দেখেছ? রাশেদ চাচারটার চেয়েও অনেক বড়।’
নিজের টর্চ খুলে আনল রবিন। সুইচ টিপল। আলো জ্বলল না। ভাল করে দেখে বুঝল, ভেঙে গেছে কাচ। সে যখন মেঝেতে পড়ে গিয়েছিল, বাড়ি লেগেছিল তখনই।
একটা টর্চের আলোই যথেষ্ট। প্রোজেকশন রুমের ভেতরে এসে ঢুকল দু’জনে। এগোল পাইপ অর্গানটার দিকে।
হাসাহাসি করে হালকা হয়ে গেছে মন। ভয় কেটে গেছে দু’জনেরই। অর্গানের কাছে এসে দাঁড়াল ওরা।
ছাতের কাছাকাছি উঠে গেছে বিশাল পাইপগুলো। ধুলোবালি আর মাকড়সার জাল লেগে আছে। অর্গানের একটা ছবি তুলল রবিন।
আলো ফেলে ফেলে পুরো ঘরটা দেখল ওরা। যত্নের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চেয়ারগুলো। জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে ছাল-চামড়া-গদি। ছবি দেখানোর পর্দার জায়গায় ঝুলছে এখন কয়েক ফালি সাদা কাপড়। গুমোট গরম ঘরে।
‘এখানে কিছু নেই,’ বলল মুসা। ‘চল, ওপরে যাই।’
প্রোজেকশন রুম থেকে বেরিয়ে এল ওরা। ইকো হল পেরিয়ে এক প্রান্তের সিঁড়ির গোড়ায় চলে এল। উঠতে শুরু করল সিঁড়ি বেয়ে। আধপাক ঘুরে দোতলায় গিয়ে শেষ হয়েছে সিঁড়ির আরেক মাথা। মাঝামাঝি উঠে থামল ওরা। ধুলোয় ঢাকা জানালার শার্শি দিয়ে বাইরে তাকাল। চোখে পড়ছে গিরিপথ।
‘আরও ঘণ্টা দেড়েক আলো থাকবে,’ বলল রবিন। ‘এরমধ্যেই দেখে নিতে হবে যা দেখার।’
‘আগে জলদস্যুর ছবিটা ভালমত দেখি, চল,’ পরামর্শ দিল মুসা।
ব্যালকনিতে এসে থামল ওরা। দু’জনেই ধরল ছবির তার, টান দিল। ভীষণ ভারি ফ্রেম। দু’জনে টেনে তুলতেও বেগ পেতে হল।
উঠে এল ছবি। ওটার ওপর টর্চের আলো ফেলল মুসা। সাধারণ ছবি। তেল রঙে আঁকা, এজন্যেই আলো পড়লে সামান্য চকচক করে। রবিনের ধারণা হল, হয়ত বিশেষ কোন একটা দৃষ্টিকোণ থেকে ছবির চোখের দিকে চেয়েছিল মুসা, চকচক করতে দেখেছিল। জ্যান্ত চোখ বলে মনে হয়েছিল তখন। সেটা তাকে বলল রবিন।
কিন্তু সন্দেহ গেল না মুসার। ‘জ্যান্তই মনে হয়েছিল! কি জানি, ভুলও দেখে থাকতে পারি। যাকগে, আবার নামিয়ে রাখি ছবিটা, এস।’
আবার আগের জায়গায় ছবিটা ঝুলিয়ে রাখল ওরা। সরে এল ব্যালকনি থেকে। আবার চলে এল সিঁড়িতে।
সিঁড়ি ভেঙে উঠতেই থাকল ওরা। একটু পরেই মোটা থামের মত একটা টাওয়ারের ভেতরে আবিষ্কার করল নিজেদেরকে। চারদিকে ছোট ছোট জানালা। বাইরে তাকাল। ক্যাসলের চূড়ার কাছে উঠে এসেছে ওরা। অনেক নিচে ব্ল্যাক ক্যানিয়ন। যতদূর চোখ যায়, শুধু পাহাড় আর পাহাড়।
‘আরে! দেখেছ!’ হঠাৎ বলে উঠল মুসা। ‘একটা এরিয়্যাল! টেলিভিশনের!’
চাইল রবিন। ঠিকই। ওদের একেবারে কাছের পাহাড় চূড়োয় দাঁড়িয়ে আছে একটা এরিয়্যাল। হয়ত পাহাড়ের ওপাশেই রয়েছে কোন বাড়ি। ভাল রিসিপশনের জন্যে এরিয়্যালটা লাগিয়েছে বাড়ির লোকে!
‘পাহাড়ের মাঝে মাঝে অনেক গিরিপথ রয়েছে, দেখেছ?’ আঙুল তুলে একটা দিক দেখিয়ে বলল মুসা। ‘ব্ল্যাক ক্যানিয়নের মত নির্জন নয় ওগুলো।’
‘ডজন ডজন সরু গিরিপথ আছে এদিকে পাহাড়ের ভেতরে ভেতরে,’ বলল রবিন। ‘আমি ভাবছি এরিয়্যালটার কথা। পাহাড়ের ঢাল কি খাড়া দেখেছ? ওতে চড়তে চাইলে...! মনে হচ্ছে, ওদিক দিয়ে ঘুরে যেতে হবে।’
‘আমারও তাই ধারণা,’ বলল মুসা। ‘চল, নামি। এখানে আর কিছু দেখার নেই।’
খানিকটা নেমে একটা বড় ঘরে এসে ঢুকল ওরা। গাদা গাদা বই র্যাকে। লাইব্রেরি। এখানকার দেয়ালেও অনেক ছবি ঝোলানো, ইকো হলের ছবিগুলোর চেয়ে আকারে ছোট।
‘চল, দেখি ছবিগুলো,’ প্রস্তাব রাখল মুসা।
রবিন রাজি।
জন ফিলবির অভিনীত ছবির দৃশ্য। কোথাও সে জলদস্যু, কোথাও ছিনতাইকারী, ওয়্যারউলফ, জোম্বি, ভ্যাম্পায়ার, আবার কোথাও বা সাগর থেকে উঠে আসা কোন নাম-না জানা ভয়াবহ দানব।
‘ইস্স্ ফিল্মগুলো যদি দেখতে পারতাম!’ বলল মুসা। ‘একই লোকের মত চেহারা!’
‘লোকে এজন্যেই তাকে লক্ষমুখো ডাকত,’ মনে করিয়ে দিল রবিন। ‘আরে, দেখ দেখ!’
এক জায়গায় দেয়ালের একটা চারকোণা ফোকরে একটা বাক্স, মমিকেস। ডালা বন্ধ। রূপার একটা প্লেট লাগানো বাক্সের গায়ে। এগিয়ে গিয়ে প্লেটে টর্চের আলো ফেলল মুসা। খোদাই করে ইংরেজিতে লেখা রয়েছেঃ
জন ফিলবি,
তোমার অভিনীত ছবি দেখে অনেক মজা পেয়েছি বেঁচে থাকতে। মৃত্যুর পর আমার দেহের এই বিশেষ অংশগুলো তোমাকেই দান করে গেলাম। তোমার মিউজিয়মে সাজিয়ে রেখ। — পিটার হেনশ।
‘সেরেছে!’ চাপা গলায় বলল মুসা। ‘ভেতরে কি আছে!’
‘আর কি? নিশ্চয় মমি-টমি কিছু!’
‘অন্য কিছুও হতে পারে! এস, দেখি!’
ডালা ধরে ওপরের দিকে টান দিল মুসা। বেজায় ভারি। তুলতে কষ্ট হচ্ছে।
ডালাটা অর্ধেক উঠে যেতেই ভেতরে চাইল মুসা। ‘ওরেব্বাপরে!’ বলেই ছেড়ে দিল ডালা। সরে এল এক লাফে।
‘কি, ক্কি হল?’ রবিনের গলায় উৎকণ্ঠা।
‘দাঁত বের করে হাসছে! কঙ্কাল! উরিববাপরে!’
বার দুই ঢোক গিলল রবিন। ‘কঙ্কাল! নড়েচড়ে ওঠেনি তো!’
‘বুঝতে পারলাম না!’
‘এস তো, আবার তুলে দেখি!’
ভয়ে ভয়ে এসে আবার ডালা ধরল মুসা। রবিনও হাত লাগাল।
ডালা তুলে ভেতরে উঁকি দিল দু’জনেই। সাধারণ একটা কঙ্কাল পড়ে আছে চিত হয়ে। না, নড়ছে না। একেবারে স্থির।
‘খামোকা ভয় পেয়েছ,’ বলল রবিন। ‘নিশ্চয় ওটা পিটার হেনশর কঙ্কাল। একটা ছবি তুলে নিই। কিশোর খুশি হবে।’
ছবি তুলে নিল রবিন। মুসা নেই ওখানে। জানালার ধারে সরে যাচ্ছে।
‘সর্বনাশ!’ হঠাৎ চিৎকার শোনা গেল মুসার। ‘রবিন, জলদি কর! অন্ধকার…’
‘তা কি করে হয়?’ হাতঘড়ির দিকে চাইল রবিন। ‘এখনও এক ঘণ্টা আলো থাকার কথা!’
‘কি জানি! দেখে যাও!’
জানালার ধারে সরে এল রবিন। ঠিকই, বাইরে গিরিপথে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। উঁচু পাহাড়ের ওপারে হারিয়ে গেছে সূর্য।
‘ভুলেই গিয়েছিলাম,’ রবিনের গলায় শঙ্কা, ‘এসব পাহাড়ী অঞ্চলে সূর্য একটু তাড়াতাড়িই ডোবে।’
‘চল, বেরিয়ে পড়ি,’ তাগাদা দিল মুসা। ‘অন্ধকারে এখানে এক মুহূর্ত থাকতে রাজি নই আমি ।’
বারান্দায় বেরিয়ে এল ওরা। দুই প্রান্ত থেকেই সিঁড়ি নেমে গেছে। দেখতে ঠিক একই রকম। কাছের সিঁড়িটার দিকে এগিয়ে গেল ওরা। নামতে শুরু করল।
এক জায়গায় এসে শেষ হল সিঁড়ি। একটা হল ঘরে এসে ঢুকেছে ওরা। আবছা অন্ধকার। এক নজর দেখেই বুঝল, এটা ইকো রুম নয়, অন্য ঘর। এক প্রান্ত থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে।
‘এদিক দিয়ে যাইনি আমরা,’ বলল রবিন। ‘চল ফিরি। ওপর তলায় উঠে অন্য সিঁড়ি দিয়ে নামব।’
‘কি দরকার?’ বাধা দিল মুসা। ‘ওই তো সিঁড়ি নেমে গেছে। নিশ্চয় নিচের তলায়ই নেমেছে।’
অপ্রশস্ত সিঁড়ি। গায়ে গায়ে ঠেকে যায়। দ্রুত নেমে চলল দু’জনে। কয়েক ধাপ নেমেই সরু ছোট একটা প্যাসেজে শেষ হয়েছে সিঁড়ি। প্যাসেজের দু’পাশে দেয়াল। ও মাথায় দরজা।
তাড়াতাড়ি দরজার কাছে চলে এল ওরা। ঘন হয়ে আসছে অন্ধকার। নব ঘুরিয়ে ঠেলা দিতেই দরজা খুলে গেল! ওপাশ থেকে আবার সিঁড়ি নেমেছে। মুসা চলে গেল ওপাশে। ছেড়ে দিতেই বন্ধ হয়ে যেতে চাইল স্প্রিং লাগানো পাল্লা। খপ করে আবার ধরে ফেলল সে। রবিনও চলে এল এপাশে। পাল্লা ছেড়ে দিল মুসা।
দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই গাঢ় অন্ধকার গ্রাস করল ওদেরকে।
‘চল ফিরে যাই,’ আবার বলল রবিন। ‘এই অন্ধকারে অচেনা পথে চলতে মন সায় দিচ্ছে না।’
‘ঠিকই বলেছ। এখন আমারও কেমন কেমন লাগছে!’ ফিরে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল মুসা। দরজার নব ধরে মোচড় দিল। অন্ধকারে তার শঙ্কিত গলা শোনা গেল। ‘ইয়াল্লা! রবিন, নব ঘুরছে না! অটোমেটিক লক! পুশ বাটন ওপাশে। তাড়াহুড়োয় চাপ লেগে গেছে হয়ত!’
‘তাহলে আর কি করা!’ গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল রবিন। ‘না চাইলেও সামনেই বাড়তে হবে আমাদের!’
‘কিছুই দেখা যাচ্ছে না! দেখি, টর্চ জ্বালি! ...আরে, টর্চ কোথায় গেল আমার! ...কোথায়! ...নিশ্চয়, মমি-কেসের ডালা তোলার সময় নামিয়ে রেখেছিলাম!’
‘খুব ভাল করেছ! আমার টর্চটাও নষ্ট! এখন? কি উপায়?’
‘কাচ ভেঙেছে, বালব তো ভাঙেনি। দেখি, টর্চটা দাও আমার হাতে,’ অন্ধকারে রবিনের বাহুতে হাত রাখল মুসা।
সঙ্গীর হাতে টর্চ তুলে দিল রবিন।
টর্চের গায়ে বার দুই থাবা লাগাল মুসা। জোরে জোরে ঝাঁকুনি দিল বার কয়েক। সুইচ টিপল। জ্বলে উঠল বালব। নিভে গেল। আবার ঝাঁকুনি দিতেই আবার জ্বলল, মিটমিট করে। ম্লান আলো।
‘ঠিকমত ব্যাটারি কানেকশন পাচ্ছে না,’ মন্তব্য করল মুসা। ‘তবে কাজ চালানো যাবে। এস, নামি।’
ঘুরে ঘুরে নেমে গেছে সরু সিঁড়ি। আগে নেমে চলল মুসা। তাকে অনুসরণ করল রবিন। শেষ হল সিঁড়ি। ম্লান আলোয় দেখল, ছোট একটা ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে ওরা। দু’দিকে দুটো দরজা। বেরোবে কোন্ দরজা দিয়ে?
সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা দরজার দিকে পা বাড়াল রবিন। সঙ্গে সঙ্গে তার বাহু খামছে ধরল মুসা। ‘শুনছ! শুনতে পাচ্ছ!’
কান পাতল রবিন। সে-ও শুনতে পেল।
বাজনা। মৃদু, কাঁপা কাঁপা, বহুদূর থেকে আসছে যেন। প্রোজেকশন রুমের ভাঙা অর্গান পাইপ বাজছে! অস্বস্তি বোধ করতে লাগল রবিন। হঠাৎ করেই।
‘ওদিক থেকে আসছে,’ আঙুল তুলে একটা দরজা দেখিয়ে বলল মুসা।
‘তাহলে চল ওদিকে যাই,’ উল্টো দিকের আরেকটা দরজা দেখাল রবিন।
‘না, ওটা দিয়েই যাওয়া উচিত,’ আগের দরজাটা আবার দেখাল মুসা। ‘নিশ্চয় প্রোজেকশন রুমে ঢুকব গিয়ে। ঘরটা চেনা। অচেনা কোন ঘরে ঢুকতে আর রাজি নই আমি। এখন তো নয়ই।’
দরজা খুলল মুসা। অন্ধকার একটা ঘরে ঢুকল দু’জনে। ম্লান আলোয় পথ দেখে এগিয়ে চলল। বাড়ছে বাজনার শব্দ। এখনও অনেক দূরে মনে হচ্ছে। তীক্ষ ক্যাঁচকোঁচ আর চাপা চিৎকার কেমন ভূতুড়ে করে তুলেছে অর্গানের বাজনাকে!
এগিয়ে চলেছে দু’জনে। সামনে মুসা। তার ঠিক পেছনেই রবিন। যতই এগোচ্ছে, বাড়ছে অস্বস্তি-বোধ।
হলের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়াল ওরা। একটা দরজা। ঠেলে দিল মুসা। খুলে গেল পাল্লা। প্রোজেকশন রুমে ঢুকল দু’জনে।
সামনেই পড়ে আছে সারি সারি চেয়ার। ম্লান আলোয় সামনের কয়েকটা চেয়ার দেখা যাচ্ছে আবছাভাবে। অর্গান পাইপটা রয়েছে অন্য প্রান্তে। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। যেদিক থেকে বাজনার শব্দ আসছে, সেদিকে তাকাল মুসা। খপ করে চেপে ধরল রবিনের একটা হাত।
রবিনও তাকাল। স্থির হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। মেঝের ফুট চারেক উঁচুতে বাতাসে ঝুলে আছে অদ্ভুত নীল আলো। নির্দিষ্ট কোন আকার নেই। মুহূর্তে মুহূর্তে বিভিন্ন আকৃতি নিচ্ছে আলোটা, কাঁপছে থিরথির করে। ক্রমেই বাড়ছে অর্গান পাইপের বাজনা, সেই সঙ্গে তীক্ষ্ণ ক্যাঁচকোঁচ আর চাপা চিৎকার যেন সঙ্গত করছে।
‘নীল ভূত!’ ফিসফিস করে বলল রবিন। অস্বস্তিবোধ উৎকণ্ঠায় রূপ নিয়েছে। ভয়ে বুক কাঁপছে দুরু-দুরু। তীব্র আতঙ্কে রূপ নিতে বেশি দেরি নেই আর। কোন্ দরজা দিয়ে গেলে ইকো রুমে যাওয়া যায়, আন্দাজ করে নিল ওরা। ছুটল।
ধাক্কা দিয়ে পাল্লা খুলে ফেলল মুসা। প্রায় ছিটকে এসে পড়ল ইকো রুমে। হলের দিকে ছুটল।
হল, সদর দরজা পেরিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল দু’জনে! তবু থামল না। সিঁড়ি টপকে নেমে চলল। মুসার সঙ্গে পেরে উঠছে না রবিন, পা ভাঙা। পেছনে পড়ে গেল সে।
খিঁচে দৌড়াচ্ছে মুসা। পা টেনে টেনে যত জোরে সম্ভব, ছুটছে রবিন।
অন্ধকার। ঢাল বেয়ে নামতে নামতে হঠাৎ পা পিছলাল রবিন। হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বার দুই ডিগবাজি খেল, তারপর গড়াতে শুরু করল তার দেহ। কিছুতেই ঠেকাতে পারছে না। কয়েক গড়ান দিয়ে একটা পাথরের স্তূপে এসে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল দেহটা। কান্নার মত ফোঁপানি বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে।
ধরেই নিয়েছে রবিন, পেছনে তাড়া করে আসছে নীল অশরীরী। অপেক্ষা করছে ওটার জন্যে। বুকের ভেতরে হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে যেন। হাপরের মত ওঠা নামা করছে বুক।
শব্দটা হঠাৎ কানে এল রবিনের। পায়ের আওয়াজ। চাপা। এক কদম… দুই কদম করে এগিয়ে আসছে। নিশ্চয় নীল ভূত! অন্ধকারে খুঁজছে তাকে!
থামছে না, এগিয়েই আসছে শব্দটা। কাছে, আরও কাছে। ঠিক পেছনে। থেমে গেল শব্দ।
ফিরে চাইবার সাহস নেই রবিনের। পাথরে মুখ গুঁজে পড়ে আছে।
দীর্ঘ একটা মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল মূর্তিটা। তার শ্বাস ফেলার চাপা ফোঁস ফোঁস কানে আসছে রবিনের। হঠাৎ পিঠে ছোঁয়া লাগল, হাতের তালুর আলতো চাপ। তারপর আলতো ঘষা, ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। নিশ্চয় গলা খুঁজছে, আন্দাজ করল রবিন। নড়ার শক্তি নেই যেন, অবশ আসছে দেহ।
ঘাড়ের কাছে এসে থামল হাতটা। চাপ বাড়ল একটু। চেঁচিয়ে উঠল রবিন। তীক্ষ্ণ তীব্র চিৎকারে খান খান হয়ে ভেঙে গেল অখণ্ড নীরবতা। প্রতিধ্বনি তুলল পাহাড়ে পাহাড়ে বাড়ি খেয়ে।
তারপর? নীল ভূত তোমার ঘাড়ে হাত রাখল, তারপর কি হল?’ জিজ্ঞেস করল কিশোর।
হেডকোয়ার্টারে বসে আছে তিন গোয়েন্দা। তিন দিন পর আবার এক জায়গায় মিলতে পেরেছে তিনজনে। বাবা-মার সঙ্গে স্যান ফ্রান্সিসকোয় আত্মীয়ের বাড়ি গিয়েছিল মুসা। লাইব্রেরিতে কাজের চাপ পড়েছিল রবিনের। এক সহকর্মী ছুটি নিয়েছিল, ফলে দু’জনের কাজ একাই করতে হয়েছে তাকে। কিশোর পড়েছিল বিছানায়, একনাগাড়ে তিনটে দিন। কথা বলার কেউ ছিল না। খালি বই পড়ে কাটিয়েছে।
‘তারপর কি হল, বললে না?’ রবিনকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার জিজ্ঞেস করল কিশোর।
‘মানে...আমি চেঁচিয়ে উঠার পর?’ ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে চাইছে না রবিন, বোঝা যাচ্ছে।
‘নিশ্চয়। চেঁচিয়ে উঠলে, তারপর?’
‘মুসাকেই জিজ্ঞেস কর না,’ এড়িয়ে যেতে চাইছে রবিন। ‘ও-ও তো ছিল সঙ্গে।’
‘ঠিক আছে। মুসা, কি ঘটেছিল?’
ঢোক গিলল একবার মুসা। ‘ইয়ে… আমি পড়লাম... মানে...’
‘পড়ল তো রবিন, তুমি পড়লে কি করে?’
‘ওর ঘাড়ে হাত রাখতেই চেঁচিয়ে উঠল। জোরে লাথি মেরে বসল আমার পায়ে। পায়ের তলায় পাথর ছিল, সামলাতে পারলাম না। পড়ে গেলাম ওর পিঠে। নিচে পড়ে ছটফট করতে লাগল ও, এঁকেবেঁকে সরে যাবার চেষ্টা করল। গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগল। বললঃ আমাকে ছেড়ে দাও, ভূত, প্লীজ! খামোকা ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করবে কেন…’
‘কক্ষণো বলিনি আমি একথা!’ চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করল রবিন।
‘হ্যাঁ, বলেছ। ভুলে গেছ এখন।’
‘না, বলিনি!’
‘বললেই বা কি হয়েছে?’ রবিনের পক্ষ নিল কিশোর। ‘ওর সাহস আছে, স্বীকার করতেই হবে। ওই অবস্থায় আমি পড়লেও ভয় পেতাম। ও তো প্যান্ট খারাপ করেনি। হ্যাঁ, তারপর?’
‘জোরে জোরে বললাম, অত ভয় পাবার কিছু নেই। আমি মুসা। আমার কথা কানেই ঢুকল না যেন রবিনের। কানের কাছে মুখ নিয়ে চেঁচাতে তবে থামল। শান্ত হল। ওকে ধরে তুললাম।’
‘ইচ্ছে করেই ভয় পাওয়ানোর চেষ্টা করেছ আমাকে তুমি!’ রবিনের গলায় অনুযোগ।
‘কসম খোদার, রবিন, তোমাকে ভয় পাওয়াব কি, আমারই তো অবস্থা তখন কাহিল। পেছন ফিরে দেখলাম তুমি নেই। ফিরতেই হল। খুব ভয়ে ভয়ে পা ফেলেছি। সারাক্ষণই মনে হয়েছে, এই বুঝি ধরল এসে নীল ভূতের বাচ্চা!’
দু’জনেই তাকাল কিশোরের দিকে।
ওদের কথা শুনছে না গোয়েন্দাপ্রধান। নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে চুপচাপ।
‘দু’জনেই উঠে দাঁড়ালে তোমরা, তারপর?’ হঠাৎ প্রশ্ন করল কিশোর। ‘আবিষ্কার করলে আতঙ্ক, ভয়, কিছুই নেই। এমনকি অস্বস্তিবোধও চলে গেছে, তাই না?’
চাওয়া চাওয়ি করল মুসা আর রবিন। কি করে আন্দাজ করল কিশোর? এই কথাটা সব শেষে বলে চমকে দেবে প্রধানকে, ভেবে রেখেছে ওরা।
‘ঠিক,’ জবাব দিল মুসা। ‘কিন্তু তুমি জানলে কি করে?’
মুসার প্রশ্নটা যেন শুনতেই পায়নি কিশোর। আপনমনে বলল, ‘তারমানে, টেরর ক্যাসলের বাইরে এলেই চলে যায় ওসব অনুভূতি! গুড। একটা কাজের কাজ করে এসেছ।’
‘তাই?’ রবিনের প্রশ্ন।
‘তাই। হ্যাঁ, ছবিগুলো নিশ্চয় শুকিয়েছে এতক্ষণে। আন না, দেখি। নাহ, জ্বালিয়ে মারবে চাচা!’ ভেন্টিলেটর বন্ধ করতে উঠে গেল কিশোর।
অর্গান পাইপ বসানোর কাজ শেষ করে ফেলেছেন রাশেদ চাচা। বোরিস আর রাভার তাঁকে সাহায্য করেছে। কিশোরও করেছে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে। অর্গান পাইপের ওপর লেখা একটা বই খুঁটিয়ে পড়েছে সে। চাচাকে জানিয়েছে, কোন্ জোড়াটা কোথায় কিভাবে লাগাতে হবে। কাজ শেষ করেই বাজাতে বসে গেছে চাচা। ইয়ার্ডের আর সব কাজ বাদ দিয়ে তাঁর সঙ্গে জুটেছে বোরিস আর রোভার।
আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বাজছে অর্গান। ভয়াবহ আওয়াজ। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’-র সুর বাজানোর চেষ্টা করছেন চাচা আনাড়ি হাতে। ঠিক হচ্ছে না। তবু তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে দুই ব্যাভারিয়ান ভাই। তারিফ করছে সুরের। ওদের ধারণা, বাদক হিসেবে জুড়ি নেই রাশেদ পাশার।
শব্দের ধাক্কায় কাঁপছে পুরো ইয়ার্ড। ট্রেলারের ছাতের খোলা ভেন্টিলেটর দিয়ে আসছে আওয়াজ। কান ঝালাপালা করে দিতে চাইছে। সুর চড়া পর্দায় যখন উঠছে, থরথর করে কেঁপে উঠছে ট্রেলারের দেয়াল।
ভেন্টিলেটর বন্ধ করে দিয়ে ফিরে এল কিশোর।
ডার্করুম থেকে ছবি নিয়ে ফিরল রবিন।
ছবি পরীক্ষা করে দেখতে বসল কিশোর। ভেজা ভেজা রয়েছে এখনও। একটা করে ছবি টেনে নিয়ে বড় রীডিং গ্লাসের তলায় ফেলছে সে, ভাল করে দেখছে, তারপর ঠেলে দিচ্ছে রবিন আর মুসার দিকে।
অনেক সময় লাগিয়ে পরীক্ষা করল আর্মার সুট আর জন ফিলবির লাইব্রেরির ছবি। মুখ না তুলেই বলল, ‘ভাল ছবি তুলেছ, রবিন। তবে আসল কাজটাই পারনি। নীল ভূতের ছবি তোলা দরকার ছিল।’
‘ভাল বলেছ! অন্ধকারে কয়েক ডজন চেয়ার ডিঙিয়ে অর্গানের কাছে যাই! ছবি তোলার আগেই তো আমার ঘাড়টা মটকে দিত নীল হারামজাদা!’
‘পালাতে পেরেছি এই যথেষ্ট, আবার ছবি!’ যোগ করল মুসা। ‘তীব্র আতঙ্ক চেপে ধরেছে। দিশেহারা হয়ে পড়েছি। তুমিও ছবি তুলতে পারতে না তখন।’
‘ঠিকই, পারতাম না,’ স্বীকার করল কিশোর। ‘আতঙ্কিত হয়ে পড়লে মাথার ঠিক থাকে না। তবে, তুলে আনা গেলে খুব সুবিধে হত। কিনারা করা যেত রহস্যটার।’
চুপ করে রইল মুসা আর রবিন।
‘অদ্ভুত একটা ব্যাপার ভেবে দেখেছ?’ বলল কিশোর। ‘টেরর ক্যাসলের ভূত সূর্য ডোবার আগেই দেখা দিয়েছে!’
‘কিন্তু ক্যাসলের ভেতরে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল,’ প্রতিবাদ করল মুসা। ‘বেড়ালেও দেখতে পেত কিনা সন্দেহ!’
‘তবু, বাইরে তখনও সূর্য ডোবেনি। রাত নামার আগে ভূত বেরিয়েছে, এমন শোনা যায়নি কখনও। যাকগে। ওসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে। এখন ছবিগুলো দেখি।’
আর্মার সুটের ছবির দিকে আবার চাইল কিশোর। ‘এখনও চকচকে আছে সুটটা। মরচে পড়েনি।’
‘ঠিকই,’ সায় দিল রবিন। ‘দুয়েকটা জোড়ায় মরচে দেখেছি শুধু। এছাড়া পুরো সুটটাই চকচকে।’
‘আর এই যে, লাইব্রেরির বইগুলো। ধুলোয় মাখামাখি হয়ে থাকার কথা ছিল। নেই।’
‘হালকা ধুলো ছিল,’ বলল মুসা। ‘তবে অনেক দিন পড়ে থাকলে যতটা থাকার কথা, ততটা নয়।’
‘হুমম!’ মমি-কেসে রাখা কঙ্কালের ছবিটা টেনে নিল কিশোর। ‘নিজের কঙ্কাল উপহার দেয়া! সত্যি অদ্ভুত!’
ঠিক এই সময় দড়াম করে শব্দ হল একটা! জঞ্জালের স্তূপ থেকে লোহার ভারি কিছু খসে পড়েছে, আছড়ে পড়েছে ট্রেলারের গায়ে। কারণ—অর্গান পাইপ। আরও জোরে বাজছে এখন।
‘সর্বনাশ!’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ‘ভূমিকম্প শুরু হবে!’
‘কান খারাপ হয়ে গেল নাকি চাচার!’ ভুরু কোঁচকাল কিশোর। ‘আর সইতে পারছি না! বেরিয়ে যেতে হবে! জিনিসটা দিয়েই বেরিয়ে পড়ব।’
অপেক্ষা করে রইল রবিন আর মুসা, উৎসুক দৃষ্টি।
টেবিলের ড্রয়ার থেকে তিনটে লম্বা চক বের করল কিশোর। সাধারণ চক। একটা নীল, একটা সবুজ, অন্যটা সাদা।
‘এগুলো কেন?’ জানতে চাইল মুসা।
‘আমাদের চিহ্ন রেখে যাবার জন্যে,’ বলতে বলতেই সাদা চক দিয়ে দেয়ালে বড় একটা প্রশ্নবোধক আঁকল কিশোর। ‘সাদা প্রশ্নবোধক, আমার চিহ্ন। সবুজ রবিনের, আর নীল তোমার। কোথাও পথ হারিয়ে ফেললে, এই চিহ্ন রেখে যাব আমরা। কে হারিয়েছি, কোন্ পথ দিয়ে গেছি, খুব সহজেই বুঝতে পারব অন্য দু’জন। অনুসরণ করা সহজ হবে।’
‘দারুণ!’ বিড়বিড় করল মুসা। ‘কিশোর, তোমার তুলনা হয় না!’
‘অনেক সুবিধে এতে,’ মুসার কথায় কান দিল না কিশোর। ‘দেয়াল, দরজা জানালার পাল্লা, কিংবা অন্য যে কোনখানে চক দিয়ে প্রশ্নবোধক আঁকতে পারব আমরা। অন্য কারও চোখে পড়লেও তেমন কিছুই বুঝবে না। ভাববে, কোন দুষ্টু ছেলের খেয়াল। অথচ আমাদের কাছে এটা মহামূল্যবান। এখন থেকে যার যার রঙের চক বয়ে বেড়াব আমরা। কখনও কাছছাড়া করব না। ঠিক আছে?’
মাথা কাত করে সায় জানাল অন্য দু’জন।
‘আর হ্যাঁ,’ আসল কথায় এল কিশোর। ‘মিস্টার ক্রিস্টোফারের অফিসে ফোন করেছিলাম, আজ সকালে। কেরি জানিয়েছে, আগামীকাল সকালে স্টাফদের নিয়ে মীটিঙে বসবেন পরিচালক। সিদ্ধান্ত নেবেন, কোন ভূতুড়ে বাড়িতে ছবির শুটিং করবেন। তারমানে, কাল সকালের আগেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে আমাদের। তার মানে…’
‘না!’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ‘আমি পারব না! আমি আর যাব না টেরর ক্যাসলে। শিওর, ওই বাড়িতে ভূত আছে! কোন প্রমাণের দরকার নেই আমার।’
‘বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনেক ভেবেছি,’ মুসার কথায় কোনরকম ভাবান্তর হল না কিশোরের। ‘সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, টেরর ক্যাসলে ভূত থাকলে, দেখে ছাড়ব। মিস্টার ক্রিস্টোফার কথা দিয়েছেন, আমাদের নাম প্রচার করবেন। এ-সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করব না আমি। তোমাদেরও করা উচিত হবে না। বাড়িতে বলে আসবে, আজ রাতে আর না-ও ফিরে যেতে পার। আবার ঢুকব আমরা টেরর ক্যাসলে। আজই ভেদ করব এর রহস্য।’
0 মন্তব্যসমূহ